হ্যাঁ, ছেলের প্রতি ভালোবাসাও আমার ঘুচে গেছে। কেননা আপনার প্রতি আমার বিতৃষ্ণার সাথে ও সম্পর্কিত। তাহলেও নেব ওকে। বিদায়!’
উনি চলে যাবার উপক্রম করলেন। কিন্তু এবারে আন্না থামালেন ওঁকে।
‘কারেনিন সেরিওজাকে রেখে যান!’ আরো একবার ফিসফিস করলেন আন্না, ‘আমি এর বেশি কিছু আর বলতে পারছি না। সেরিওজাকে রেখে যান যদ্দিন আমার…শিগগিরই আমার সন্তান হবে, রেখে যান ওকে!
কারেনিন লাল হয়ে উঠলেন, আন্নার কাছ থেকে হাত ছাড়িয়ে নিয়ে ঘর থেকে নীরবে বেরিয়ে গেলেন।
আন্না কারেনিনা – ৪.৫
পাঁচ
কারেনিন যখন ঢুকলেন, পিটার্সবুর্গের লব্ধপ্রতিষ্ঠ অ্যাডভোকেটের অভ্যর্থনাকক্ষটি ছিল লোকে গিজগিজ 1 তিনজন মহিলা : বৃদ্ধা, যুবতী আর বেনে-বৌ, তিনজন ভদ্রলোক : অঙ্গুরী পরিহিত একজন জার্মান ব্যাংকার, একজন দেড়েল বেনে, তৃতীয় জন গলায় ক্রস ঝোলানো, উর্দি পরা জনৈক আমলা স্পষ্টতই অনেকক্ষণ থেকে অপেক্ষা করছিল। দুজন সহকারী টেবিলের পেছনে বসে খাগের কলম দিয়ে খসখস করে লিখে যাচ্ছিল। লেখার যেসব উপকরণে কারেনিনের বিশেষ আগ্রহ, তা এখানে খুবই ভালো। তিনি সেটা লক্ষ্য না করে পারলেন না। একজন সহকারী উঠে না দাঁড়িয়ে চোখ কুঁচকে কারেনিনকে জিজ্ঞেস করলেন : ‘কি চাই আপনার?’
‘অ্যাডভোকেটের সাথে কাজ আছে।’
‘উনি ব্যস্ত’, কঠোরভাবে জবাব দিয়ে সহকারী কলম দিয়ে অপেক্ষমাণদের দিকে দেখিয়ে লিখে যেতে লাগল। ‘একটু সময় ওঁর হবে না কি?’ বললেন কারেনিন
‘ফাঁকা সময় ওঁর নেই। সব সময় উনি ব্যস্ত, অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ‘
‘তাহলে একটু কষ্ট করে আমার কার্ডটা ওঁকে দেবেন’, অজ্ঞাত থাকা চলবে না দেখে কারেনিন বললেন মর্যাদাভরে।
সহকারী কার্ডটা নিল, স্পষ্টতই বোঝা গেল যে তাতে যা লেখা আছে সেটা তার মনঃপূত নয়। তাহলেও দরজার দিকে গেল সে।
নীতিগতভাবে প্রকাশ্য বিচারের দিকে সহানুভূতি ছিল কারেনিনের কিন্তু আমাদের দেশে তার প্রয়োগের কিছু কিছু খুঁটিনাটিতে উচ্চ পদাধিকারের দিক থেকে তাঁর পুরো সায় ছিল না, তাই তার সমালোচনা করতেন, সর্বোচ্চ কোন সিদ্ধান্তের যতটা সমালোচনা করা তার পক্ষে সম্ভব। তাঁরন সারা জীবন কেটেছে প্রশাসনিক ক্রিয়াকলাপে, তাই কোন কিছুতে তাঁর অনুরাগ না থাকলেও সে বিরাগটা নরম হয়ে আসত তাঁর এই স্বীকৃতিতে যে ভুল করা অনিবার্য এবং যে কোন ব্যাপারেই তা সংশোধন করা সম্ভব। আদালতের নতুন প্রথায় যেসব শর্ত দেওয়া হয়েছে ওকালতির ব্যাপারে, তা তিনি অনুমোদন করতেন না। এ যাবত তাঁকে কখনো ওকালতি ব্যবস্থার দারস্থ অ্যাডভোকেটের অভ্যর্থনাকক্ষ তাঁর ওপর যে বিশ্রী ছাপ ফেলল, তাতে সে অননুমোদন গেল আরো বেড়ে
‘এখনই বেরিয়ে আসবেন’, সহকারী বলল; আর সত্যিই দু’মিনিট বাদে দরজায় দেখা দিল আইনজ্ঞের দীর্ঘ মূর্তি যিনি আলাপ করছিলেন অ্যাডভোকেটের সাথে, তারপর স্বয়ং অ্যাডভোকেট।
অ্যাডভোকেট লোকটা বেঁটে গাঁট্টাগোট্টা, টেকো, মুখে কালচে-পাটকিলে দাড়ি, হালকা রঙের লম্বা ভুরু, টিট কপাল। গলাবন্ধ আর ঘড়ির দুটো চেন থেকে শুরু করে পেটেন্টে-লেদার জুতো পর্যন্ত তাঁর গোটা সাজটা বরের মত। মুখখানা বুদ্ধিমান, চাষী-চাষী কিন্তু পোশাক, সাহেব-সাহেব, রুচিহীন 1
‘আসুন’, বলে, হাঁড়িমুখে কারেনিনকে তাঁর পাশ দিয়ে ঢুকতে দিয়ে অ্যাডভোকেট দরজা বন্ধ করলেন।
কাগজ ছড়ানো ‘লেখার টেবিলের কাছে একটা ইজিচেয়ার দেখিয়ে তিনি বললেন, ‘বসুন না!’ আর নিজে বসলেন কর্তার আসনটায়, ছোট ছোট সাদা লোহ গজানো আঙুল সমেত খাটো হাত দু’খানা ঘষতে ঘষতে, পাশের দিকে মাথা হেলিয়ে। কিন্তু নিজের ভঙ্গিতে সুস্থির হতে না হতেই টেবিলের ওপর দিয়ে উড়ে এল একটা কাপড়-খেকো পোকা। তাঁর পক্ষে যা আশা করা যায় না, এমন একটা ক্ষিপ্রতায় তিনি হাত দিয়ে পোকাটাকে ধরে আবার আগের ভঙ্গিতে ফিরে গেলেন।
‘আমার ব্যাপারটা বলার আগে’, চোখ দিয়ে অ্যাডভোকেটের ক্ষিপ্রতাটা লক্ষ্য করে অবাক হয়ে কারেনিন বললেন, আমার জানিয়ে রাখা দরকার যে, আপনার সাথে যে ব্যাপারটা নিয়ে কথা বলব, সেটাকে গোপন রাখতে হবে।’
সামান্য লক্ষ্যে পড়ে এমন একটা হাসিতে অ্যাডভোকেটের পাটকিলে গোঁফ ফুলে উঠল।
‘বিশ্বাস করে আমাকে যা বলা হয় তার গোপনীয়তা রক্ষা করতে না পারলে আমি অ্যাডভোকেটই নই। আপনার যদি তার প্রমাণ দরকার হয়…’
তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে কারেনিন লক্ষ্য করলেন যে তাঁর বুদ্ধিমান ধূসর চোখ জোড়া হাসছে যেন সবই তারা জানে।
‘আমার নাম আপনি জানেন কি? বলে চললেন কারেনিন।
‘আপনাকে জানি, সমস্ত রুশীর মত আপনার মূল্যবান ক্রিয়াকলাপের কথাও জানি’, কাপড়-থেকো পোকা ধরে অ্যাডভোকেট বললেন নিচু হয়ে।
দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বুক বাঁধতে লাগলেন কারেনিন কিন্তু একবার মনস্থির করার পর না তোতলিয়ে, কয়েকটা শব্দের ওপর বিশেষ জোর দিয়ে, নির্ভয়ে তিনি বলে চললেন তাঁর কিচকিঁচে গলায়। শুরু করলেন, ‘প্রতারিত স্বামী হবার দুর্ভাগ্য হয়েছে আমার এবং আইনত স্ত্রীর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করতে চাই। অর্থাৎ বিবাহবিচ্ছেদ, কিন্তু এমনভাবে যাতে ছেলে মেয়ের কাছে না থাকে।’
অ্যাডভোকেটের ধূসর চোখ চেষ্টা করল না হাসতে কিন্তু অদম্য আনন্দে তা নাচছিল এবং কারেনিনের মনে হল ব্যাপারটা শুধুই মোটা একটা ফি পাবার আনন্দই নয়, আছে তাতে জয়চেতনা, উল্লাস, স্ত্রীর চোখে যে বিদ্বেষপূর্ণ ঝিলিক তিনি দেখেছেন, আছে তেমন একটা ঝিলিক 1
