‘এখানে তা নেই’, বলে দেরাজ বন্ধ করে দিলেন আন্না; কিন্তু বন্ধ করার ভঙ্গিটা দেখে উনি বুঝলেন যে ঠিকই ধরেছেন, রূঢ়ভাবে তাঁর হাতে ধাক্কা মেরে তিনি ক্ষিপ্র টেনে নিলেন পোর্টফোলিওটা যাতে সবচেয়ে দরকারী কাগজপত্র আন্না রাখতে বলে তিনি জানতেন। পোর্টফোলিওটা কেড়ে নিতে যাচ্ছিলেন আন্না, ক্লিতু উনি তাঁকে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিলেন।
‘বসুন! আপনার সাথে কথা আছে আমার’, তিনি বললেন। পোর্টফোলিওটা বগলদাবা করে কনুই দিয়ে এমন সজোরে তাতে চাপ দিচ্ছিলেন যে কাঁধ তাঁর উঁচু হয়ে উঠল
আন্না অবাক হয়ে ভীরু-ভীরু দৃষ্টিতে নীরবে তাকিয়ে রইলেন তাঁর দিকে।
‘আপনাকে আমি বলেছিলাম যে আপনার প্রেমিককে এখানে গ্রহণ করতে আমি আপনাকে দেব না।’
‘ওর সাথে দেখা করার দরকার চিল আমার যাতে…. ‘
কোন একটা ওজর খুঁজে না পেয়ে আন্না থেমে গেলেন।
‘প্রেমিকের সাথে দেখা করা কেন নারীর কাছে প্রয়োজন তার বিস্তারিত দাখিলায় আমি যাচ্ছি না।’
‘আমি চেয়েছিলাম, আমি শুধু…’ ফুঁসে উঠে বলে উঠলেন আন্না। তাঁর এই রূঢ়তায় পিত্তি জ্বলে উঠল তাঁর, সাহস জোগাল। ‘সত্যিই কি আপনি টের পান না যে, আমাকে অপমান করা আপনার পক্ষে কত সহজ?’ আন্না বললেন।
‘অপমান করা সম্ভব কোন সৎ লোক বা সৎ নারীকে, কিন্তু চোরকে চোর বললে সেটা হয় শুধু সত্য ঘটনা প্রতিষ্ঠা।’
‘আপনার মধ্যে নিষ্ঠুরতার এই নতুন দিকটা আমার জানা ছিল না।’
স্ত্রী শালীনতা মেনে চলবে, এই শর্তে সুনামের একটা সাধু আচ্ছাদন জুগিয়ে স্বামী তাকে স্বাধীনতা দিচ্ছে, এটাকে আপনি নিষ্ঠুরতা বলছেন। এটা নিষ্ঠুরতা?’
‘এটা নিষ্ঠুরতার চেয়েও খারাপ, এটা পাষণ্ডতা’, আক্রোশে ফেটে পড়ে চিৎকার করে উঠলেন আন্না, যাবার জন্য উঠে দাঁড়ালেন।
‘না!’ স্বামী চেঁচিয়ে, উঠলেন তাঁর কিঁচকিঁচে গলায় যা এখন উঠল আরো এক পর্দা উঁচুতে। এত জোরে নিজের বড় বড় আঙুলে তাঁর হাত চেপে ধরলেন যে চাপ যেখানে পড়ছিল সেই ব্রেসলেটটা থেকে লাল লাল দাগ রয়ে গেল বাহুতে, জোর করে তিনি আন্নাকে বসিয়ে দিলেন তাঁর স্বস্থানে। ‘পাষণ্ডতা?’ কথাটা যদি ব্যবহার করতে চান, তাহলে পাষণ্ডতা হল প্রেমিকের জন্যে স্বামী-পুত্রকে ত্যাগ করা আর স্বামীর অন্ন খেয়ে যাওয়া।
আন্না মাথা নিচু করলেন। গতকাল প্রেমিককে এই যে কথাটা তিনি বলেছিলেন যে ভ্রন্স্কিই তাঁর স্বামী আর এ স্বামীটা ফালতু, সেটা তিনি বললেন না শুধু নয়, বলার কথা মনেও এল না। কারনিনের কথার সমস্ত ন্যায্যতা তিনি অনুভব করছিলেন, শুধু আস্তে করে বললেন : ‘আমার অবস্থাটা আমি নিজে যতটা বুঝি, তার চেয়েও খারাপ করে সেটা দেখানো আপনার পক্ষে সম্ভব নয়, কিন্তু কেন বললেন এসব?’
‘কেন বলছি? কেন?’ একই রকম ক্রোধে বলে চললেন তিনি, ‘আপনি যাতে জানেন যে, শালীনতা মেনে চলার ব্যাপারে আপনি যেহেতু আমার ইচ্ছা পালন করেননি, তাই অবস্থাটা যাতে চুকে যায় তার ব্যবস্থা আমি করব।’
‘শিগরিই, শিগরিই সেটা ওইভাবেই চুকবে’, আন্না বললেন এবং আসন্ন আর এখন কাম্য মৃত্যুর কথা ভেবে আবার চোখে পানি এল তাঁর।
‘আপনি আর আপনার প্রেমাস্পদ, দুজনে মিলে যা ভাবছেন, চুকবে তার আগেই! পাশবিক কাম আপনারা পরিতৃপ্ত করতে চান…’
‘কারেনিন! ভূপতিতকে প্রহার করাকে আমি অনুদার বলব না, এটা অমর্যাদাকর।’
‘আপনি শুধু নিজের কথা ভাবেন, কিন্তু যে লোকটা ছিল আপনার স্বামী, তার কষ্টে আপনার কোন আগ্রহ নেই। এতে আপনার কিছু এসে যায় না যে তার গোটা জীবন চূর্ণ হয়েছে। সয়েছে সে যর…যর… যরন্ত্রণা।’
এত হুড়মুড় করে কারেনিন কথা বলছিলেন যে গোলমাল হয়ে যাচ্ছিল তাঁর, শব্দটা তিনি উচ্চারণ করে উঠতে পারছিলেন না। শেষ পর্যন্ত বলে বসলেন ‘যন্ত্রণা’। আন্নার মজা লাগল আর সাথে সাথেই এই জন্য লজ্জা হল যে এরূপ একটা মুহূর্তেও কোন কিছুর জন্য তাঁর মজা লাগা সম্ভব হচ্ছে। আর এই প্রথম কেটা সহানুভূতি বোধ করলেন তিনি, নিজেকে ওঁর জায়গায় বসিয়ে কষ্ট হল ওঁর জন্য। কিন্তু কিই-বা তিনি বলতে বা করতে পারেন? মাথা নুইয়ে তিনি চুপ করে রইলেন। স্বামীও চুপ করে রইলেন কিছুক্ষণ, তারপর কথা বললেন কম কিঁচকিঁচে, ঠাণ্ডা গলায়, জোর দিতে লাগলেন এলোমেলো বেছে নেওয়া শব্দগুলোয় যা বিশেষ কোন গুরুত্ব ধরে না।
বললেন, ‘আমি আপনাকে বলতে এসেছি….
আন্না তাকালেন তাঁর দিকে। ‘যন্ত্রণা’ কথাটা নিয়ে যখন গোলমাল পড়েছিলেন তখন তাঁর মুখের ভাবটা স্মরণ করে মনে মনে ভাবলেন আন্না, ‘না, ওটা নেহাৎ আমার কল্পনা। এই যে মানুষটার এমন নিষ্প্রভ চোখ, এমন আত্মতুষ্ট প্রশান্তি, তার কি কোন অনুভূতি থাকতে পারে?’
‘কিছুই আমি বদলাতে পারি না’, ফিসফিসিয়ে বললেন আন্না।
‘আমি আপনাকে বলতে এসেছি যে, কাল আমি মস্কো যাচ্ছি। এ বাড়িতে আর ফিরব না। আমার সিদ্ধান্ত সম্পর্কে আপনি খবর পাবেন অ্যাডভোকেটের কাছ থেকে। বিবাহবিচ্ছেদের ভারটা আমি তাঁর ওপর দিয়ে যাব।’ ছেলের সম্পর্কে কি বলতে চাইছিলেন সেটা বহু প্রয়াসে স্মরণ করে কারেনিন বললেন, ‘আর আমার ছেলে যাবে আমার বোনের কাছে।’
‘সেরিওজাকে আপনার দরকার আমাকে আরো কষ্ট দেবার জন্যে’, আড়চোখে ওঁর দিকে তাকিয়ে বললেন আন্না, ‘আপনি তো ওকে ভালোবাসেন না…ওকে রেখে যান আমার কাছে!’
