‘এই হল ব্যাপার, এটাই ভালো’, ভ্রন্স্কির হাতে প্রচণ্ড চাপ দিয়ে তিনি বলছিলেন, ‘এই একটা। একটা জিনিসই আমাদের বাকি আছে।’
সম্বিত ফিরে পেয়ে ভ্রন্স্কি মাথা তুলে বললেন, ‘কি বাজে কথা! কি অর্থহীন ছাইভস্ম বলছ তুমি!’
‘না, এটা সত্যি।’
‘কি, কি সত্যি?’
‘আমি মরব। স্বপ্নে তা দেখেছি আমি।’
‘স্বপ্ন?’ পুনরাবৃত্তি করলেন ভ্রন্স্কি আর মুহূর্তের জন্য স্বপ্নে দেখা চাষীটার কথা মনে পড়ল তাঁর।
‘হ্যাঁ, স্বপ্ন’, আন্না বললেন, ‘অনেকদিন আগেই স্বপ্নটা দেখেছি। দেখেছি যে আমি ছুটে ঢুকছি আমার শোবার ঘরে, কি যেন আমাকে নিতে হবে সেখান থেকে, জানতে হবে কি যেন; জানো তো, স্বপ্নে জিনিসটা কেমন হয়’, আতংকে চোখ বড় বড় করে আন্না বলছিলেন, ‘আর শোবার ঘরে, কোণে কি একটা যেন দাঁড়িয়ে।
‘আহ্, কি আজেবাজে কথা! কি করে বিশ্বাস করা যায় যে…’
কিন্তু বাধা মানলেন না আন্না। যা তিনি বলছেন সেটা তাঁর কাছে বড় বেশি জরুরি।
‘সেই কি একটা ঘুরে দাঁড়াল। দেখলাম সে আলুথালু দাড়িওয়ালা এক চাষী, ছোটখাট, ভয়ংকর দেখতে। আমি পালাতে যাইছিলাম, কিন্তু সে একটা বস্তার ওপর ঝুঁকে তার ভেতর কি যেন হাতড়াতে লাগল… ‘
কিভাবে বস্তার ভেতর ও হাতড়াচ্ছিল, সেটা দেখালেন আন্না, মুখে তাঁর আতংক। আর নিজের স্বপ্নটার কথা মনে করে একই রকম আতংক তাঁরও বুক ভরে উঠছে বলে ভ্রন্স্কি টের পেয়ে বললেন, ‘বস্তা হাতড়াতে হাতড়াতে সে হড়বড় করে ফরাসি ভাষায় কথা বলছে, জান, গড়গড়িয়ে বলছে : লোহাটা পিটাতে হবে, ঠুকতে হবে, পিষতে হবে,
আতংকে আমি জেগে উঠতে চাইছিলাম, জেগেও উঠলাম,…কিন্তু সেটা স্বপ্নেই। নিজেকে জিজ্ঞেস করতে লাগলাম কি এর মানে। কর্নেই আমাকে বলল : ‘প্রসবে, প্রসবে মারা যাবে মা, প্রসবে…’ তখন ঘুম ভেঙে গেল…’
‘কি বাজে কথা, কি বাজে কথা!’ ভ্রন্স্কি বলছিলেন কিন্তু নিজেই টের পাচ্ছিলেন যে তাঁর গলার স্বরে কোন প্রত্যয় নেই।
‘যাক গে, কথা আর তুলব না। ঘণ্টি দাও তো, আমি চা আনতে বলি। আরে দাঁড়াও, এখন আর বেশি দিন নয়…’
কিন্তু হঠাৎ থেমে গেলেন আন্না। মুহূর্তের মধ্যে বদলে গেল তাঁর মুখভাব। আতংক আর উদ্ভ্রান্তির স্থলে দেখা গেল একটা মৃদু, গুরুতর, সুখাবিষ্ট মনোযোগ। ভ্রন্স্কি এই পরিবর্তনটার কারণ বুঝতে পারলেন না। নিজের ভেতর আন্না নতুন একটা জীবনের স্পন্দন শুনতে পেয়েছিলেন।
চার
ভ্রন্স্কির সাথে অতর্কিত বাড়ির অলিন্দে সাক্ষাৎটার পর কারেনিন যা স্থির করে রেখেছিলেন সেই অনুসারে গেলেন ইতালীয় অপেরায়। সেখানে তিনি রইলেন দুটো অংক পর্যন্ত, যাদের সাথে দরকার ছিল দেখা করলেন তাদের সবার সাথে। বাড়ি ফিরে খুঁটিয়ে হল-স্ট্যান্ডটা লক্ষ করলেন, কোন সামরিক ওভারকোট ঝুলছে কিনা দেখে তিনি বরাবরের মত চলে গেলেন নিজের ঘরে। কিন্তু বরাবরের বিপরীতে বিছানায় না শুয়ে তিনি স্টাডিতে সামনে-পেছনে পায়চারি করে গেলেন রাত তিনটা পর্যন্ত। শালীনতা মান্য করতে চাননি স্ত্রী। বাড়িতে প্রণয়ীকে ডাকবেন না-তাঁর দেওয়া এই একটা শর্তও পালন করেননি, তার জন্য স্ত্রীর ওপর ক্রোধে তিনি শান্তি পাচ্ছিলেন না। তাঁর দাবি উনি অগ্রাহ্য করেছেন, সেজন্য ওঁকে শাস্তি দিতে তিনি বাধ্য, যে হুমকি তিনি দিয়েছিলেন, সেটাকে কার্যে পরিণত করবেন, বিবাহবিচ্ছেদ দাবি করে কেড়ে নেবেন ছেলেকে। তিনি জানতেন এই ব্যাপারটার সাথে সংশ্লিষ্ট সমস্ত মুশকিলের কথা, কিন্তু এটা তিনি করবেন বলেছিলেন, এবার হুমকিটা কার্যকৃত করবেন তিনি। কাউন্টেস লিদিয়া ইভানোভনা তাঁকে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে তাঁর অবস্থায় এটাই শ্রেষ্ঠ পন্থা, সম্প্রতি বিবাহবিচ্ছেদের ব্যাপারটা এত উন্নত হয়েছে যে আনুষ্ঠানিক ঝামেলাগুলো কাটিয়ে ওঠা সম্ভব বলে মনে হল কারেনিনের। তাছাড়া বিপদ তো একা আসে না, দেশের অরুশ জাতিগুলোর সুব্যবস্থা করা এবং জারাইস্কায়া গুবের্নিয়ার জমিতে সেচের ব্যাপারটা তাঁর কর্মক্ষেত্রে এত অপ্রীতির কারণ ঘটিয়েছে যে, ইদানীংকার এই গোটা সময়টা একটা চূড়ান্ত রকমের তিরিক্ষি মেজাজে ছিলেন কারেনিন।
তাঁর সারা রাত ঘুম হল না, ক্রোধ তাঁর বেড়ে উঠতে থাকল, সকাল নাগাদ তা পৌঁছলে চূড়ান্ত সীমায়। তাড়াতাড়ি করে পোশাক পরলেন তিনি এবং স্ত্রী ঘুম থেকে উঠেছেন জানা মাত্র ক্রোধের ভরা পেয়ালাটা বয়ে নিয়ে যেতে গিয়ে আবার ছিলকে না পড়ে এই ভয়ে ভয়ে, আর স্ত্রীর সাথে বোঝাপড়ার জন্য যে শক্তিটা প্রয়োজন সেটা যেন ক্রোধের সাথে সাথে খরচা না হয়ে যায় সে ভয় নিয়েও ঢুকলেন তাঁর ঘরে।
আন্না ভাবতেন যে স্বামীকে তিনি খুব ভালো চেনেন, কিন্তু স্বামী ঘরে ঢুকতে তাঁর চেহারা দেখে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন আন্না। ললাটে ভ্রূকুটি, আন্নার দৃষ্টি এড়িয়ে অন্ধকার চোখ নিজের সামনে নিবদ্ধ; দুই ঠোঁট ঘৃণাভরে দৃঢ়সংলগ্ন। তাঁর চলনে, প্রতিভঙ্গিতে, কণ্ঠের ধ্বনিতে এমন একটা সংকল্প ও দৃঢ়তা ছিল যা স্ত্রী আগে তাঁর মধ্যে কখনো দেখেননি। ঘরে ঢুকে, স্ত্রীর সাথে সম্ভাষণ বিনিময় না করে সোজা গেলেন লেখার টেবিলে, চাবি দিয়ে দেরাজ খুলে বললেন, ‘কি চাই আপনার?’ চেঁচিয়ে উঠলেন আন্না।
‘আপনার প্রেমিকের চিঠি’, উনি বললেন।
