হেসে ভ্রন্স্কি বললেন, ‘তুমি ওঁকে এতে সমর্থন করছ কেন বল তো?’
‘সমর্থন করছি না, আমার বয়েই গেল; কিন্তু আমার ধারণা, তুমি নিজে যদি এসব আনন্দ ভালো না বাসতে তাহলে না করে দিলেই পারতে। কিন্তু ইভের সাজে তেরেজাকে দেখে তো তোমার আনন্দই হল…’
‘আবার, আবার সেই দানোটা!’ টেবিলে আন্না যে হাতটা রেখেছিলেন সেটা নিয়ে চুমু খেয়ে বললেন ভ্রন্স্কি। ‘হ্যাঁ, কিন্তু আমি পারি না! তুমি জানো না তোমার পথ চেয়ে থেকে কি কষ্ট পেয়েছি আমি! আমার মনে হয় ঈর্ষাপরায়ণ নই। না, ঈর্ষা নেই আমার, বিশ্বাস করি তোমাকে, যখন তুমি থাকে আমার কাছে; কিন্তু যখন তুমি একা কে জানে কোথায় আমার কাছে অবোধ্য একটা জীবন যাপন কর… ‘
ভ্রন্স্কির কাছ থেকে সরে এলেন আন্না, বোনার কাজ থেকে শেষ ক্রশকাঠিটা খুলে দ্রুত তর্জনীর সাহায্যে বাতির আলোয় ঝলমলে সাদা উল দিয়ে ঘর তুলতে লাগলেন একটার পর একটা, দ্রুত এম্ব্রয়ডারি করা আস্তিনের মধ্যে স্নায়বিক চঞ্চলতায় ঘোরাতে লাগলেন তাঁর তনু মণিবন্ধ।
‘কিন্তু কি ব্যাপার? কারেনিনের সাথে কোথায় দেখা হল তোমার?’ হঠাৎ একটা অস্বাভাবিক ধ্বনি লাগল তাঁর কণ্ঠস্বরে। ‘দরজায় ঢোকার মুখে।’
‘তোমাকে সে অভিবাদন করেছে এমনি করে তো?
মুখ লম্বা করে আধবোজা চোখে আন্না দ্রুত তাঁর মুখের ভাব বদল করতে করতে হাত গুটিয়ে নিলেন আর তাঁর সুন্দর মুখে ভ্রন্স্কি হঠাৎ দেখতে পেলেন সে মুখভাবে কারেনিন তাঁকে অভিবাদন করেছিলেন, ঠিক সেটা। ভ্রন্স্কি হাসলেন আর খিলখিলিয়ে উঠলেন আন্না, যেটা তাঁর প্রধান একটা মাধুর্য।
ভ্রন্স্কি বললেন, ‘আমি একেবারেই ওকে বুঝি না। পল্লীভবনে তোমার কথাগুলো শোনার পর ও যদি তোমাকে ত্যাগ করত, অথবা ডাকত আমাকে, সে এক কথা…কিন্তু এটা আমি বুঝি না; এ অবস্থাটা সে সইতে পারে কমেন করে? কষ্ট যে পাচ্ছে সে তো দেখাই যায়।’
‘ও কষ্ট পাচ্ছে?’ আন্না বললেন বিদ্রূপের সুরে, ‘পুরোপুরি সন্তুষ্ট হয়ে সে আছে।’
‘কেন আমরা সবাই কষ্ট পাচ্ছি যখন সব কিছু হতে পারত দিব্যি খাশা?’
‘শুধু ও কষ্ট পাচ্ছে না। ওকে কি আমার চিনতে বাকি আছে, জানি না কি মিথ্যায় ও আকণ্ঠ ডুবে আছে?… কিছু একটা অনুভূতি থাকলে আমার সাথে ও যেভাবে আছে সেখানে থাকা সম্ভব কি? ওর কোন বোধ নেই, কোন অনুভূতি নেই। কিছু-একটা অনুভূতি থাকলে কি লোকে নিজের পাতকিনী স্ত্রীর সাথে দিন কাটাতে পারে একই বাড়িতে? কথা বলা যায় কি তার সাথে? ‘তুমি’ বলে ডাকা যায়?’
আবার আন্না অনিচ্ছাসত্ত্বেও তাঁকে নকল না করে পারলেন না। ‘তুমি ma chere, আন্না প্রিয়তমা!’
‘ও পুরুষ নয়, মানুষ নয়, ও একটা পুতুল! কেউ তা জানে না। কিন্তু আমি জানি। আমি হলে আমার মত এক স্ত্রীকে অনেক আগেই খুন করতাম, টুকরো টুকরো করে ফেলতাম, বলতাম না ma chere, আন্না। ও মানুষ নয়, মন্ত্রিদপ্তরের একটা যন্ত্র। ও বোঝে না যে আমি তোমার স্ত্রী, ও আমার কাছে পর, ও ফালতু…যাক গে, ও কথা থাক!…’
‘তোমার ভুল হচ্ছে, ভুল হচ্ছে গো’, ওঁকে শান্ত করার চেষ্টায় ভ্রন্স্কি বললেন, ‘তবে সে যাই হোক, ওর সম্পর্কে কথা আর তুলব না। তার চেয়ে বরং বল কি তুমি এ কয়দিন করেছ, কি হয়েছে তোমার? অসুখটা কি, ডাক্তারে কি বলছে?’
আন্না ভ্রন্স্কির দিকে তাকালেন একটা উপহাসের আনন্দ নিয়ে। স্পষ্টতই স্বামীর হাস্যকর কদর্য আরো কিছু দিক তিনি খুঁজে পেয়েছেন, সময়ের অপেক্ষা করছেন সেটা বলার জন্য।
কিন্তু ভ্রন্স্কি বলে চললেন : ‘আমার অনুমান ওটা অসুখে নয়, এটা তোমার ওই অবস্থাটার দরুন। কবে হবে?’ উপহাসের ছটাটা মিলিয়ে গেল আন্নার চোখে, আগের মুখভাবের বদলে দেখা দিল অন্য একটা হাসি, ভ্রন্স্কির কাছে যা অজানা তেনম কিছু-একটার চেতনা আর শান্ত একটা বিষাদ।
‘শিগগিরই, শিগগিরই। তুমি বলছিলে যে আমাদের অবস্থাটা কষ্টকর, তার গিঁট খোলা দরকার। আমার অবস্থাটা কি দুঃসহ তা যদি জানতে, অবাধে, কিছুর পরোয়া না করে তোমাকে ভালোবাসতে পারলে কি না করতে পারতাম আমি! আমিও কষ্ট পেতাম না, তোমাকেও জ্বালাতাম না আমার ঈর্ষা দিয়ে…সেটা ঘটবে শিগগিরই, কিন্তু আমরা যা ভাবছি সেভাবে নয়।’
কিভাবে তা ঘটবে তা ভেবে আন্নার নিজের জন্যই এত মায়া হল যে চোখ তাঁর ভরে উঠল পানিতে। সবটা আর বলতে পারলেন না। বাতির তলে আংটি আর গাত্রবর্ণের ধ্বলিমায় ঝকঝকে হাতটা তিনি রাখলেন ভ্রন্স্কির আস্তিনে। ‘আমরা যা ভাবছি সেভাবে ঘটবে না, চাইছিলাম না কথাটা তোমাকে বলতে, কিন্তু তুমি বলিয়ে ছাড়লে। শিগগিরই সব জট খুলে যাবে আর আমরা সবাই, সবাই স্বস্তি পাব, কষ্ট ভুগতে হবে না আর।’
‘তোমার কথা বুঝতে পারছি না’, ভ্রন্স্কি বললেন এবং বললেন বুঝতে পেরেই।
‘তুমি জিজ্ঞেস করছিলে কখন? শিগগিরই। আমি সেটা পর্যন্ত বেঁচে থাকব না। বাধা দিও না তো!’ তাড়াতাড়ি করে তিনি কথাটা বলে ফেলতে চাইলেন, ‘আমি জানি এটা, একেবারে অভ্রান্ত জানি। আমি মরতে চরেছি আর মরে নিজেকে আর তোমাদের নিষ্কৃতি দিতে পারব বলে খুব খুশি।’
পানি গড়িয়ে এল চোখ বেয়ে; ভ্রন্স্কি তাঁর হাতে ওপর নুয়ে চুমু খেতে লাগলেন। চেষ্টা করলেন তাঁর ব্যাকুলতা চাপা দেবার, যার কোন ভিত্তি নেই বলে তাঁর জানা থাকলেও পারলেন না তা দমন করতে।
