ভ্রন্স্কির জীবনের সমস্ত খুঁটিনাটি আন্না জানতেন। ভ্রন্স্কি বলবেন ভাবছিলেন গতকাল সারা রাত তিনি ঘুমাননি ফলে আজ দিনে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন, কিন্তু আন্নার সুখাবিষ্ট আকুল মুখখানার দিকে তাকিয়ে সে-কথা বলতে তাঁর লজ্জা হল। বললেন যে, প্রিন্সের চলে যাবার রিপোর্ট দেবার জন্য তাঁর দপ্তরে যেতে হয়েছিল।
‘তাহলে এখন চুকল? উনি চলে গেছেন?’
‘হ্যাঁ, চুকেছে। ভাবতে পারবে না—কি অসহ্য লেগেছিল আমার।’
‘কেন? এ তো তোমাদের, যুবকদের সবারই দৈনন্দিন জীবন’, আন্না বললেন দুই ভুরু জুড়ে; টেবিলে পড়ে থাকা বোনার কাজটা নিয়ে, ভ্রন্স্কির দিকে না তাকিয়ে তা থেকে ক্রুশকাঠি খুলতে লাগলেন।
‘সে জীবন আমি অনেকদিন ফেলে এসেছি’, আন্নার মুখভাবের পরিবর্তনে অবাক হয়ে এবং তার অর্থ বোঝার চেষ্টা করে ভ্রন্স্কি বললেন, ‘স্বীকার করতেই হবে’, ঘনবদ্ধ সাদা তাঁর দাঁত উদ্ঘাটিত হল হাসিতে, ‘এ সপ্তাহে সে জীবনটাকে যেন দেখেছি আয়নায়, আর দেখে ভালো লাগেনি।’
বোনার কাজটা আন্না হাতে ধরে রেখেছিলেন কিন্তু বুনছিলেন না, ভ্রন্স্কির দিকে তাকালেন একটা বিচিত্র, ঝকঝকে, সৌহাদহীন দৃষ্টিতে।
‘আজ সকালে লিজা এসেছিল আমার কাছে, কাউন্টেস লিদিয়া ইভানোভনা সত্ত্বেও এখনো আমার কাছে আসতে ভয় পায় না ওরা’, টিপ্পনী কাটলেন আন্না, ‘তোমাদের এথেন্স সন্ধ্যার গল্প করল। কি জঘন্য!’
‘আমি শুধু বলতে চাইছিলাম যে…’
আন্না তাঁকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, ‘তেরেজাও ছিল, যাকে তুমি জানতে আগে?’
‘আমি বলতে চাইছিলাম…’
‘কি জঘন্য তোমরা, পুরুষেরা! কেন তোমরা কল্পনা করতে পারো না যে মেয়েরা এটা ভুলতে পারে না।’ ক্রমেই উত্তেজিত হয়ে বলতে শুরু করলেন তিনি এবং তাতে করে ফাঁস করে ফেললেন তাঁর উষ্মার কারণ, ‘বিশেষ করে যে মেয়ে তোমার জীবনের কিছুই জানে না। কি আমি জানি? কি আমি জানতে পেরেছি?’ বললেন আন্না, ‘যা আমাকে তুমি বল। কিন্তু কোত্থেকে জানব যে আমাকে তুমি সত্যি চলেছ…’
‘আন্না, তুমি আমাকে অপমানিত করছ। আমাকে কি বিশ্বাস কর না তুমি? তোমাকে কি আমি বলিনি যে আমার মনে এমন কোন চিন্তা নেই যা তোমার কাছে মেলে ধরি না?’
‘হ্যাঁ, তা ঠিক’, স্পষ্টই ঈর্ষা ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করে আন্না বললেন, ‘শুধু তুমি যদি জানতে আমার পক্ষে কি কষ্টকর। বিশ্বাস করি বৈকি, বিশ্বাস করি তোমাকে…তা কি তুমি বলতে যাচ্ছিলেন?’
কিন্তু কি তিনি বলতে চাইছিলেন, ভ্রন্স্কির তা চট করে মনে এল না। ঈর্ষার এই যে প্রকোপ ইদানীং আন্নার মধ্যে দেখা যাচ্ছে ঘন ঘন, সেটাতে ভয় পেতেন তিনি যতই তা চাপা দেবার চেষ্টা করুন, তাঁর প্রতি ভালোবাসাই সে ঈর্ষাটার কারণ, তা জানা থাকা সত্ত্বেও এতে আন্নার প্রতি তাঁর উষ্ণতা শীতল হয়ে আসত। কতবার তিনি নিজেকে বলেছেন যেভাবে ভালোবাসতে পারেন তেমন এক নারী, ভালোবাসাই যাঁর কাছে জীবনের অন্য সমস্ত সৌভাগ্যের চেয়ে বড়, কিন্তু আন্নাকে অনুসরণ করে ভ্রন্স্কি যখন এসেছিলেন মস্কো থেকে তখনকার চেয়ে সে সুখ এখন তাঁর কাছে অনেক সুদূর। তখন উনি নিজেকে ভাবছিলেন অসুখী কিন্তু সুখ ছিল তাঁর সামনে; এখন কিন্তু তিনি অনুভব করছেন সেরা সুখটা ইতিমধ্যেই পেছনে পড়ে গেছে। প্রথম দিকে তিনি আন্নাকে যেরকম দেখেছিলেন, মোটেই তিনি তেমন নন। নৈতিক এবং দৈহিক, উভয় ক্ষেত্রেই তাঁর পরিবর্তন ঘটেছে অবনতির দিকে। বেশ স্থূলকায়া হয়ে গেছেন তিনি আর অভিনেত্রী তেরেজার কথা যখন বলছিলেন তখন মুখে তাঁর একটা আক্রোশ ফুটে উঠেছিল যাতে বিকৃত হয়ে গিয়েছিল মুখ। একটা ফুল ছেঁড়ার পর তা শুকিয়ে নষ্ট করেছে তা আর বিশেষ খুঁজে পাচ্ছে না, সেভাবে আন্নাকে দেখছিলেন ভ্রন্স্কি। কিন্তু তা সত্ত্বেও উনি টের পাচ্ছিলেন যে তাঁর প্রেম যখন প্রবলতর ছিল তখন প্রচণ্ড ইচ্ছা করলে সে প্রেম উৎপাটিত করতে পারতেন হৃদয় থেকে, কিন্তু এখন, এই মুহূর্তে যা তাঁর মনে হচ্ছে, আন্নার প্রতি তিনি আর প্রেম অনুভব করছেন না, তা সত্ত্বেও তাঁর জানা ছিল যে আন্নার সাথে তাঁর সম্পর্ক ছিন্ন হবার নয়।
‘তা বল বল, প্রিন্স সম্পর্কে কি বলতে চাইছিলে? আমি তাড়িয়ে দিয়েছি, হ্যাঁ, তাড়িয়ে দিয়েছি পিশাচটাকে’, যোগ দিলেন। পিশাচ বলতে ওঁরা বোঝাতেন ঈর্ষা, ‘তা প্রিন্স সম্পর্কে কি বলতে শুরু করেছিলে? কেন অত কষ্টকর লেগেছিল তোমার কাছে?’
‘এহ্, অসহ্য!’ চিন্তার হারানো সূত্রটা ধরার চেষ্টা করতে করতে ভ্রন্স্কি বললেন, ‘ঘনিষ্ঠ পরিচয় থেকে ওঁর খারাপটাই বেশি চোখে পড়ে। যদি ওঁর কোন সংজ্ঞা দিতে হয়, তাহলে বলব উন চমৎকার হৃষ্টপুষ্ট একটা পশু প্রদর্শনীতে যারা প্রথম পুরস্কারে পদকটা পেয়ে থাকে, তার বেশি কিছু নয়।’ ভ্রন্স্কি বললেন বিরক্তিতে আর তাতে আগ্রহী হয়ে উঠলেন আন্না।
‘বাঃ, তা বলছ কেন?’ আপত্তি করলেন আন্না, ‘যতই হোক অনেক কিছু তো দেখেছেন উনি, শিক্ষিত লোক?’
‘ওটা একেবারে অন্য ধরনের শিক্ষা-ওদের শিক্ষা। বোঝা যায়, উনি শিক্ষিত শুধু এজন্য যাতে শিক্ষাকেই ঘৃণা করার সুযোগ পান, পাশবিক পরিতৃপ্তিটা ছাড়া যে ঘৃণা ওঁরা করেন সব কিছুকেই।
‘তোমরা সবাই তো ওই পাশবিক পরিতৃপ্তিটা ভালোবাসো’, আন্না বললেন আর ভ্রন্স্কি আবার লক্ষ্য করলেন তাঁকে এড়িয়ে যাওয়া একটা অন্ধকার দৃষ্টি।
