ভ্রন্স্কির সে শীতে পদোন্নতি হয়েছিল কর্নেল, রেজিমেন্ট ছেড়ে দিয়ে তিনি থাকছিলেন একা। জলযোগ সেরে তিনি তখনই শুয়ে পড়লেন সোফায় এবং গত কয়েকদিন যে বিছ্ছিরি দৃশ্যগুলো তিনি দেখেছেন, সেগুলো মিনিট পাঁচেক মনে করতে গিয়ে তা গোলমাল হয়ে জুড়ে গেল আন্না আর সেই চাষীটার ছবির সাথে, যে শিকারে ভালুক খোঁজায় একটা বড় ভূমিকা নিয়েছিল। ঘুমিয়ে পড়লেন ভ্রন্স্কি। তারপর ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে জেগে উঠলেন অন্ধকারে, তাড়াতাড়ি করে মোমবাতি জ্বালালেন। ‘কি ব্যাপার? কি হল? কি অমন ভয়ংকর দেখলাম স্বপ্নে? ও হ্যাঁ, ওই চাষীটা, ছোটখাট নোংরা একটা লোক, এলোমেলো দাড়ি, নুয়ে পড়ে কি-একটা যেন করছিল, হঠাৎ কি সব অদ্ভুত কথা বলে উঠল ফরাসি ভাষায়, তাছাড়া তো স্বপ্নে আর কিছু দেখিনি’, মনে মনে ভাবলেন তিনি, ‘কিন্তু সেটা অত ভয়াবহ হয়ে উঠল কেমন করে?’ চাষীটা আর তার দুর্বোধ্য ফরাসি কথাগুলো জলজ্যান্ত মনে পড়ল তাঁর, আতকের একটা হিমপ্রবাহ নামল পিঠ বেয়ে।
‘যতসব বাজে ব্যাপার!’ ভ্রন্স্কি এই ভেবে ঘড়ি দেখলেন। ততক্ষণে সাড়ে আটটা বেজে গেছে। চাকরকে ডেকে তিনি তাড়াতাড়ি পোশাক পরলেন, স্বপ্নের কথা একদম ভুলে, শুধু দেরি হয়ে গেছে এই অনুশোচনায় পীড়িত হয়ে তিনি বেরিয়ে এলেন অলিন্দে। কারেনিনদের গাড়ি বারান্দার কাছে গিয়ে তিনি ঘড়ি দেখলেন : ন’টা বাজতে দশ মিনিট। ঢোকার মুখে ছাইরঙের জুড়ি ঘোড়া জোতা উঁচু সংকীর্ণ একটা গাড়ি। আন্নার গাড়িটা তিনি চিনতে পারলেন। ভাবলেন, ‘আন্না আমার কাছে যেতে চাইছিল, সেই ভালো হত। এ বাড়িতে ঢুকতে আমার বিছছিরি লাগে। যাক, লুকিয়ে তো আর থাকতে পারি না। এই ভেবে, কিছুতে যার লজ্জা পাবার নেই, তেমন লোকের যে চালটা তিনি ছোট থেকে আয়ত্ত করেছেন, সেই চালে তিনি স্লেজ থেকে নেমে গেলেন দরজার দিকে। হাতে একটা কম্বল নিয়ে দরজা খুলে বেরিয়ে এল চাপরাশি, গাড়িটাকে ডাকল। খুঁটিনাটি লক্ষ্য করতে অভ্যস্ত না হলেও ভ্রন্স্কির নজরে পড়ল যে চাপরাশি তাঁর দিকে চাইছে অবাক হয়ে। একেবারে দরজার সামনে প্রায় তাঁর ধাক্কা লাগতে যাচ্ছিল কারেনিনের সাথে। ওভারকোটের বীবর ফার কলারের তলে ঝকঝক করা সাদা গলবন্ধী আর কালো টুপি পরা তাঁর চোপসানো রক্তহীন মুখখানার ওপর সোজা এসে পড়ল গ্যাসের আলো। কারেনিনের নিশ্চল নিষ্প্রভ চোখ নিবদ্ধ হল ভ্রন্স্কির মুখের ওপর। ভ্রন্স্কি মাথা নুইয়ে অভিবাদন করলেন, কারেনিন গাল কুঁচকে হাত তুলে টুপি ছুঁয়ে বেরিয়ে গেলেন। ভ্রন্স্কি দেখলেন উনি ফিরে না তাকিয়ে উঠলেন গাড়িতে, জানালা দিয়ে কম্বল আর দূরবীন নিয়ে আড়ালে গেলেন। ভ্রন্স্কি ঢুকলেন প্রবেশ-কক্ষে। ভুরু ওঁর কোঁকানো, চোখ ঝিকঝিক করছে আক্রোশ আর গর্বের ছটায়। ভাবলেন, ‘আচ্ছা এক অবস্থায় পড়েছি! ও যদি লড়, নিজের মান বাঁচাত, তাহলে আমি কিছু একটা করতে পারতাম, প্রকাশ করতাম নিজের চিত্তাবেগ; কিন্তু এ যে দুর্বলতা, নাকি পাষণ্ডতা… ও আমাকে ফেলছে প্রবঞ্চকের অবস্থায় যেক্ষেত্রে আমি চাইনি এবং চাচ্ছি না প্রবঞ্চক হতে।’
ভেদে’র বাগানে আন্নার কাছে নিজের মনোভাব ব্যক্ত করার পর অনেক পরিবর্তন হয়েছে ভ্রন্স্কির চিন্তাধারায়। যে আন্না তাঁকে দিয়েছে সব কিছু, ভবিষ্যতের সব কিছু মেনে নিয়ে কেবল তাঁর কাছ থেকে আশা করেছেন তাঁর ভাগ্যলিপি, অজ্ঞাসারে সেই আন্নার দুর্বলতার বশীভূত হয়ে তিনি বহুদিন এ ভাবনা ছেড়ে দিয়েছেন যে তাঁদের সম্পর্কে অবসান হওয়া সম্ভব, যা তিনি ভেবেছিলেন তখন। তাঁর উচ্চাভিলাষী সব পরিকল্পনা আবার গেছে গৌণ স্থানে। যে ক্রিয়াকলাপগুলোয় সবই ছিল সুনির্দিষ্ট, তা ছেড়ে যাচ্ছেন বুঝেও তিনি আত্মসমর্পণ করলেন নিজের হৃদয়াবেগের কাছে আর সে আবেগ তাঁকে ক্রমেই বেশি করে বাঁধতে লাগল আন্নার সাথে।
প্রবেশ-কক্ষ থেকেই তাঁর কানে এল আন্নার অপসৃয়মাণ পদশব্দ। এস্কি বুঝলেন যে আন্না তাঁর প্রতীক্ষা করছিলেন, কান পেতে ছিলেন, এখন ফিরে যাচ্ছেন ড্রয়িং-রুমে।
‘না!’ চেঁচিয়ে উঠলেন আন্না, প্রথম শব্দটাতেই চোখ তাঁর ভরে উঠল পানিতে, ‘না, এভাবে চলতে থাকলে এটা ঘটবে আরো, আরো অনেক আগে!’
‘কি হল?’
‘কি? আমি অপেক্ষা করে থাকছি, কষ্ট সইছি, এক ঘণ্টা, দু’ঘণ্টা…না, করব না!… তোমার সাথে ঝগড়া করতে আমি পারব না। নিশ্চয় আসা তোমার পক্ষে সম্ভব হয়নি। না, ঝগড়া করব না!’
দু’হাত তাঁর কাঁধে রেখে আন্না বহুক্ষণ প্রগাঢ় উল্লসিত, সেইসাথে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে দেখতে লাগলেন ভ্রন্স্কিকে। যে কয়দিন তিনি তাঁকে দেখেন নি তাঁর মধ্যে কি দাঁড়িয়েছে সেটা নিরীক্ষণ করতে লাগলেন তাঁর মুখ দেখে। প্রতিবার সাক্ষাতের সময় যা হয়, ভ্রন্স্কি সম্পর্কে তাঁর কল্পিত ধারণাকে (যা অতুলনীয় রকমের ভালো, আর বাস্তবে অসম্ভব) ভ্রন্স্কি আসলে যা, তার সাথে মেলাতে লাগলেন।
তিন
ওঁরা বাতির নিচে টেবিলের কাছে বসার পর আন্না জিজ্ঞেস করলেন, ‘ওর সাথে দেখা হল তোমার? তোমার দেরি করে আসার এই প্রতিফল।
‘হ্যাঁ, কিন্তু কি ব্যাপার? ওঁর তো পরিষদে থাকার কথা?
‘পরিষদে গিয়েছিল; ফিরে এসে আবার কোথায় যেন গেল। ওটা কিছু নয়। ও কথা আর তুলো না। তুমি ছিলে কোথায়? সারাক্ষণ প্রিন্সের সাথে?’
