‘তোমার ভাড়া গাড়ি আছে? চমৎকার। আমি নিজের গাড়িটা ছেড়ে দিয়েছি।’
সারাটা রাস্তা দু’বন্ধু চুপ করে রইলেন। কিটির মুখের এই ভাবপরিবর্তনের অর্থ কি, সেই কথা ভাবছিলেন লেভিন, কখনো নিজেকে আশ্বস্ত করছিলেন এই বলে যে আশা আছে, কখনো হতাশ হয়ে উঠছিলেন এবং পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছিলেন যে আশা করাটা পাগলামি, তাহলেও কিটির হাসি আর তাহলে দেখা হবে’ কথাটায় আগে তিনি যা ছিলেন তার চেয়ে নিজেকে ভিন্ন একটা লোক বলে অনুভব করছিলেন তিনি।
পথে যেতে যেতে অবলোনস্কি খাবারের মেনু ঠিক করছিলেন।
লেভিনকে বললেন, তুমি তো তুর্বো ভালোবাসো?
লেভিন জিজ্ঞেস করলেন, ‘এ্যাঁ? ত্যুর্বো? হ্যাঁ, আমি দারুণ ভালোবাসি ত্যুর্বো।
আন্না কারেনিনা – ১.১০
দশ
লেভিন যখন অবলোনস্কির সাথে হোটেলে ঢুকলেন তখন অবলোনস্কির মুখভাবের কয়েকটা বৈশিষ্ট্য, মুখের আর গোটা দেহের জ্যোতির যেন-বা একটা সংযত লক্ষ্য না করে তিনি পারেননি। অবলোনস্কি তার ওভারকোট খুলে, টুপিটা মাথায় বাঁকা করে বসিয়ে গেলেন ডাইনিং-রুমে ফ্রক-কোট পরা ভোয়ালে হাতে যে তাতারগুলো তাকে হেঁকে ধরেছিল, তাদের অর্ডার দিতে লাগলেন। যেমন সর্বত্র তেমনি এখানেও তাঁকে সানন্দে স্বাগত করছিল যে পরিচিত, ডাইনে বায়ে তাদের উদ্দেশে মাথা নুইয়ে তিনি গেলেন ব্যুফেতে, মৎস্য সহযোগে ভোদকা পান করলেন এবং কাউন্টারের ওধারে উপবিষ্টা এবং রিবন, লেস, আর কেশকুণ্ডলী শোভিত রঙমাখা ফরাসিনীকে এমন কিছু বললেন যাতে এমন কি সেও অকপটে হেসে উঠল। লেভিন ভোকা খেলেন না শুধু এজন্য যে, আগাগোড়া পরের চুল আর চালের পাউডার আর প্রসাধনী ভিনিগার-এ বানানো ফরাসিনীটি তার কাছে অপমানকর ঠেকেছিল। একটা নোংরা জায়গা থেকে সরে যাবার মত করে তিনি তাড়াতাড়ি করে চলে গেলেন তার কাছ থেকে। তাঁর সমস্ত বুকে ভরে উঠেছিল কিটির স্মৃতিতে, চোখে তার জ্বলজ্বল করছিল জয় আর সুখের হাসি।
‘এখানে হুজুর, এখানে হুজুর কেউ বিরক্ত করবে না আপনাকে, সবচেয়ে বেশি করে তাঁকে যে হেঁকে ধরেছিল সেই বুড়োচুলো তাতারটা বলল, পাছাটা তার প্রকাণ্ড, ফ্রক-কোটের টেইল-দুটো তাতে ফাঁক হয়ে গেছে। আসুন হুজুর’, লেভিনকে সে ডাকল, অবলোনস্কির অতিথির দিকে মনোযোগ দিয়ে সে সম্মান দেখাতে চাইল অবলোনস্কিকে।
ব্রোঞ্জের দেয়াল-রাতির তলে আগে থেকেই টেবিল-ক্লথে ঢাকা গোল টেবিলটার ওপর মুহূর্তে টাটকা আরেকটা টেবিল-ক্লথ বিছিয়ে সে অর্ডারের প্রতীক্ষায় অবলোনস্কির সামনে দাঁড়িয়ে রইল তোয়ালে আর মেনু-কার্ড হাতে নিয়ে।– আপনি যদি বলেন হুজুর, তাহলে আলাদা একটা কেবিনের ব্যবস্থা হতে পারে। তার মহিলার সাথে প্রিন্স গলিৎসিন এখনই চলে যাচ্ছেন। ঝিনুকের টাটকা মাংস পেয়েছি আমরা।’
‘অ, ঝিনুক।
অবলোনস্কি একটু ভাবলেন।
মেনু-কার্ডে আঙুল রেখে তিনি বললেন, ‘পরিকল্পনাটা বদলাব নাকি, লেভিন?’ মুখে তার গুরুতর অনিশ্চিতি ফুটে উঠল, ‘ঝিনুক কি ভালো হবে? তুমি ভেবে দেখো!
‘ফ্লেসবার্গ ঝিনুক, হুজুর, অস্টেন্ড নয়।
‘ফ্লেসবার্গ নয় হল, কিন্তু টাটকা কি
কাল পেয়েছি।’
‘তাহলে ঝিনুক দিয়েই শুরু করব নাকি, তারপর গোটা পরিকল্পনাটা বদলানো যাবে? হ্যাঁ?
‘আমার কাছে সবই সমান। আমার পক্ষে সবচেয়ে বাঁধাকপির স্যুপ আর শস্যদানার মণ্ড। তবে সে তো আর এখানে পাওয়া যাবে না।
‘আ-লা-রুস মণ্ড’ শিশুর ওপর ধাই-মা যেভাবে খুঁকে আসে, সেভাবে লেভিনের ওপর ঝুঁকে জিজ্ঞেস করলে তাতার।
না, ঠাট্টা নয়। তুমি যা পছন্দ করবে, তাই ভালো। স্কেটিং করে ছুটোছুটি করেছি, খিদে পেয়েছে, তারপর অবলোনস্কির মুখে অসন্তোষের ছায়া দেখে যোগ করলেন, ভেবো না তোমার রুচির তারিফ আমি করি না। তৃপ্তির। সাথে আমি দিব্যি খাব।’
‘তা আর বলতে! তবে যাই কও, এটাই জীবনের একটা পরিতৃপ্তি’, বললেন অবলোনস্কি, তাহলে ভায়া, আমাদের দাও বিশ, নাকি সেটা কম হবে। আচ্ছা, তিরিশটা ঝিনুক আর মূল দিয়ে সিদ্ধ সুপ..’
‘প্রেস্তানিয়ের’, তাতার লুফে নিল কথাটা, কিন্তু অবলোনস্কির ইচ্ছে ছিল না খাদ্যের ফরাসি নাম জানিয়ে সে তুষ্টি পাক।
মূল দেওয়া, বুঝেছ। তারপর গাঢ় সস্ সমেত ত্যুর্বো, তারপর… রোস্টবিফ, কিন্তু দেখো যেন ভালো করে বানানো হয়। তা ছাড়া কাপলুন চলতে পারে, আর বয়াম-জাত শবজি।’
ফরাসি মেনু অনুসারে খাদ্যের নাম না করার যে অভ্যাস ছিল অবলোনস্কির সেটা মনে রেখে তাতার আর নামগুলোর পুনরাবৃত্তি করল না, কিন্তু মেনু-কার্ড অনুসারে সে গোটা অর্ডারটা আওড়ে নিয়ে তৃপ্তি পেল ‘সুপ। প্রেস্তানিয়ের, অ্যার্বো সস বামার্শে, পুলা-আ লেস্ত্রাগ, মাসেদুয়া দ্য ফুই…’ এবং তখনই স্প্রিঙের মত একটা মলাট বাঁধানো মেনু-কার্ড রেখে মদের অন্য কার্ডটা নিয়ে এল অবলোনস্কির কাছে।
‘কি খাওয়া যায়?
‘তোমার যা ইচ্ছে তাই, তবে অল্প, শ্যাম্পেন’, বললেন লেভিন।
‘সেকি? প্রথমেই? তবে ঠিকই বলেছ। সাদা লেবেল ভালো লাগে তোমার?
‘কাশে ব্লাঁ’, খেই ধরল তাতার।
‘বেশ, ঝিনুকের সাথে ওই মার্কাটা আনো, পরে দেখা যাবে।
‘জি আচ্ছ। আর টেবিল-ওয়াইন কিছু?
ন্যুই দাও। না, বরং ক্লাসিকাল শাবলিই ভালো।
‘জ্বি আচ্ছা। আপনার পনিরের অর্ডার দেবেন কি?
