ভ্রন্স্কির শীতের মাঝামাঝি সময় একটা সপ্তাহ খুবই বিছ্ছিরিভাবে কাটে। পিটার্সবুর্গে আগত এক বিদেশী প্রিন্সের ভার পড়েছিল তাঁর ওপর, রাজধানীর দ্রষ্টব্যাদি দেখাতে হবে তাঁকে। ভ্রন্স্কি নিজেই একজন দর্শনধারী ব্যক্তি, তদুপরি নিজের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ না করে এই ধরনের লোকদের সাথে চলাফেরায় তিনি অভ্যস্ত, তাই তাঁকে দেওয়া হয় প্রিন্সটির দায়িত্ব। কিন্তু দায়টা তাঁর কাছে খুবই গুরুভার মনে হল। রাশিয়ায় এটা কি তিনি দেখেছেন, স্বদেশে এমন প্রশ্নের জবাব দেবার মত কোন কিছুই বাদ দিতে প্রিন্স রাজী নন; তাছাড়া নিজেও তিনি যথাসম্ভব রুশী উপভোগাদিতে ইচ্ছুক। দুটো ব্যাপারেই তাঁকে পথ দেখাবার ভার ভ্রন্স্কির। রোজ সকালে তাঁরা যেতেন দর্শনীয় স্থান দেখতে, সন্ধ্যায় যোগ দিতেন জাতীয় প্রমোদে। প্রিন্সদের ক্ষেত্রেও যা অসাধারণ, তেমন একটা স্বাস্থ্য ছিল এই প্রিন্সটির; ব্যায়াম করে আর শরীরের ভালো যত্ন নিয়ে তিনি এমন মাত্রায় উঠেছিলেন যে উপভোগের আধিক্য সত্ত্বেও তিনি ছিলেন সবুজ, চেকনাই, ওলন্দাজ শসার মত তাজা। অনেক ঘুরেছেন তিনি এবং আবিষ্কার করেছেন যে বর্তমান কালের অনায়াস যোগাযোগ পথের একটা প্রধান লাভ হল বিদেশের প্রমোদ সম্ভোগ। তিনি স্পেনে গেছেন, সেখানে সেরিনাদ গেয়েছেন, দহরম- মহরম করেছেন ম্যান্ডোলিন-বাদিকা এক স্পেনীয়ার সাথে। সুইজারল্যান্ডে গিয়ে তিনি শ্যাময় মেরেছেন। ইংল্যান্ডে লাল ফ্রক-কোট পরে তিনি বেড়া ডিঙিয়েছেন এবং দু’শ উড়ন্ত ফিজ্যান্ট শিকার করেছেন। তুরস্কে রাত কাটিয়েছেন হারেমে, ভারতবর্ষে হাতির পিঠে চেপেছেন, এখন বিশেষ করে যা রুশী তেমন সমস্ত উপভোগের স্বাদ নিতে চান।
এরূপ ব্যক্তি পরিবেশন-কর্তা হয়ে নানান লোকের প্রস্তাবিত সমস্ত রুশী প্রমোদের মধ্যে থেকে বাছাই করতে খুবই মুশকিলে পড়েছিলেন ভ্রন্স্কি। হল অশ্বারোহণ, সরুচাকলি ভোজন, ভালুক শিকার, তিন ঘোড়ায় টানা স্লেজে চাপা, জিপসি দর্শন, রুশী কায়দায় পাত্র ভেঙেচুরে পানোৎসব। অসাধারণ অনায়াসে রুশ মেজাজ রপ্ত করে নিলেন প্রিন্স, পাত্র ভর্তি ট্রে ভাঙলেন, বেদেনীকে কোলে বসালেন এবং মনে হল যেন জিজ্ঞেস করছেন : সে কি, মাত্র এটুকুনেই রুশী মেজাজ শেষ?
আসলে সমস্ত রুশী উপভোগের মধ্যে প্রিন্সের সবচেয়ে ভালো লেগেছিল ফরাসি অভিনেত্রী, ব্যালে নর্তকী আর সাদা ছাপ দেওয়া শ্যাম্পেন। প্রিন্স নামক জাতটার সাথে মেলামেশার অভ্যাস ছিল ভ্রন্স্কির, কিন্তু হয়ত নিজেই তিনি ইদানীং বদলে গেছেন বলে, কিংবা প্রিন্সটিকে তিনি দেখলেন বড় বেশি কাছ থেকে, এ সপ্তাহটা তাঁর মনে হয়েছিল সাঙ্ঘাতিক কষ্টকর। গোটা এই সপ্তাহটা তিনি অবিরাম নিজেকে অনুভব করেছেন সেই লোকের মত, যে বিপজ্জনক এক উন্মাদের ভার পেয়েছে, যাকে সে ভয় পায়, আবার এ ভয়ও হয় যে তার সাহচর্যে নিজেরই মাথা খারাপ না হয়ে যায়। নিজে অপমানিত না হবার জন্য কঠোর আনুষ্ঠানিকতার সুরে মুহূর্তের জন্যও ঢিলা না দেবার প্রয়োজনীয়তা অনুক্ষণ অনুভব করতেন ভ্রন্স্কি। ভ্রন্স্কিকে স্তম্ভিত করে প্রিন্সের জন্য রুশী উপভোগের ব্যবস্থা করতে যারা সোৎসাহ এত খাটত যে কহতব্য নয়, ঠিক তাদের সাথেই প্রিন্সের আচরণ ছিল অবজ্ঞাসূচক। যে রুশ নারীদের অনুধাবন করার বাসনা ছিল প্রিন্সের, তাদের সম্পর্কে তাঁর মতামতে একাধিকবার রাগে লাল হতে হয়েছে ভ্রন্স্কিকে। প্রিন্সকে যে ভ্রন্স্কির বিশেষ রকম দুর্বিসহ লেগেছিল তার প্রধান কারণটা কিন্তু এই যে তাঁর মধ্যে ভ্রন্স্কি দেখতে পাচ্ছিলেন নিজেকেই। আর সে আয়নায় যা তিনি দেখলেন সেটা তাঁর আত্মপ্রীতির তোয়াজ করেনি। প্রিন্স ছিলেন অতি নিবোধ, অতি আত্মবিশ্বাসী, অতি সুস্থ-সবল, এবং অতি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন একটা লোক, তার বেশি কিছু নয়। তিনি ছিলেন জেন্টলম্যান তা ঠিক, ভ্রন্স্কি সেটা অস্বীকার করতে পারেন না। তিনি ছিলেন ওপরওয়ালাদের কাছে সুস্থির, অপদলেহী, সমান-সমানদের সাথে আচরণ নিঃসঙ্কোচ ও সহজ আর নিম্নতনদের ক্ষেত্রে অবজ্ঞাভরে উদার। ভ্রন্স্কি নিজেও এরকম এবং মনে করতেন সেটা একটা বড় গুণ, কিন্তু প্রিন্সের তুলনায় তিনি নিম্নতর, ফলে তাঁর প্রতি এই অবজ্ঞাসূচক উদারকা ক্ষেপিয়ে তুলতে তাঁকে।
‘নির্বোধ গোমাংস! আমিও কি অমনি নাকি?’ ভাবতেন ভ্রন্স্কি।
সে যা হোক, সপ্তম দিনে প্রিন্সের মস্কো যাত্রার আগে বিদায় নিয়ে ও ধন্যবাদ পেয়ে ভ্রন্স্কি সুখীই হলেন যে অস্বস্তিকর অবস্থা আর অপ্রীতিকর আয়নাটা থেকে রেহাই পেয়েছেন। ভালুক শিকার, যেখানে সারা রাত তাঁরা রুশী হিম্মতের নমুনা দেখেছেন, সেখান থেকে ফিরে রেল-স্টেশনে তিনি বিদায় নেন প্রিন্সের কাছ থেকে।
দুই
একদিন ভ্রন্স্কি বাড়িতে ফিরে এসে আন্নার চিঠি পেলেন। তিনি লিখেছেন : ‘আমার শরীর ভালো নেই এবং মন ভালো নেই। আমি বাড়ি থেকে বেরোতে পারছি না কিন্তু আপনাকে না দেখেও আর থাকতে পারছি না। সন্ধ্যায় আসুন আমার কাছে। সাতটায় কারেনিন যাবেন পরিষদে, সেখানে থাকবেন দশটা পর্যন্ত।’ স্বামী তাঁকে বাড়িতে আসতে মানা করেছেন, অথচ সে দাবি আগ্রহ্য করে আন্না সোজাসুজি তাঁকে ডাকছেন নিজের কাছে, এই অদ্ভুত ব্যাপারটা নিয়ে মিনিটখানেক ভেবে ভ্রন্স্কি সেখানে যাবেন বলে ঠিক করলেন।
