‘সেই তো বলছি, অন্যের ধারণাগুলো নিয়ে তার যেখানে শক্তি সব ছেঁটে ফেলে বোঝাতে চাইছ যে এটা নতুন কিছু’, নিকোলাই বলল রেগে, গলার টাইয়ে দমকা টান দিয়ে।
‘আমার ভাবনার সাথে ও-সবের কোন মিল নেই…’
‘ওদের ক্ষেত্রে’, আক্রোশে চোখে ঝকঝকিয়ে বিদ্রূপভরে হেসে নিকোলাই লেভিন বলল, ‘ওদের ক্ষেত্রে এর অন্তত একটা রূপ আছে, বলা যায় জ্যামিতিক, আছে স্পষ্টতা, নিশ্চয়তা। হয়ত এটা ইউটোপিয়া। কিন্তু ধরা যাক, অতীতের সব কিছু হল মোছা বোর্ড অর্থাৎ অতীতের সব কিছু মুছে ফেলা যায়, সম্পত্তি নেই, পরিবার নেই, শ্রমেরও তাহলে একটা সুব্যবস্থা হল। কিন্তু তোমার কিছুই নেই…’
‘কেন তুমি মিশিয়ে ফেলছ? আমি কমিউনিস্ট ছিলাম না কখনো।’
‘আর আমি ছিলাম এবং দেখতে পাচ্ছি যে ওর সয় হয়নি এখনো, তবে এটা যুক্তিযুক্ত, এর ভবিষ্যৎ আছে, প্ৰথম দিককার। খ্রিস্টধর্মের মত।’
‘আমি শুধু বলতে চাইছি যে শ্রমশক্তিকে দেখতে হলে প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের পরীক্ষামূলক দৃষ্টিকোণ থেকে, তাকে অধ্যয়ন করতে হবে, বুঝতে হবে তার বৈশিষ্ট্য, তাহলে…’
‘ওটা একেবারে খামোকাই। এ শক্তি তার বিকাশের মাত্রা থেকে নিজেই নিজের ক্রিয়াকলাপের নির্দিষ্ট একটা রূপ খুঁজে পাবে। আগে সর্বত্র ছিল ক্রীতদাস, পরে পত্তনিদার (metayers), আমাদের এখানেও আছে ভাগ-চাষ, আছে প্রজাবিলি, ক্ষেতমজুরি, আর কি চাও তুমি?’
লেভিন এ কথাগুলোয় হঠাৎ ক্ষেপে উঠলেন, কেননা মনে মনে তিনি ভয় পাচ্ছিলেন যে কথাটা সত্যি, সত্যি এই যে তিনি কমিউনিজম আর বর্তমান রূপগুলোর মধ্যে একটা ভারসাম্য চাইছেন, যা বড় একটা সম্ভব নয়।
‘আমি উৎপাদনশীলতার সাথে কাজ করার উপায় খুঁজছি নিজের জন্যেও, কৃষি-শ্রমিকের জন্যেও। এমন ব্যবস্থা আমি করতে চাই যে…’ উত্তেজিত হয়ে বললেন তিনি।
‘কিছুই তুমি করতে চাও না; স্রেফ সারা জীবন যেমন কাটিয়েছ, তেমনি চাও মৌলিকার দেখাতে, এটা দেখাতে যে তুমি চাষীদের নেহাৎ শোষণ করছ না, একটা বড় ধ্যান-ধারণা নিয়ে করছ।’
‘তাই ভাবছ? যাক গে, রেহাই দাও আমাকে!’ লেভিন জবাব দিলেন, টের পাচ্ছিলেন যে তাঁর বাঁ গালের পেশী লাফাচ্ছে, ঠেকানো যাচ্ছে না।
‘তোমার কোন একটা দৃঢ় প্রত্যয় কখনো ছিল না, এখনো নেই। শুধু আত্মাভিমান তুষ্ট করতে পারলেই তোমার হল।’
‘তা বেশ, শুধু রেহাই দাও আমাকে!’
‘তাই দেব! সময় হয়ে গেছে অনেকদিন, চুলোয় যা তুই! ভয়ানক আফশোস হচ্ছে যে এখানে এসেছি!’
পরে বড় ভাইকে শান্ত করার জন্য লেভিন যত চেষ্টাই করুন, নিকোলাই শুনতে চাইল না, বলল যে আলাদা থাকাই অনেক ভালো, ভাই স্পষ্ট বুঝলেন যে, বেঁচে থাকা এখন স্রেফ অসহ্য হয়ে উঠেছে বড় ভাইয়ের পক্ষে।
কনস্তান্তিন যখন আবার তার কাছে এসে অস্বাভাবিক সুরে অনুরোধ করলেন, কোন ব্যাপারে তাকে আঘাত দিয়ে থাকলে সে যেন মাপ করে, নিকোলাইয়ের যাত্রার আয়োজন তখন সারা হয়ে গেছে।
‘আহ্, কি উদারতা!’ হেসে বলল নিকোলাই, ‘তুমি-ই ঠিক, এই যদি তোমার জানতে ইচ্ছে হয়, তা সে তুষ্টি আমি তোমাকে দিতে পারি। তুমি ঠিক, তাহলেও আমি চলে যাব।’
ঠিক যাবার মুখে নিকোলাই চুম্বন করল ভাইকে, হঠাৎ একটা অদ্ভুত গুরুগম্ভীর দৃষ্টিতে তাঁর দিকে তাকিয়ে বলল : ‘আমার সম্পর্কে খারাপ কিছু ভেবো না রে কনস্তান্তিন’, গলা তার কেঁপে উঠল।
এই একটা কথাই শুধু অকপটে বলা। লেভিন বুঝলেন যে এতে করে সে বলতে চাইছে : ‘তুমি দেখতে পাচ্ছ আর জানো যে আমার দিন ফুরিয়েছে, হয়ত আমাদের দেখা হবে না আর।’ লেভিন সেটা বুঝলেন, চোখ ফেটে পানি এল তাঁর। বড় ভাইকে আরো একবার চুম্বন করলেন তিনি, কিন্তু কিছু বলতে পারলেন না, বলার সমর্থ্য ছিল না।
বড় ভাই চলে যাবার দু’দিন পরে লেভিনও যাত্রা করলেন বিদেশে। ট্রেনে দেখা হল কিটির চাচাতো ভাই শ্যেরবাৎস্কির সাথে। ভারি সে অবাক হল লেভিনকে মনমরা দেখে। জিজ্ঞেস করলে : ‘কি হয়েছে তোমার?
‘কিছুই না, এমনি। আনন্দের ব্যাপার দুনিয়ায় কম।
‘কম মানে? কোন-এক মুনসিঙ্গেনে যাওয়ার চেয়ে এসো না আমার সাথে প্যারিসে। দেখবে, কেমন মজা।
‘না, আমার পালা শেষ। মরার সময় হয়েছে!
‘বলিহারি!’ হেসে বললে শ্যেরবাৎস্কি, ‘আর আমি শুরু করার জন্যে মাত্র তৈরি হচ্ছি।’
‘হ্যাঁ, কিছুদিন আগে আমিও তাই ভাবতাম, কিন্তু এখন জানি যে শিগগিরই মরব।’
তিনি ইদানীং যা সত্যি করেই ভাবছিলেন, সেই কথাটাই বললেন লেভিন। সব কিছুতেই তিনি দেখছিলেন মৃত্যু অথবা তার সান্নিধ্য। কিন্তু সেই জন্যই যে ব্যাপারটা তিনি শুরু করেছেন সেটা তাঁকে আকৃষ্ট করছিল আরো বেশি। মৃত্যু না-আসা পর্যন্ত কোন রকমে বেঁচে থাকতে হবে। তাঁর কাছে সব কিছু আচ্ছন্ন করেছে অন্ধকার, আর এই অন্ধকারের জন্যই তিনি অনুভব করছিলেন যে সে অন্ধকারে চলার একমাত্র সূত্র হল তাঁর কাজ, সে সূত্রটা তিনি আঁকড়ে ধরছিলেন প্রাণপণে।
আন্না কারেনিনা – ৪.১
এক
কারেনিন দম্পতি একই বাড়িতে বাস করেন। প্রতিদিনই তাঁদের দেখা হয়, কিন্তু একেবারেই বাইরের লোকের মত। কারেনিন নিয়ম করে নিয়েছিলেন যে, রোজ দেখা দেবেন স্ত্রীর সামনে—যাতে চাকর-বাকররা কিছু-একটা অনুমান করে নেবার সুযোগ না পায়, তবে বাড়িতে আহার এড়িয়ে যেতেন। এ বাড়িতে ভ্রন্স্কি কখনো আসতেন না কিন্তু বাইরে আন্না তাঁর সাথে দেখা করতেন আর স্বামীও তা জানতেন। তিনজনের পক্ষেই অবস্থাটা কষ্টকর ছিল এবং সেটা একদিনের জন্যও তাঁদের কেউ সইতে পারতেন না যদি তাঁদের এই আশা না থাকত যে এটা বদলাবে, এটা কেবল একটা সাময়িক শোকাবহ অসুবিধা যা কেটে যাবে। কারেনিন আশা করছিলেন যে, এই হৃদয়াবেগ কেটে যাবে যেমন কেটে যায় সব কিছু, সবাই ব্যাপারটা ভুলে যাবে, তাঁর নাম থাকবে অকলঙ্কিত। আন্না, এ অবস্থার জন্য যিনি দায়ী, যাঁর কাছে অবস্থাটা সবার চেয়ে কষ্টকর, তিনি শুধু আশা নয়, সুদৃঢ় বিশ্বাস রেখেছিলেন যে শিগগিরই জট খুলবে, পরিষ্কার হয়ে যাবে। অবস্থাটার জট কিসে খুলবে সেটা তিনি একেবারেই জানতেন না, কিন্তু খুবই নিশ্চিত ছিলেন যে এবার কিছু-একটা ঘটবে শিগগিরই ভ্রন্স্কিও অজ্ঞাতসারে তাঁকে মেনে নিয়ে ভাবছিলেন তাঁর অপেক্ষা রাখে না এমন কিছু-একটা ঘটতে বাধ্য যা সমস্ত মুশকিলের আসান করে দেবে।
