মৃত্যু, সব কিছুরই যা শেষ, অপ্রতিরোধ্য শক্তিতে তা ভেসে উঠল তাঁর সামনে। আর সে মৃত্যু রয়েছে এখানেই, তাঁর ভালোবাসার পাত্র বড় ভাইয়ের মধ্যে, ঘুমের ভেতর যে কাতরাচ্ছে, অভ্যাসবশে কখনো সৃষ্টিকর্তা, কখনো শালা বলে উঠতে যার দ্বিধা নেই, আগে তাঁর যা মনে হয়েছিল, সে মৃত্যু মোটেই তেমন সুদূর নয়। সে মৃত্যু আছে তাঁর নিজের মধ্যেই, এটা তিনি টের পাচ্ছেন। আজ যদি না হয় তো আগামী কাল, আগামী কাল না হলে, নয় তিরিশ বছর পরে, কি এসে যায় তাতে? আর কি বস্তু এই অনিবার্য মৃত্যু সেটা তিনি শুধু জানতেন না তাই নয়, কখনো তার কথা ভাবেননি তাই নয়, সে নিয়ে ভাবতে তিনি পারতেনই না, সাহসই হত না তাঁর।
‘আমি খাটছি, কিছু-একটা করতে চাইছি, অথচ ভুলে গিয়েছিলাম যে সবই শেষ হয়ে যায়, আছে মৃত্যু।’
অন্ধকারে খাটে মুচড়ে মুচড়ে বসে তিনি চেপে ধরে থাকছিলেন হাঁটু, ভাবনার চাপে দম বন্ধ হয়ে আসছিল। কিন্তু যত তীব্র হচ্ছিল তাঁর চিন্তা, ততই কেবল পরিষ্কার হয়ে উঠছিল যে ব্যাপারটা নিঃসন্দেহে তাই, সত্যিই তিনি ভুলে গিয়েছিলেন, খেয়াল করেননি জীবনের ছোট্ট এই একটা ঘটনা যে মরণ হবে, শেষ হবে সব কিছু, কিছুই শুরু করার মানে হয় না, কিছুই সাহায্য করবে না এক্ষেত্রে। এটা ভয়ংকর, কিন্তু ঘটনাটা তাই-ই।
‘কিন্তু আমি যে এখনো বেঁচে। কি করি এখন, কি করি?’ হতাশায় বলে উঠলেন তিনি। মোমবাতি জ্বেলে সন্তর্পণে তিনি উঠে দাঁড়ালেন, আয়নার কাছে গিয়ে দেখতে লাগলেন নিজের মুখ আর চুল। হ্যাঁ, রগে দেখা যাচ্ছে পাকা চুল। হাঁ করলেন। পেছন দিককার দাঁত খারাপ হতে শুরু করেছে। অনাবৃত করলেন নিজের পেশীবহুল হাত। হ্যাঁ, শক্তি আছে অনেক। কিন্তু নিকোলাইয়েরও ছিল শক্তসমর্থ দেহ, জীর্ণ ফুসফুসে এখন সে ধুঁকছে। হঠাৎ তাঁর মনে পড়ল ছেলেবেলাকার একটা দৃশ্য : বাচ্চারা শুত একসাথে, অপেক্ষায় থাকত কখন ফিওদর বগদানিচ বাইরে বেরিয়ে যান। অমনি বালিশ ছোঁড়াছুঁড়ি করত তারা, আর হাসত, হাসত এমন বেপরোয়া হয়ে যে ফিওদর বগদানিচকে রীতিমত ভয় পেলেও কূল ছাপিয়ে ওঠা জীবনের সে ফেনিল আনন্দকে থামানো যেত না। ‘আর এখন ওই তো বেঁকে যাওয়া, ফাঁপা বুকখানা… এদিকে আমি জানি না কেন আর কি আমার হবে…’
‘খ্যাক, খ্যাক! ধুঃ শ্যালা! কি করছ ওখানে? ঘুমাচ্ছ না কেন?’ ভাইয়ের কণ্ঠস্বর শোনা গেল।
‘এমনি, কে জানে, ঘুম আসছে না।’
‘আমি কিন্তু বেশ ভালো ঘুমিয়েছি। ঘামছিও না। দ্যাখ না কামিজটা নেড়ে। ঘাম আছে?’
লেভিন হাতড়ে দেখলেন, চলে গেলেন পার্টিশনের ওপাশে, মোমবাতি নিবিয়ে দিলেন, কিন্তু ঘুমাতে পারলেন না অনেকক্ষণ। কিভাবে জীবন কাটানো যায় এ প্রশ্নটা তাঁর কাছে খানিকটা পরিষ্কার হয়ে উঠতে না উঠতেই দেখা দিয়েছে সমাধানাতীত এক প্রশ্ন : মৃত্যু
‘হ্যাঁ, ও মরবে, হ্যাঁ, মরবে বসন্ত নাগাদ, কিন্তু কি করে সাহায্য করা যায় ওকে? কি ওকে বলতে পারি? এ ব্যাপারে কি জানি আমি? এটা যে আছে, সে কথা তো ভুলেই গিয়েছিলাম।’
বত্রিশ
অনেক আগেই লেভিন লক্ষ্য করেছিলেন যে, কেউ মাত্রাতিরিক্ত রকমে মেনে নিচ্ছে, সায় দিচ্ছে বলে যখন নিজেরই অস্বস্তি বোধ হয়, তারপর সে লোক কিন্তু অতি সত্বর তার মাত্রাতিরিক্ত দাবি-দাওয়া আর ছিদ্রান্বেষণে হয়ে ওঠে অসহ্য। তিনি অনুভব করছিলেন যে বড় ভাইয়ের ক্ষেত্রেই ব্যাপারটা তাই ঘটবে। এবং সত্যিই নিকোলাইয়ের গোবেচারা ভাব বেশি টিকল না। পরের দিন সকালেই সে হয়ে উঠল খিটখিটে, তন্নতন্ন করে খুঁত ধরতে লাগল ভাইয়ের, ঘা দিচ্ছিল তাঁর সবচেয়ে ঘাতপ্রবণ জায়গাগুলোয়।
লেভিনের নিজেকেই দোষী মনে হচ্ছিল, অথচ সেটা শুধরে উঠতে পারছিলেন না। তিনি টের পাচ্ছিলেন যে ওঁরা ভান না করে ঠিক কি ভাবছেন, অনুভব করছেন শুধু সেটাই যদি অকপটে বলতেন, তাহলে তাঁরা খোলাখুলি তাকিয়ে দেখতে পারতেন পরস্পরের দিকে, আর কনস্তান্তিন শুধু বলতেন : ‘তুমি মরছ, মরছ, মরছ!’ আর নিকোলাই শুধু জবাব দিত : ‘জানি মরছি : কিন্তু ভয়, ভয়, ভয় পাচ্ছি!’ আর প্রাণ থেকে কথা বললে আর কিছু বলার থাকত না। কিন্তু সেভাবে চলা যায় না, আর কনস্তান্তিন যেহেতু যা তিনি সারা জীবন চেষ্টা করেও পারেননি তারই চেষ্টা করতেন, অন্যে অনেকে যা চমৎকার চালাতে পারত যা ছাড়া বাঁচা চলে না, তাই তিনি অনবরত চেষ্টা করতেন যা ভাবছেন তা না- বলতে আর টের পেতেন যে সেটা মিথ্যা শোনাচ্ছে, বড় ভাই সেটা ধরতে পারছে আর তিতিবিরক্ত হয়ে উঠছে সে জন্য।
তৃতীয় দিন নিকোলাই ভাইকে বাধ্য করল তাঁর পরিকল্পনা আবার শোনাতে এবং শুধু তার সমালোচনা করল না, ইচ্ছে করেই তা গুলিয়ে ফেলতে লাগল কমিউনিজমের সাথে।
‘তুমি শুধু পরের ধারণা ধার করেছ আর তা বাঁকিয়ে-চুরিয়ে লাগাতে চাইছ যেখানে তা লাগার নয়।’
‘আমি যে তোমাকে বলছি, ওর সাথে এটা কোন মিল নেই। ওরা ব্যক্তিগত মালিকানা, পুঁজি, উত্তরাধিকার—এ সবের ন্যায্যতা অস্বীকার করে, কিন্তু এই প্রধান প্রেরণাটা অস্বীকার না করে’ (এ ধরনের শব্দ ব্যহার লেভিনের নিজের কাছে অরুচিকর, কিন্তু নিজের কাজে মেতে ওঠার পর থেকে অনিচ্ছাসত্ত্বেও তিনি ঘন ঘন এই অরুশ কথাগুলোর আশ্রয় নিচ্ছেন) ‘আমি চাই শুধু শ্রমের নিয়ামন।’
