বিছ্ছিরি এই মনোভাবটার জন্য নিজেই নিজের ওপর চটে গিয়ে লেভিন ছুটে গেলেন প্রবেশ-কক্ষে। বড় ভাইকে কাছ থেকে দেখামাত্র কিন্তু ব্যক্তিগত হতাশার ভাটা মিলিয়ে গিয়ে তার জায়গায় দেখা দিল করুণা। নিকোলাই ভাইকে তার শীর্ণতা ও রুগ্ণতায় আগে যত ভয়ংকরই লাগুক এখন সে আরো শীর্ণ, আরো রুগ্ণ। এ যেন চর্মাবৃত এক কঙ্কাল।
প্রবেশ-কক্ষে লম্বা রোগা গলাটা ঝটকাতে ঝটকাতে মাফলার খুলছিল সে। অদ্ভূত একটা করুণ্যে হাসল। দীন, বাধ্য সে হাসি দেখে লেভিন অনুভব করলেন যে তাঁর গলার মধ্যে দলা পাকিয়ে উঠছে।
‘এই তো চলে এলাম তোমার কাছে’, ভাইয়ের মুখের ওপর থেকে মুহূর্তের জন্যও চোখ না সরিয়ে ভাঙা ভাঙা গলায় নিকোলাই বলল, ‘অনেকদিন থেকেই আসতে চাইছিলাম, কিন্তু শরীর ভালো যাচ্ছিল না, এখন কিন্তু বেশ ভালো হয়ে উঠেছি’, দাড়িতে বড় বড় রোগা হাত বুলিয়ে বলল সে।
‘বেশ করেছ!’ লেভিন বললেন। আর চুমু খেতে গিয়ে ঠোঁটে বড় ভাইয়ের শরীরের শুষ্কতা অনুভব করে আরো ভয়ঙ্কর লাগল তাঁর, দেখলেন নিজের চোখের সামনে বড় ভাইয়ের বড় বড়, অদ্ভূত রকমের জ্বলজ্বলে চোখ।
কয়েক সপ্তাহ আগে লেভিন বড় ভাইকে লিখেছিলেন যে জমির ছোট যে অংশটুকু অবণ্টিত পড়ে ছিল তার বিক্রি বাবদ প্রায় দু’হাজার রুবলের মত তার ভাগটা সে পেতে পারে।
নিকোলাই বলল যে সে এখন এসেছে টাকাটা নিতে এবং প্রধান কথা নিজের নীড়ে থাকতে, মাটি ছুঁতে যাতে পুরাকালের মহাবীরদের মত আসন্ন ক্রিয়াকলাপগুলোর জন্য শক্তি সঞ্চয় করতে পারে। নিকোলাই আরো কুঁজো হয়ে গেলেও এবং নিজের দৈর্ঘ্যের তুলনায় আশ্চর্যরকম শীর্ণ হয়ে থাকলেও তার গতিবিধি বরাবরের মতই ক্ষিপ্র ও ঝটকা- মারা। লেভিন তাকে নিয়ে গেলেন স্টাডিতে।
অসম্ভব যত্ন সহকারে বড় ভাই পোশাক বদলাল, যা আগে কখনো দেখা যায়নি, পাতলা হয়ে আসা সোজা সোজা চুলগুলোকে আঁচড়াল, তারপর হেসে ওপরে উঠল।
মেজাজ তার অতি স্নেহশীল আর শরীফ, বাল্যকালে লেভিন তাকে বে-রকমটা দেখেছিলেন। এমন কি কজ্নিশেভের কথাও সে বলল বিনা বিদ্বেষ। আগাফিয়া মিখাইলোভনাকে দেখে একটু ঠাট্টা করল, জিজ্ঞেস করল পুরানো চাকর-বাকরদের খবরাখবর। পারফেন দেনিসিচ মারা গেছে মুনে বিচলিত হল সে; একটা ভীতি ফুটে উঠল মুখে; তবে সাথে সাথেই সেটা সে বেড়ে ফেলল।
‘ও তো বৃদ্ধ হয়ে পড়েছিল’, এই বলে প্রসঙ্গটা সে পালটাল, ‘হ্যাঁ, তোমার এখানে একমাস কি দু’মাস থাকব, তারপর মস্কোর। জানো, নিয়াকভ আমাকে একটা চাকরি দেবে বলে কথা দিয়েছে, আমিও কাজই নেব। এখন আমি জীবনটাকে চালাব অন্যভাবে’, বলে চলল সে, ‘জানো, ওই নচ্ছার মহিলাটাকে তাড়িয়ে দিয়েছি।’
‘মারিয়া নিকোলায়েভনাকে? সে কি?’
‘এহ্, ও একটা নচ্ছার মহিলা! আমার বড় ক্ষতি করেছে।’ কিন্তু কি ক্ষতি করেছে সেটা সে বলল না। সে তো আর বলতে পারে না যে মারিয়া নিকোষায়েভনাকে সে ভাগিয়েছে চা’টা কড়া হয় নি বলে, এবং প্রধান কথা, তাড়িয়েছে কারণ ও তার দেখাশোনা করত এমনাবে যেন সে একটা রোগী। ‘তা ছাড়া মোটের ওপর আমি এখন চাই জীবনটা একেবারে বদলে নিতে। বলা বাহুল্য সবার মত আমিও আহাম্মকি করেছি, তবে টাকাকড়িটা সবচেয়ে তুচ্ছ ব্যাপার, ওর জন্যে আমার আফসোস নেই। শুধু স্বাস্থ্য থাকলেই হল আর স্বাস্থ্যটা, দয়াময় সৃষ্টিকর্তা, ভালো হয়েছে।’
লেভিন শুনছিলেন আর ভাবছিলেন, কিন্তু ভেবে পাচ্ছিলেন না কি বলবেন। নিকোলাইও সম্ভবত একই ব্যাপার বোধ করছিল; লেভিনের অবস্থা কেমন চলছে তা নিয়ে জিজ্ঞেসাবাদ করতে লাগল সে; নিজের কথা বলতে গিয়ে খুশি হলেন লেভিন, কেননা সে কথা তিনি বলতে পারেন ভান না করে। নিজের পরিকল্পনা আর কার্যকলাপের কথা তিনি বললেন বড় ভাইকে।
বড় ভাই শুনছিল, কিন্তু স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছিল যে ওতে তার আগ্রহ নেই
এই দুটো মানুষ এত আপন, এত ঘনিষ্ঠ যে সামান্যতম একটা ভঙ্গি, গলার স্বর উভয়কেই বলে দিচ্ছিল কথা যা বলতে পারে তার চেয়ে অনেক বেশি।
এখন ওঁদের দুজনেরই শুধু একটা চিন্তা-নিকোলাইয়ের রোগ ও আসন্ন মৃত্যু-যাতে অন্যসব চিন্তা চাপা পড়েছে। কিন্তু ওঁদের কেউই সে কথা তোলার সাহস পাচ্ছিলেন না, তাই যে একটা জিনিসে তাঁদের মন নিমগ্ন সেটা প্ৰকাশ না করে আর যা-কিছুই তাঁরা বলুন-না কেন, সবই হচ্ছিল মিথ্যে। সন্ধ্যার যে অবসান হল, এখন শুতে যেতে হয়, এতে লেভিনের এত আনন্দ আর কখনো হয়নি। বাইরের কোন লোকের সাথে বা সরকারী কোন সাক্ষাৎকারে এত অস্বাভাবিক ও অসৎ তিনি হননি আর কখনো। এবং এই অস্বাভাবিকতার চেতনা আর তার জন্য অনুশোচনা তাঁকে করে তুলছিল আরো অস্বাভাবিক। নিজের মুমূর্ষ, প্রিয়তম বড় ভাইয়ের জন্য কান্না পাচ্ছিল তাঁর, অথচ কিভাবে সে বেঁচে থাকবে সে আলাপ তাঁকে কিনা শুনে যেতে হচ্ছিল, সায় দিতে হচ্ছিল তাতে।
বাড়িটা ছিল স্যাৎসেঁতে, শুধু একটা ঘরই গরম করা, তাই লেভিন বড় ভাইকে শোয়ালেন নিজেরই শোবার ঘরে, পার্টিশনের ওপাশে।
বড় ভাই শুল, ঘুম এসেছিল কি আসেনি যাই হোক, এপাশ-ওপাশ করছিল রোগীদের মত আর কাশছিল, কাশি যখন থাতমে চাইছল না, কি যেন বিড়বিড় করছিল। মাঝে মাঝে যখন দীর্ঘশ্বাস ছাড়ছিল, বলছিল : ‘ওহ্ সৃষ্টিকর্তা!’ মাঝে মাঝে যখন শ্লেষ্মায় শ্বাস রুদ্ধ হয়ে আসছিল, বিরক্তিতে বলে উঠছিল, ‘ধুঃ শালা!’ এসব শুনতে শুনতে অনেকক্ষণ ঘুম আসেনি লেভিনের। চিন্তাগুলো তাঁর আসছি নানা রকমের, কিন্তু সব চিন্তার শেষটা একই : মৃত্যু।
