লেভিন এসব ভাবতে ভাবতে অন্ধকারে বাড়িতে এসে পৌঁছলেন।
গোমস্তা বেনিয়ার কাছে গিয়ে ফিরে এসেছে গমের জন্য টাকার একাংশ নিয়ে, জমাদারের সাথে কথা বলে নিয়েছে, পথে আসতে আসতে সে শুনেছে যে অন্য লোকদের শস্য সর্বত্রই এখনো খেতেই থেকে গেছে, তাই তাদের যে একশ’ ষাট গাদি তোলা হয়নি সেটা অন্যদের তুলনায় কিছুই নয়।
লেভিন খাওয়া সেরে সচরাচরের মত ইজিচেয়ারে বসলেন বই নিয়ে এবং পড়তে পড়তেই ভেবে চললেন তাঁর রচনা প্রসঙ্গে আসন্ন সফরটার কথা। আজ তাঁর উদ্যোগের পুরো তাৎপর্য বিশেষ স্পষ্টরূপে প্রতীয়মান হয়েছে তাঁর কাছে, আপনা থেকেই তাঁর চিন্তার মর্মার্থ প্রকাশের মত বাক্যাবলি দেখা দিতে থাকল তাঁর মনে। ভাবলেন, ‘এগুলো লিখে রাখতে হবে, এগুলো হবে সংক্ষিপ্ত মুখবন্ধ যা আগে আমি ভেবেছিলাম নিষ্প্রয়োজন।’ লেখার টেবিলে যাবার জন্য তিনি উঠে দাঁড়ালেন, পায়ের কাছে শুয়ে থাকা লাস্কাও টানটান হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে তাকাল তাঁর দিকে, যেন জিজ্ঞেস করছে কোথায় যাওয়া হবে। কিন্তু লেখার ফুরসত হল না, কেননা মণ্ডলেরা এল তাঁর কাছে। লেভিনও তাদের সাথে দেখা করতে প্রবেশ-কক্ষে গেলেন।
মণ্ডলদের পরে, অর্থাৎ পরের দিনের কাজের নির্দেশাদি দেওয়া এবং তাঁর কাছে যেসব চাষীর কাজ ছিল তাদের সাথে দেখা করার পর লেভিন তাঁর স্টাডিতে গিয়ে লেখায় বসলেন। লাস্কা শুয়ে পড়ল টেবিলের নিচে; আগাফিয়া মিখাইলোভনা তাঁর নিজের জায়গায় মোজা বুনতে বসলেন।
কিছুক্ষণ লেখার পর হঠাৎ অসাধারণ তীক্ষ্ণতায় তাঁর মনে ভেসে উঠল কিটি, তার প্রত্যাখ্যান, তাকে শেষ দেখার স্মৃতি। উঠে দাঁড়িয়ে তিনি পায়চারি করতে লাগলেন ঘরে।
‘আরে, ছটফট করার কিছু নেই’, আগাফিয়া মিখাইলোভনা তাঁকে বললেন, ‘ঘরে বসে আছেন কেন? যখন যাবেন ঠিক করেছেন তখন ওই গরম ফোয়ারাগুলোর কাছে গেলেই পারেন।’
‘পরশুই যাচ্ছি আগাফিয়া মিখাইলোভনা। কাজগুলো শেষ করতে হবে। কাজ আবার কি! কৃষকদের আপনি উপকার করেছেন কি কম! লোকে বলে, জার এর জন্যে আপনাকে শিরোপা দেবে। সত্যি অবাক মানি, কৃষকদের জন্যে আপনার কি এত দরদ!’
‘তাদের জন্যে নয়, যা করছি তা নিজের জন্যে।’
বিষয়-আশয় নিয়ে লেভিনের পরিকল্পনার সমস্ত খুঁটিনাটি জানা ছিল আগাফিয়া মিখাইলোভনার। লেভিন প্রায়ই তাঁর ভাবনার সূক্ষ্ম দিকগুলোর কথাও তাঁকে বলতেন, তাঁর সাথে তর্ক আর তাঁর দৃষ্টিভঙ্গির সাথে অমত কম হত না। কিন্তু এখন উনি যা বললেন তা একেবারে ভিন্ন অর্থে বুঝলেন আগাফিয়া মিখাইলোভনা।
তিনি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, ‘নিজের আত্মার জন্যে, তা ভালো, সেই কথাই তো ভাবা চাই। এই তো আমাদের পারফেন দেনিসিচ্ ‘ক’ অক্ষর গোমাংস, কিন্তু যেভাবে মরল, সৃষ্টিকর্তা করুন যেন সবাই মরতে পারে সেভাবে’, বললেন তিনি সম্প্রতি বিগত এক বাঁধা চাক সম্পর্কে, …. আশীর্বাদ নেওয়া, শেষকৃত্য করা, সবই করে গেল।’
‘সে কথা আমি বলছি না’, লেভিন বললেন, ‘আমি বলছি যে এ সব করছি নিজের লাভের জন্যে। চাষীরা যদি ভালো করে খাটে, তাতে আমারই লাভ।’
‘তা আপনি যতই করুন, চাষী যখন আলসে তখন সবই ভস্মে ঘি ঢালা। বিবেক থাকলে কাজ করবে, না থাকলে কিছুই হবার নয়।
‘হ্যাঁ, কিন্তু আপনি নিজেই তো বলছেন যে গোয়ালের কাজে ইভান ভালো করে খাটতে শুরু করেছে।’
‘আমি শুধু একটা কথাই বলি’, আগাফিয়া মিখাইলোভনা জবাব দিলেন স্পষ্টতই হঠাৎ করে নয়, নিজের চিন্তার কঠোর সঙ্গতি অনুসরণ করে, ‘আপনার বিয়ে করা উচিত, এই হল কথা!’
নিজেই তিনি এইমাত্র যা ভাবছিলেন, আগাফিয়া মিখাইলোভনা ঠিক সেটারই উল্লেখ করায় বিরক্ত ও আহত করলেন লেভিন। ভুরু কোঁচকালেন তিনি, কোন জবাব না দিয়ে আবার বসলেন কাজে, কাজটার তাৎপর্য নিয়ে যা ভাবছিলেন, আবার তা আওড়ালেন মনে মনে। স্তব্ধতার মধ্যে মাঝে মাঝে তাঁর কানে আসছিল আগাফিয়া মিখাইলোভনার উল বোনার কাঁটার শব্দ, আর যা তিনি মনে করতে না সেটা মনে পড়ে গিয়ে আবার ভুরু কোঁচকালেন।
ঘণ্টি আর কাদায় গাড়ি টানার চাপা শব্দ শোনা গেল ন’টার সময়।
‘আমাদের এখানে কেউ তাহলে অতিথি এল, আপনার আর বেজার লাগবে না’, উঠে দরজার দিকে এগোতে এগোতে বললেন আগাফিয়া মিখাইলোভনা না, ‘যে কোন অতিথিই আসুক, তাতে খুশি লেভিন।’
একত্রিশ
লেভিন সিঁড়ির অর্ধেকটা পর্যন্ত নেমে প্রবেশ-কক্ষে পরিচিত একটা কাশির শব্দ শুনলেন কিন্তু নিজের পদক্ষেপের শব্দের দরুন শুনলেন অস্পষ্টভাবে আর আশা করলেন যে ভুল শুনেছেন; তারপর চোখে পড়ল পূর্ণ দৈর্ঘ্যে হাড্ডিসার মূর্তিটা, আত্মপ্রবঞ্চনার অবকাশ আর রইল না, তাহলেও তখনো আশা করতে লাগলেন যে তাঁর ভুল হয়েছে, লম্বা যে মানুষটা কাশতে কাশতে কোট খুলছে সে তাঁর বড় ভাই নিকোলাই নয়।
লেভিন বড় ভাইকে ভালোবাসতেন কিন্তু তার সাথে একত্রে থাকাটা সব সময়ই হত একটা যন্ত্রণার ব্যাপার। আর এখন তাঁর মনে যে চিন্তা আসছিল আর আগাফিয়া মিখাইলোভনার যে উক্তিগুলোর প্রভাবে তিনি যখন একটা অস্পষ্ট গোলমেলে অবস্থার মধ্যে রয়েছে, তখন ভাইয়ের সাথে সাক্ষাৎটা মনে হল বিশেষ কষ্টকর। হাসিখুশি, সুস্থ, অনাত্মীয় এক অতিথি যে তাঁর অন্তরের মনোযোগ বিক্ষিপ্ত করতে পারবে বলে তিনি আশা করেছিলেন তার বদলে তাঁকে দেখতে হচ্ছে কিনা বড় ভাইকে, যে তাঁকে আদ্যন্ত চেনে, তাঁর অতি অন্তর্নিহিত ভাবনাগুলোকে যে খুঁচিয়ে তুলবে, সব কিছু পুরোপুরি খুলে বলতে বাধ্য করবে তাঁকে। আর সেটা তিনি চাইছিলেন না।
