ব্যাপারটা একবার হাতেই নেওয়া হয়েছে বলে তার বিষয়বস্তুর ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক সব কিছু লেভিন পড়লেন পুঙ্খানুপুঙ্খ করে এবং স্থির করলেন শরৎকালে বিদেশে যারে অকুস্থলে ব্যাপারটা অনুধাবন করতে যাতে বিভিন্ন প্রশ্নে তাঁর যা প্রায়ই ঘটোছ এই প্রশ্নটায় তা যেন আর না হয়। সহালাপীর কথাটা সবে বুঝতে শুরু করেছেন আর নিজেরটা বলবেন, হঠাৎ শুনলেন কিনা : ‘আর কাউফমান, জোন্স, দ্যুয়া, আর মিচেলি? আপনি ওঁদের পড়েননি। পড় ন; এই প্রশ্নটারই বিচার করেছেন ওঁরা।’
এখন উনি পরিষ্কার দেখতে পেলেন যে, তাঁকে কিছু বলার নেই কাউফমান আর মিচেলির দেখতে জানেন কি তিনি চান। রাশিয়ার আছে চমৎকার জমি, চমৎকার কৃষি-শ্রমিক, কোন কোন ক্ষেত্রে মাঝপথের ওই চাষীটির মত কৃষি – শ্রমিক আর জমি উৎপাদন করে প্রচুর, কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রে যখন পুঁজি লগ্নি করা হয় ইউরোপীয় ধরনে, তখন ফলন হয় কম আর এটা ঘটছে শুধু এই কারণে যে কৃষি-শ্রমিকেরা খাটতে চায় এবং ভালো খাটে কেবল, তাদের স্বকীয় ধরনে, তাদের বিরোধিতাটা আপতিক নয়, নিত্যকার, জনগণের ধাতটাই তার ভিত্তি। তিনি ভাবছিলেন, বিশাল অকর্ষিত ভূমিতে বাস পাতা ও তা হাসিল করা যে রুশ জনগণের নির্বন্ধ তারা যতদিন না তা হাসিল হচ্ছে ততদিন সে জন্য প্রয়োজনীয় এসব পদ্ধতি আঁকড়ে আছে আর সে পদ্ধতিগুলো সাধারণত যা ভাবা হয় তেমন খারাপ কিছু নয়। তিনি চাইছিলেন তত্ত্বগতভাবে বইয়ে আর ব্যবহারিকভাবে তাঁর খামারে সেটা প্রমাণ করবেন তিনি।
আন্না কারেনিনা – ৩.৩০
ত্রিশ
সেপ্টেম্বর মাসের শেষে গোয়াল বানাবার জন্য কাঠ এনে ফেলা হল, গরুর দুধের মাখন বেচে তার লাভ ভাগাভাগি করা হল। কার্যক্ষেত্রে ব্যাপারটা চলতে লাগল চমৎকার, অন্তত লেভিনের তাই মনে হল। সমস্ত জিনিসটা তাত্ত্বিকভাবে প্রতিপন্ন করা এবং রচনাটা শেষ করা যা লেভিনের কল্পনায় অর্থশাস্ত্রে শুধু বিপ্লবই ঘটাবে না, তাকে একেবারে নিশ্চিহ্ন করে করবে একটা নতুন শাস্ত্র-কথা, জমির সাথে জনগণের সম্পর্ক-এর জন্য প্রয়োজন ছিল বিদেশে গিয়ে এই দিক দিয়ে কি করা হয়েছে তা দেখা এবং সেখানে যে যা-কিছু করা হয়েছে সেটা যা দরকার তা নয়-এর অকাট্য প্রমাণ আবিষ্কার করা। গম সরবরাহের জন্য অপেক্ষা করছিলেন লেভিন, টাকাটা পেলেই বিদেশে চলে যাবেন, কিন্তু শুরু হল বৃষ্টি, জমিতে যে শস্য আর আলু তখনো বাকি তা তোলা গেল না, থেমে গেল সমস্ত কাজ, এমন কি গম সরবরাহও। রাস্তায় দুর্গম কাদা; বানের তোড়ে ভেসে গেল দুটো হাওয়া-কল, ক্রমেই খারাপ হতে থাকল আবহাওয়া।
৩০ সেপ্টেম্বর সূর্য দেখা দিল, এবার আবহাওয়া ভালো যাবে এই আশায় লেভিন যাত্রার জন্য মন স্থির করে তৈরি হতে লাগলেন। গম বোঝাই করার হুকুম দিলেন তিনি, বেনিয়ার কাছে গোমস্তাকে পাঠালেন টাকার জন্য, এবং চলে যাবার আগে শেষ নির্দেশাদি দানের জন্য নিজে গেলেন আবাদ দেখতে।
সব কাজ সেরে চামড়ার আচ্ছাদন বেয়ে গড়ানো পানির ধারায় ঘাড়ে পায়ে ভিজে, তবে ভারি চাঙ্গা হয়ে খোশমেজাজে সন্ধ্যার দিকে তিনি ঘরে ফিরলেন। সন্ধ্যায় আবহাওয়া হয়েছিল খারাপ। সর্বাঙ্গ ভেজা, কান আর মাথা ঝটকানো ঘোড়াটা এমন ঘা খাচ্ছিল শিলাবৃষ্টিতে যে পাশকে হয়ে চলছিল সেটা। কিন্তু হুডের তলে দিব্যি ছিলেন লেভিন, খুশি হয়ে তিনি তাকাচ্ছিলেন চারপাশে, কখনো খানা দিয়ে ছুটন্ত ঘোলা পানির স্রোতের দিকে, কখনো ন্যাড়া ডালের ডগায় লেগে থাকা পানির ফোঁটা, কখনো সেতুর তক্তায় পড়ে থাকা শিলার সাদা ছোপ, কখনো আনগ্ন বিচ গাছের চারপাশে ঘন হয়ে জমে ওঠা তখনো সরস, শাঁসালো কলাপাতাগুলোর দিকে। চারপাশে বিমর্ষ আবহাওয়া সত্ত্বেও লেভিনের খুব খুশি লাগছিল। দূরের গ্রামটায় কৃষকদের সাথে তাঁর যে কথাবার্তা হয় তাতে দেখা গেল যে তারা নতুন সম্পর্কে অভ্যস্ত হতে শুরু করেছে। যে জমাদারের বাড়িতে পোশাক শুকিয়ে নেবার জন্য লেভিন উঠেছিলেন, স্পষ্টতই সে তাঁর পরিকল্পনা অনুমোদন করছিল, গরু কেনার সমবায়ে যোগ দেবার প্রস্তাব দেয় সে নিজেই।
‘অটলভাবে শুধু নিজের লক্ষ্যে দিকে এগোনো চাই, তাহলেই সেটা সিদ্ধ হবে’, ভাবছিলেন লেভিন, ‘এর জন্যে খাটাখাটুনির একটা অর্থ আছে বৈকি এটা আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার নয়, প্রশ্নটা সাধারণের কল্যাণ নিয়ে। সমস্ত চাষ – আবাদ, প্রধানত লোকদের অবস্থা একেবারে বদলাতে হবে। দারিদ্র্যের বদলে-সাধারণ সমৃদ্ধি, সন্তুষ্টি; শত্রুতার বদলে- মিল, স্বার্থে স্বার্থে যোগ। এক কথা, বিনা রক্তপাতে বিপ্লব, কিন্তু এই যে মহাবিপ্লব প্রথমে সেটা হবে আমাদের উয়েজদে, পরে গুবের্নিয়ায়, রাশিয়ায়, শেষে সারা বিশ্বে। কেননা ন্যায্য একটা ভাবনা ফলপ্রসূ না হয়ে যায় না। হ্যাঁ, এই উদ্দেশ্যের জন্যে খাটার সার্থকতা আছে। আর খাটছি যে আমি, সেই কস্তিয়া লেভিন, বলনাচের আসরে যে গিয়েছিল কালো গলাবন্ধ এঁটে, কিটি শ্যেরবাৎস্কায়া যাকে প্রত্যাখ্যান করেছে, নিজের কাছেই যে করুণাস্পদ, অকিঞ্চিৎকর, তাতে কিছুই প্রমাণ হয় না। আমার দৃঢ় ধারণা, নিজের সব কিছু স্মরণ করে বেঞ্জামিন ফ্যাঙ্কলিনই নিজেকে এমনি অকিঞ্চিৎকর জ্ঞান করতেন, এমনি আত্মবিশ্বাসহীন। এর কোন মানে হয় না। ওঁরও মনে হয় নিজের এক আগাফিয়া মিখাইলোভনা ছিল, যার কাছে তিনি তাঁর পরিকল্পনাগুলোর কথা খুলে বলতেন।’
