তাঁকে যে ঘরখানা দেওয়া হয়েছিল তাতে লেভিন শুয়ে রইলেন একটা স্প্রিঙের খাটে, লেভিনের হাত-পায়ের নড়নচড়নের তার স্প্রিঙগুলো হঠাৎ হঠাৎ মাথাচাড়া দিচ্ছিল, ঘুম হল না অনেকক্ষণ। বিজ্ঞ অনেক উক্তি থাকলেও সি্ভ্য়াজ্স্কির একটা আলাপেও আগ্রহ ছিল না লেভিনের; কিন্তু জোতদারের যুক্তিগুলো বিবেচনার দাবি রাখে। আপনা থেকেই তাঁর সমস্ত কথা স্মরণ করলেন লেভিন আর তিনি যে জবাব দিয়েছিলেন, কল্পনায় সেটা শুধরে নিলেন।
‘হ্যাঁ, ওঁকে আমার বলা উচিত ছিল : ‘আপনি বলছেন আমাদের চাষ-আবাদ চলছে না। কারণ কৃষকরা কোন উন্নত ব্যবস্থা দু’চক্ষে দেখতে পারে না, সেটা জোর করে চালানো দরকার; কিন্তু এসব উন্নত ব্যবস্থা ছাড়া চাষ-আবাদ যদি আদৌ না চলত, তাহলে আপনার কথা ঠিক হত; কিন্তু তা তো চলছে এবং চলছে সেখানে লোক যেখানে খাটে নিজেদের অভ্যাস অনুসারে, যেমন মাঝপথের ওই বুড়োটার ওখানে। চাষ-আবাদ নিয়ে আপনাদের আর আমাদের অসন্তুষ্টিতে প্রমাণ হয় যে দোষটা হয় আমাদের নয় কৃষি-শ্রমিকদের। শ্রমশক্তির বৈশিষ্ট্যের কথা না ভেবে আমরা অনেকদিন থেকে আমাদের পদ্ধতি, ইউরোপীয় পদ্ধতি চালু, করার জন্যে মাথা ঠুকছি। শ্রমশক্তি যে আদর্শ শক্তি নয়, নিজেদের সহজবোধে চালিত রুশ কৃষক—সেটা মেনে, সেই ভেবে চাষ-আবাদের ব্যবস্থা করা যাক। ধরে নিন’, আমার বলা উচিত ছিল, ‘আপনার চাষ-আবাদ চলছে ওই বুড়োটার মত, কাজের সাফল্যে মুনিষদের আগ্রহী করার উপায় এবং যে উন্নয়নগুলো তারা মেনে নেবে তার একটা মধ্যপন্থা আপনি পেয়ে গেলেন,—তাহলে আপনি মৃত্তিকাকে জীর্ণ না করে আগের তুলনায় ফসল পাবেন দ্বিগুণ, তিনগুণ। ভাগাভাগি করুন, অর্ধেকটা দিন শ্রমশক্তিকে, তাহলেও যে বাদবাকিটা আপনার থেকে যাচ্ছে, সেটা হবে বেশি, শ্রমশক্তিও পাবে বেশি। আর সেটা করতে হলে দরকার চাষ- আবাদের মান মানানো এবং চাষের সাফল্যে মুনিষদের আগ্রহী করে তোলা। কিভাবে তা করতে হবে, সেটা খুঁটিনাটির প্রশ্ন কিন্তু কোন সন্দেহ নেই যে তা করা সম্ভব।’
এই ভাবনায় ভয়ানক উত্তেজিত হয়ে উঠলেন লেভিন, অর্ধেকটা রাত তিনি ঘুমালেন না, ভাবনটা কাজে পরিণত করার খুঁটিনাটি নিয়ে চিন্তা করতে লাগলেন। পরের দিনই চলে যাবার কোন তোড়জোড় তিনি করছিলেন না, কিন্তু এখন ঠিক করলেন ভোর সকালেই বাড়ি ফিরবেন। তাছাড়া শ্যালিকার গাউনে ওই উন্মুক্ত কাটটা তাঁর মনে কুকার্য করার জন্য লজ্জা আর অনুতাপের মত একটা অনুভূতি খোঁচাচ্ছিল। তাঁর কাছে এখন প্রধান কথা গড়িমসি না করে চলে যাওয়া : দরকার কৃষকদের শীতের বপনের আগেই নতুন পরিকল্পনার প্রস্তাব দিতে পারা যাতে বপনটা চলবে নতুন ভিত্তিতে। আগেকার ব্যবস্থা সব ঢেলে সাজবেন বলে স্থির করলেন তিনি।
ঊনত্রিশ
পরিকল্পনা হাসিল করায় লেভিনের অনেক মুশকিল ছিল; কিন্তু যত শক্তি ছিল লড়লেন এবং যা তিনি চাইছিলেন না হলেও, তাঁর যা সাধ্য সেটা তিনি হাসিল করলেন এবং আত্মপ্রতারণা না করে তাঁর বিশ্বাস হল যে এর জন্য খাটার সার্থকতা আছে। প্রধান একটা মুশকিল ছিল এই যে চাষ-আবাদ চালু হয়ে গিয়েছিল, সব কিছু থামিয়ে দিয়ে গোড়া থেকে শুরু করা সম্ভব ছিল না, দরকার চালু অবস্থাতেই যন্ত্রটাকে নতুন করে নেওয়া।
লেভিন যখন বাড়ি ফিরে সেই সন্ধ্যায়ই গোমস্তাকে তাঁর পরিকল্পনার কথা জানালেন, সুস্পষ্ট আনন্দের সাথে সে সায় দিলে সেই অংশটায় যেখানে মানা হয়েছে যে এতদিন পর্যন্ত যা করা হয়েছে সেটা অর্থহীন এবং অলাভজনক। গোমস্তা বলল, সে তো অনেক দিন থেকেই তা বলে আসছে, কিন্তু ওর কথায় কান দেওয়া হয়নি। তবে চাষবাসের সমস্ত উদ্যোগে কৃষকদের মত সে শেয়ার-হোল্ডার হিসেবে অংশ নেবে, লেভিনের এই প্রস্তাবে মুখ তার খুবই ম্লান হয়ে গেল, সুনির্দিষ্ট কোন মত প্রকাশ করলে না সে, শুধু তৎক্ষণাৎ জানাল যে কালই রাইয়ের বাকি গাদিগুলোকে জড়ো করতে হবে আর লোক পাঠাতে হবে, লেভিন টের পেলেন যে সে বলতে চায় এখন ও সব আলোচনার সময় নেই।
একই কথা কৃষকদের কাছেও বলায় এবং নতুন শর্তে জমি বিলির প্রস্তাব দেওয়ায় লেভিন সেই একই প্ৰধান এই মুশকিলের সম্মুখীন হলেন যে দিনের চলতি কাজে তারা এত ব্যস্ত যে নতুন ব্যবস্থার লাভ-লোকসান নিয়ে তাদের ভাবার সময় নেই।
ইভান সাদাসিধে কৃষক, গোয়ালে যে খাটে, সপরিবারে সে গোয়াল থেকে পাওয়া লাভে অংশ নিক, লেভিনের এই প্রস্তাব সে পুরো বুঝল বলে মনে হল এবং পুরোপুরি সায় দিল। কিন্তু লেভিন যখন ভবিষ্যৎ লাভের কথা তাকে বোজাতে গেলেন, ইভানের মুখে ফুটে উঠল শংকা আর এই আফসোস যে সব কথা শেষ পর্যন্ত শুনতে সে পারছে না এবং তাড়াতাড়ি করে কোন একটা কাজ ভেবে নিল যাতে দেরি করা চলে না : আঁকশি নিয়ে বিচালি টেনে স্টল থেকে বের করতে অথবা পানি চালতে, কিংবা সে গোবর পরিষ্কার করতে লেগে গেল।
আরেকটা মুশকিল হল, যতটা পারা যায় শুষে নেওয়ার বাসনা ছাড়া জমিদারের যে অন্য কোন উদ্দেশ্য থাকতে পারে সে সম্পর্কে কৃষকদের ঘোরতর অবিশ্বাস। ওদের দৃঢ় বিশ্বাস যে জমিদার যাই বলুক, তার যা সত্যিকারের উদ্দেশ্য সেটা কখনো বলবে না তাদের। নিজেরাও তারা মতামত দিতে গিয়ে অনেক কিছু বলল, কিন্তু কদাচ বলল না তাদেরই-বা সত্যকার উদ্দেশ্য কি। তা ছাড়া (লেভিন টের পেলেন যে তিরিক্ষি জোতদারটি ঠিকই বলেছিলেন), চুক্তি যাই হোক তার প্রথম এবং অপরিবর্তনীয় শর্ত তারা এই রাখল যে চাষ-আবাদের কোন একটা নতুন পদ্ধতি ও নতুন হাতিয়ার ব্যহারে তাদের বাধ্য করা চলবে না। তারা মানল যে কলের লাঙল ভালো চষে, স্ক্যরিফায়ার কাজ দেয় মন্দ নয়, কিন্তু হাজারটা কারণ তারা দেখাল কেন ও-দুটোর কোনটাই ব্যবহার করা চলে না আর জমির মান নামানো দরকার বলে লেভিন নিঃসন্দেহ থাকলেও উন্নত ব্যবস্থা যার উপকারিতা সুস্পষ্ট তা ছেড়ে দিতে কষ্ট হল তাঁর। কিন্তু এ সব মুশকিল সত্ত্বেও তিনি তাঁর নিজের কথাটাই বহাল করলেন এবং শরৎ নাগাদ ব্যাপারটা এগোতে থাকল কিংবা তাঁর তাই অন্তত মনে হয়েছিল।
