হ্যাঁ, শুধু ওদের প্রমুখত্ব করি ভিন্ন দিকে…’ হেসে বললেন সি্ভ্য়াজ্স্কি।
লেভিন বললেন, ‘আমাকে এটা খুব ভাবাচ্ছে। ও ঠিকই বলেছে যে আমাদের কাজটা, মানে যুক্তিযুক্ত ভিত্তিতে কৃষি চলছে না, চলছে কেবল ওই চুপচাপ লোকটার মত মহাজনী চাষ বা যেটা একান্ত মামুলী। সেটা কার দোষ?
‘বলা বাহুল্য আমাদেরই, তবে চলছে না, এ কথাটা ঠিক নয়। ভাসিলচিকভের তো চলছে।’
‘কারখানা যে…’
‘তাহলেও কিন্তু বুঝতে পারছি না, আপনি অবাক হচ্ছেন কিসে। বৈষয়িক আর নৈতিক দুইয়েরই বিকাশের এত নিম্নস্তরে কৃষকরা রয়েছে যে স্পষ্টতই যা তার জানা নেই তেমন সব কিছুরই তার বিরোধিতা করার কথা। ইউরোপে যুক্তিযুক্ত কৃষি চলে কেননা কৃষকরা সেখানে শিক্ষিত। সুতরাং কৃষকদের শিক্ষিত করতে হবে—এই হল কথা। ‘
‘কিন্তু সেটা করা যায় কিভাবে?’
‘কৃষকদের শিক্ষিত করে তোলার জন্যে দরকার তিনটা জিনিস—স্কুল, স্কুল এবং স্কুল।’
‘কিন্তু আপনি নিজেই তো বললেন যে, কৃষকরা রয়েছে বৈষয়িক বিকাশের নিম্নস্তরে। তাহলে স্কুলে তাদের কি সাহায্য হবে?’
‘জানেন, আপনার কথায় রোগীকে পরামর্শ দানের একটা চুটকি মনে পড়ছে : ‘আপনি জোলাপ নিন।’ নিয়েছি, খারাপ দাঁড়াল।’ ‘তাহলে কেজি লাগিয়ে দেখুন।’ ‘দেখেছি, আরো খারাপ হল।’ ‘তাহলে আর কি, সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করুন।’ ‘তাও করেছি হল আরো খারাপ।’ আপনারও তাই। আমি অর্থশাস্ত্রের কথা বলছি, আপনি বলছেন— আরো খারাপ, আমি সমাজতন্ত্রের কথা বলছি—আরো খারাপ। শিক্ষা-আরো খারাপ।’
‘কিন্তু স্কুল সাহায্য করবে কি করে?’
‘নতুন চাহিদা এনে দেবে।’
‘ঠিক এই জিনিসটাই আমি বুঝে উঠতে পারিনি কখনো’, উত্তেজিত হয়ে আপত্তি জানালেন লেভিন, ‘নিজেদের বৈষয়িক অবস্থা উন্নত করতে কৃষকদের কিভাবে সাহায্য করবে স্কুল? আপনি বলছেন স্কুল থেকে, শিক্ষা থেকে চাষীর নতুন চাহিদা জাগবে। সেটা আরো খারাপ, কেননা তা মেটাবার সাধ্য তার থাকবে না। আর যোগ-বিয়োগের জ্ঞান বা তিহোপদেশ কি করে তার বৈষয়িক অবস্থা উন্নত করতে পারে, এটা কখনো আমি বুঝে উঠতে পারিনি। পরশু সন্ধ্যায় ছেলে-কোলে একটা নারীর সাথে দেখা হয় আমার, জিজ্ঞেস করলাম কোথায় সে যাচ্ছে। বলল : ‘গিয়েছিলাম বুড়ির কাছে। ছেলেটার চিল্লানি রোগ ধরেছে, তাই সারাতে নিয়ে যাই।’ জিজ্ঞেস করলাম, বুড়ি এ রোগ সারায় কি করে। ‘বুড়ি ছেলেটাকে বসায় মুরগীর সাথে আর কি-সব মন্ত্র পড়ে।’
‘এই তো আপনি নিজেই বলছেন! চিল্লানি সারাবার জন্যে সে যাতে মুরগীর কাছে ছেলেটাকে নিয়ে না যায়, তার জন্যে দরকার…’ সানন্দে হেসে বললেন সি্ভ্য়াজ্স্কি।
‘আরে না’, সক্ষোভে লেভিন বললেন, ‘এ চিকিৎসা আমার কাছে শুধু স্কুল দিয়ে চাষীদের চিকিৎসা করার মত। কৃষকরা গরিব, অশিক্ষিত, এটা আমরা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি যেমন বুড়িটা দেখছে চিল্লানি রোগ। কিন্তু চিল্লানি থেকে মুরগি তাকে কি সাহায্য করবে এটা যেমন দুর্বোধ্য, তেমনি দারিদ্র্য থেকে কৃষককে কি সাহায্য করবে স্কুল, সেটাও তেমনি দুর্বোধ্য। কেন সে দরিদ্র, সাহায্য করা উচিত সেখানটায়।’
‘এক্ষেত্রে তাহলে আপনি অন্তত স্পেনসারকে সমর্থন করছেন যাকে আপনার ভারি অপছন্দ; উনিও বলেন যে শিক্ষা আসতে পারে প্রচুর সচ্ছলতা, জীবনের স্বাচ্ছন্দ্য, ঘনঘন গাত্র প্রক্ষালন থেকে, উনি যা বলেন, অংক কষার নৈপুণ্য থেকে নয়…’
‘তা আমি খুব খুশি অথবা উল্টো, বড় অখুশি যে স্পেনসারের সাথে আমার মত মিলছে; তবে এ কথাটা আমি অনেকদিন থেকে জানি যে স্কুলে কোন উপকার করে না, সাহায্য হয় তেমন ব্যবস্থায় যাতে জনগণ হবে সমৃদ্ধ, অবকাশ মিলবে বেশি, তখন স্কুলও হবে।’
‘তাহলেও সারা ইউরোপে স্কুল এখন বাধ্যতামূলক।
‘কিন্তু আপনি নিজে, আপনি এ ব্যাপারে স্পেনসারের সাথে একমত?’ জিজ্ঞেস করলেন লেভিন।
কিন্তু সি্ভ্য়াজ্স্কি চোখে ঝিলিক দিল ভয়, আর হেসে তিনি বললেন : ‘তা ঐ চিল্লানি রোগটা খাশা? আপনি শুনেছেন নাকি?’
লেভিন টের পেলেন যে লোকটার জীবন আর চিন্তার মধ্যে সম্পর্ক কি সেটা তিনি ধরতে পারবেন না কিছুতেই। স্পষ্টতই তাঁর যুক্তিবিস্তারে কি সিদ্ধান্ত দাঁড়ায় তাতে তাঁর কিছু এসে যায় না। ওঁর আগ্রহ শুধু যুক্তিবিস্তারের প্রক্রিয়াটায়। আর সেটা তাঁকে কানাগলিতে ঠেলে দিলে তাঁর খুবই বিছ্ছিরি বোধ হয়। তাঁর ভালো লাগে না শুধু এটাই, প্রীতিকর মজাদার কোন কিছুতে আলাপের মোড় ঘুরিয়ে দিয়ে তিনি পালান।
মাঝপথের কৃষকটি তাঁর মনে যে ছাপ ফেলেছিল, যা হয়ে দাঁড়িয়েছিল যেন এখনকার সমস্ত অনুভব আর চিন্তার ভিত্তিস্বরূপ তা থেকে শুরু করে এদিনকার সমস্ত অনুভূতি ভয়ানক আলোড়িত করছিল লেভিনকে। অমায়িক এই যে সি্ভ্য়াজ্স্কি, নিজের চিন্তাগুলো যিনি জমিয়ে রাখেন কেবল জনসমাজে ব্যবহারের জন্য, স্পষ্টতই যাঁর আছে জীবনের অন্য কোন কোন ভিত্তি যা লেভিনের কাছে গোপন, অথচ সেই সাথে যিনি চলেন অগণিত জনতার সাথে, জনমত চালিত করেন তাঁর কাছে বিজাতীয় ধ্যান-ধারণা দিয়ে; কোপন এই যে জোতদার, প্রপীড়িত জীবনের যুক্তিগুলো যাঁর খুবই সঠিক, কিন্তু গোটা একটা শ্রেণী, তদুপরি রাশিয়ার সেরা শ্রেণীটির প্রতি বিদ্বেষ পোষণে যা বেঠিক; নিজেরই কার্যকলাপে তাঁর অসন্তোষ আর তা সংশোধন করতে পারার একটা ঝাপসা আশা—এ সবই মিলে গেল ভেতরকার একটা উদ্বেগ আর অচিরেই তার সমাধানের প্রত্যাশায়।
