নিজের প্রশ্নে ফিরে আসার চেষ্টা করে লেভিন বললেন, ‘কেন ভাবছেন যে শ্রম-শক্তির সাথে এমন সম্পর্ক স্থাপন করা যায় না যাতে কাজটা ফলপ্রসূ হবে?’
‘রুশ কৃষককে দিয়ে সেটা কখনো হবার নয়, ক্ষমতা নেই’, জবাব দিলেন জোতদার।
‘নতুন শর্ত পাওয়া যাবে কেমন করে?’ দই খেয়ে, ধূমপান করে পুনরায় বিতর্কীদের কাছে এসে বললেন সি্ভ্য়াজ্স্কি, ‘শ্রমিক শক্তির সাথে সম্ভবপর সমস্ত সম্পর্কই সুনির্দিষ্ট ও বিচারিত হয়েছে। বর্বরতার অবশেষ — সমষ্টিগত দায়িত্বসহ গ্রামসমাজ আপনা থেকেই ভেঙে পড়ছে, ভূমিদাসপ্রথা বিলুপ্ত, থাকছে শুধু স্বাধীন শ্রম, তার রূপ সুনির্দিষ্ট ও সুপ্রস্তুত হয়ে উঠেছে, যেগুলো নিতে হবে। ক্ষেতমজুর, দিনমজুর, খামারী-এ থেকে বেরোতে পারবেন না।’
‘কিন্তু এসব নতুন রূপের সন্ধান করছে। তা পেয়েও যাবে সম্ভবত।’
‘আমি তো শুধু সেই কথাই বলছি’, জবাব দিলেন লেভিন, ‘আমাদের তরফ থেকে আমরাই বা সন্ধান করব না কেন?’
‘কারণ, সেটা হবে নতুন করে রেলপথ নির্মাণের প্রণালী নিয়ে ভাবতে বসার সমান। সে প্রণালী তো তৈরিই আছে, উদ্ভাবিত হয়ে গেছে।’
‘কিন্তু সেটা যদি আমাদের উপযোগী না হয়, যদি তা হয় নির্বোধ?’ লেভিন বললেন।
এবং আবার লক্ষ্য করলেন সি্ভ্য়াজ্স্কির চোখে ভয়ের ভাব।
‘হ্যাঁ, যা বলেছেন : আমরা তুড়ি মেরে ওড়াই ইউরোপ যা খুঁজছে, সেটা আমরা পেয়ে গেছি! এ সবই আমি জানি, কিন্তু মাপ করবেন, শ্রমিকদের সুব্যবস্থার প্রশ্নে ইউরোপে যা করা হয়েছে, তা সব আপনি জানেন কি?’
‘না, বিশেষ কিছু জানি না।’
‘ইউরোপের সেরা সেরা মাথা এই সমস্যা নিয়ে খাটছে, শুট্সে-ডেলিচ…তারপর শ্রমিক প্রশ্ন নিয়ে অতি উদারনৈতিক লাসাল ধারার বিপুল সাহিত্য…মিলগাউজেন প্রথা—এগুলো এখন বাস্তব ঘটনা, আপনি নিশ্চয় এ সব কথা জানেন।’
‘কিছুটা ধারণা আছে, তবে খুবই ঝাপসা।’
‘না, ওটা আপনি শুধু বলছেন; সম্ভবত এসব আপনি জানেন আমার চেয়ে কম নয়। আমি অবশ্য সমাজবিদ্যার অধ্যাপক নই, কিন্তু এসব আমার আগ্রহ জাগায়, আর আগ্রহ যদি জাগে, তাহলে সত্যিই তো তা নিয়ে লোকে খাটবে।’
‘কিন্তু কি সিদ্ধান্তে তাঁরা পৌঁছেছেন?’
‘ক্ষমা করবেন…’
উঠে দাঁড়ালেন জোতদাররা আর সি্ভ্য়াজ্স্কির মনের অভ্যর্থনা কক্ষের পেছনে উঁকি দেবার অপ্রীতিকর অভ্যাসটায় লেভিনকে ফেলে রেখে অতিথিদের এগিয়ে দিতে সি্ভ্য়াজ্স্কি চলে গেলে।
আটাশ
লেভিনের কাছে মহিলাদের সাথে সে সন্ধ্যাটা অসহ্য একঘেয়ে লেগেছিল; বিষয়-আশয় নিয়ে যে অসন্তুষ্টি তিনি এখন বোধ করছেন, সেটা যে তাঁর একার নয়। রাশিয়ার ব্যাপার-স্যাপার যা তারই সাধারণ পরিস্থিতি এই ভাবনাটায় তাঁকে আগে কখনো এমন বিচলিত করেনি। তাঁর মনে হল, মাঝপথের ওই কৃষকটার মজুররা যেভাবে খাটছে, সেভাবেই তারা যেন খাটে, মজুরদের এমন সম্পর্ক স্থাপন করা স্বপ্ন নয়, অবশ্যই সাধনীয় একটা কর্তব্য। তাঁর মনে হল এ কর্তব্য সাধন করা যায় এবং সে চেষ্টা করা উচিত।
মহিলাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে এবং পরের গোটা দিনটাও এখানে থেকে গিয়ে ওঁদের সাথে ঘোড়ায় চেপে দেখতে যাবেন সরকারী বনের মধ্যে অতি চিত্তাকর্ষক একটা খাদ এই প্রতিশ্রুতি দিয়ে শ্রমিক সমস্যা নিয়ে যে বইটা সি্ভ্য়াজ্স্কি দেবেন বলেছিলেন, সেটা নেবার জন্য ঘুমের আগে লেভিন গেলেন তাঁর স্টাডিতে। ঘরটা প্রকাণ্ড, তাতে সারি সারি বইয়ের আলমারি আর দুটো টেবিল—ঘরের মাঝখানে একটা জগদ্দল লেখার টেবিলে, অন্যটা গোল, তার ওপর বাতিদান ঘিরে নক্ষত্রাকারে নানান ভাষায় পত্র-পত্রিকা বিছানো। লেখার টেবিলের কাছে বইয়ের শেল্ফ্ তার দেরাজগুলোয় সোনালি অক্ষরে ভিন্ন ভিন্ন বিষয়বস্তুর নাম।
সি্ভ্য়াজ্স্কি বইটা এনে দিয়ে একটা দোলন চেয়ারে বসলেন।
লেভিন গোল টেবিলটার কাছে থেমে পত্র-পত্রিকায় চোখ বোলাচ্ছিলেন, সি্ভ্য়াজ্স্কি তাঁকে বললেন, ‘কি ওটা দেখছেন?’
লেভিনের হাতে যে পত্রিকাটা ছিল সেটা দেখে বললেন, ‘ওঃ এটা, খুবই চিত্তাকর্ষক একটা প্রবন্ধ আছে ওতে। দেখা যাচ্ছে’, খুশিতে চাঙ্গা হয়ে তিনি যোগ দিলেন, ‘পোল্যান্ড বিভাগের জন্যে প্রধান অপরাধী মোটেই ফ্রিডরিখ নন। দেখা যাচ্ছে…’
এবং তাঁর স্বভাবসুলভ প্রাঞ্জলতায় বললেন এই নতুন, অতি গুরুত্বপূর্ণ ও আগ্রহোদ্দীপক উদ্ঘাটনগুলোর কথা। লেভিনের মন এখন বিষয়কর্মের ভাবনায় ব্যস্ত থাকলেও গৃহকর্তার কথা তিনি শুনতে লাগলেন আর নিজেকে প্রশ্ন করলেন : ‘কি আছে ওর ভেতরটায়? আর কেন, কেনই-বা পোল্যান্ড বিভাগ নিয়ে ওর অত আগ্রহ?’ সি্ভ্য়াজ্স্কির কথা যখন শেষ হল, অজ্ঞাতসারেই লেভিন বলে ফেললেন, ‘কিন্তু তাতে কি হল?’ কিছুই হয়নি। যা ‘দেখা যাচ্ছে’ সেটাই কেবল আগ্রহোদ্দীপক। কিন্তু কেন ওটা তাঁর কাছে আগ্রহোদ্দীপক, সেটা সি্ভ্য়াজ্স্কি বুঝিয়ে বললেন না, প্ৰয়োজনও বোধ করলেন না বলার।
‘আমাকে কিন্তু ভারি আগ্রহী করে তুলেছিল ওই রাগী জোতদারটি’, দীর্ঘশ্বাস ফেলে লেভিন বললেন, ‘লোকটার মাথা আছে, সত্যি কথাই বলেছে অনেক।’
‘আহ্ ছাড়ুন! আর সবার মতই গোপনে গোপনে ঝানু একটা ভূমিদাস মালিক!’ য়িাঙ্কি বললেন।
‘আপনি যাদের অভিজাত-প্ৰমুখ…’
