না এখনো নয়।
ওর কাছে যান। ভারি উনি ভালোবাসেন আপনাকে।
‘কি ব্যাপার? আমি আঘাত দিয়েছি ওকে। সৃষ্টিকর্তা, আমাকে সাহায্য করো!’ এই ভাবতে ভাবতে লেভিন ছুটে গেলেন বেঞ্চে বসা পাকা চুলের কুণ্ডলী দোলানো বৃদ্ধা ফরাসিনীর কাছে। বাঁধানো দাঁত বার করে হেসে তিনি তাঁকে। গ্রহণ করলেন পুরনো বন্ধুর মত।
‘হ্যাঁ, এই তো আমরা বেড়ে উঠছি’, চোখ দিয়ে কিটিকে দেখিয়ে তিনি বললেন, ‘আর বুড়োচ্ছি। ছোট্ট ভালুক এখন বড় হয়ে উঠেছে!’ হেসে বলে চললেন ফরাসিনী, তিন বোনকে ইংরেজি কাহিনী থেকে তিন ভালুক বলে লেভিন যে রসিকতা করতেন, সে কথা মনে করিয়ে দিলেন তিনি। মনে আছে, আপনি তাই বলতেন?
লেভিনের সেটা আদৌ মনে ছিল না, কিন্তু এই দশ বছর উনি এই রসিকতাটায় হেসে আসছেন আর ভালোবাসতেন সেটা।
‘নিন যান, স্কেটিং করুন গে। আমাদের কিটি ভালোই স্কেটিং করতে শিখেছে, তাই না?
লেভিন যখন আবার কিটির কাছে এলেন, মুখ তার তখন আর কঠোর নয়, চোখে চোখে সততাশীল স্নেহময় দৃষ্টি। কিন্তু লেভিনের মনে হল এই স্নেহময়তার ভেতর আছে একটা বিশেষ রকমের, ইচ্ছাকৃত শান্তভাব। মন খারাপ হয়ে গেল তার। নিজের বৃদ্ধা গাভর্নেস আর তার বিদঘুঁটেমির গল্প করে কিটি তাকে তার জীবনের কথা জিজ্ঞেস করল।
বলল, সত্যিই কি শীতকালে গাঁয়ে আপনার একঘেয়ে লাগে না?’
না, একঘেয়ে লাগে না, কাজ আমার অনেক’, লেভিন বললেন, তিনি টের পাচ্ছিলেন যে কিটি তাকে তার শান্ত সুরের কবলে ফেলছে, তা থেকে বেরোনো তার পক্ষে অসাধ্য, যেমন হয়েছিল এই শীতের গোড়ায়।
কিটি জিজ্ঞেস করল, ‘অনেক দিনের জন্য এসেছেন?
‘জানি না, কি বলছেন সে কথা না ভেবেই বললেন লেভিন। যদি কিটির এই শান্ত বন্ধুত্বে তিনি ধরা দেন, তাহলে কিছুরই ফয়সালা না করে আবার তিনি ফিরে যাবেন, এই ভাবনাটা মনে এল তাঁর, ঠিক করলেন ক্ষেপে উদ্দাম হয়ে উঠবেন।
জানেন না মানে?
‘জানি না। সব নির্ভর করছে আপনার ওপর’, এই বলেই তখনই তাঁর আতঙ্ক হল নিজের কথাগুলোয়।
কিটি তার কথাগুলো হয়ত-বা শুনেছিল, হয়ত শুনতে চায়নি, সে যাই হোক, যেন হোঁচট খেল সে, দু’বার পা ঠুকে তাঁর কাছ থেকে সে দূরে চলে গেল। মাদমোয়াজেল লিনোর কাছে গিয়ে কি যেন বললে, তারপর মহিলারা যেখানে স্কেট খোলে, সেই ঘরটায় গেল।
সৃষ্টিকর্তা, কি আমি করলাম! সৃষ্টিকর্তা! সাহায্য কর আমাকে, জ্ঞান দাও’, এই বলে প্রার্থনা করার সাথে সাথে সবেগ গতির একটা তাগিদ অনুভব করে ছুটে গেলেন একটা বাইরের, আরেকটা ভেতরের বৃত্ত এঁকে।
ঠিক এই সময় পায়ে স্কেট, মুখে সিগারেট নিয়ে কফি ঘর থেকে বেরিয়ে এল তরুণ স্কেটারদের সেরা একজন, সশব্দে স্কেট পায়েই লাফাতে লাফাতে সে নামল সিঁড়ি বেয়ে। ধেয়ে সে নামল নিচে, হাতের অবাধ ভঙ্গি না বদলিয়েই সে ফেট করতে লাগল বরফের ওপর।
‘আরে, এ যে দেখি নতুন খেল, এই বলে লেভিন তখনই ওপরে উঠলেন এই নতুন খেলটা খেলবার জন্য।
মারা পড়তে যাবেন না। এর জন্য অভ্যেস দরকার!’ নিকোলাই শ্যেরবাৎস্কি তাঁকে বললেন চেঁচিয়ে।
ওপরে উঠে লেভিন যতটা সম্ভব দৌড়ে এসে ঝাঁপ দিলেন নিচে, অনভ্যস্ত এই গতিতে ভারসাম্য বজায় রাখলেন হাত বাড়িয়ে, শেষ ধাপে তার পা আটকে গিয়েছিল, কিন্তু হাত দিয়ে বরফ সামান্য স্পর্শ করে সজোর একটা দেহভঙ্গিতে সামলে নিয়ে হেসে এগিয়ে গেলেন।
স্কেট খোলার ঘর থেকে এই সময় মাদমোয়াজেল লিনোর সাথে বেরিয়ে এসেছিল কিটি। হেসে, যেন তার আদরের বড় ভাই এমনি একটা মৃদু স্নেহে লেভিনের দিকে তাকিয়ে কিটি ভাবলে, কি ভালো, কি মিষ্টি! সত্যিই কি আমি দোষী, সত্যিই কি খারাপ কিছু করেছি? লোকে বলে? ছিনালি। আমি জানি যে আমি ভালোবাসি ওকে নয়; তাহলেও ওর সাহচর্যে আমার বেশ লাগে, ভারি সুন্দর লোক। কিন্তু ওই কথাটা ও বলল কেন?
সিঁড়িতে মেয়ের কাছে আসা মা আর কিটিকে চলে যেতে দেখে দ্রুতবেগে ধাবনের জন্য লাল হয়ে ওঠা লেভিন থেমে গিয়ে ভাবনায় ডুবে গেলেন। তারপর স্কেট খুলে ফটকের কাছে সঙ্গ ধরলেন মা আর মেয়ের।
প্রিন্স-মহিষী বললেন, ‘ভারি আনন্দ হল আপনাকে দেখে। বরাবরের মতই আমরা লোককে অভ্যর্থনা করি। বৃহস্পতিবার।
তার মানে আজকে?’
‘আপনার দেখা পেলে খুবই খুশি হব’, শুকনো গলায় বললেন প্রিন্স-মহিষী।
মায়ের এই নিরুত্তাপ ভাবটাকে শুধরে নেবার ইচ্ছা থেকে নিবৃত্ত হতে পারল না কিটি।
লেভিনের দিকে ফিরে হেসে সে বলল : তাহলে দেখা হবে।
এ সময় পাশকে করে টুপি মাথায়, চোখ-মুখ জ্বলজ্বল করে, বিজয়ীর আনন্দে পার্কে এলেন অবলোনস্কি। কিন্তু শাশুড়ির কাছে গিয়ে মনমরা আর দোষী মুখ করে তিনি ডল্লির স্বাস্থ্য সম্পর্কে তাঁর জিজ্ঞাসার জবাব দিয়ে বুক টান করে লেভিনের হাত ধরলেন। জিজ্ঞেস করলেন? তাহলে কোথায় যাব? লেভিনের চোখের দিকে অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে তিনি বললেন, ‘আমি কেবলই তোমার কথা ভেবেছি, এসেছ বলে ভারি খুশি।’
যাব, যাব’, উত্তর দিলেন সুখী লেভিন, তাহলে দেখা হবে’ এই কণ্ঠস্বর আর যে হাসির সাথে তা উচ্চারিত হয়েছিল তা তখনো তার কানে আর চোখে ভাসছিল।
ইংরেজি হোটেল, নাকি ‘এর্মিতাজ??
‘আমার কাছে সবই সমান।’
‘তাহলে ইংরেজি হোটেলই’, বললেন অবলোনস্কি, ইংরেজি হোটেল তিনি বাছলেন কারণ সেখানে, ইংরেজি হোটেলে তার দেনা ‘এর্মিতাজের চেয়ে বেশি। তাই এ হোটেলটা এড়িয়ে যাওয়া ভালো নয় বলে তার মনে হয়েছিল।
