এবং কৃষকমুক্তি নিয়ে তিনি তাঁর নিজস্ব পরিকল্পনা পেশ করতে লাগলেন যাতে নাকি এই অসুবিধা দূর হতে পারত।
তাতে লেভিনের আগ্রহ ছিল না, জোতদার যখন তাঁর বক্তব্য শেষ করলেন, লেভিন ফিরলেন তাঁর প্রথমাংশ এবং সি্ভ্য়াজ্স্কি যাতে গুরুত্বসহকারে নিজের অভিমত দেন, সেজন্য তাঁকে উদ্দেশ করে বললেন : ‘চাষ-আবাদের মান যে নেমে যাচ্ছে এবং শ্রমিকদের সাথে আমাদের যা সম্পর্ক তাতে যে লাভজনক যুক্তিযুক্ত চাষ সম্ভব নয়, তা খুবই সত্যি।’
‘আমি তা মনে করি না’, এবার গুরুত্ব দিয়েই আপত্তি জানালেন সি্ভ্য়াজ্স্কি, ‘আমি শুধু এই দেখতে পাচ্ছি যে, আমরা চাষ-আবাদ চালাতে পারি না এবং ভূমিদাসপ্রথার আমলে যা চালিয়েছি তার মান বড় বেশি উঁচুর বদলে, উলটো বরং ছিল বড় বেশি নিচু। আমাদের যন্ত্রপাতি নেই, ভালোরকম ভারবাহী পশু নেই, সত্যিকারের পরিচালনা নেই, হিসেব করতে পারি না আমরা। জিজ্ঞেস করুন কোন মালিককে, সে বলতে পারবে না কোনটা তার পক্ষে লাভজনক, কোনটা নয়।’
‘ইতালিয়ান গণিতক’, জোতদার বললেন ব্যঙ্গভরে, ‘যেভাবেই হিসেব করুন, সব ছয়লাব করবে, লাভ আর হবে না।’
‘কেন ছয়লাব করবে? বাজে একটা মাড়াই কল, আপনার আহামরি রুশ যন্ত্রটাকে নষ্ট করবে, বাষ্পচালিত আমার যন্ত্রটাকে করবে না। গেঁয়ো, কি বরে তাকে? গেঁতো একটা ঘোড়া লেজ ধরে যাকে ঠেলতে হয়, তাকে নষ্ট করবে, কিন্তু পের্শেরন, অন্তত বিত্যুগ জাতের ঘোড়া রাখুন, তাকে নষ্ট করবে না। সব ব্যাপারেই তাই আমাদের চাষ-আবাদকে তুলতে হবে উঁচুতে।
‘কেনার মত আওকাত থাকলেও না হয় হত, নিকোলাই ইভানিচ! আপনার আর কি, এদিকে আমাকে ছেলের খরচাপাতি বইতে হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্যে, ছোটগুলোকে পড়াতে হচ্ছে জিমনাসিয়ামে, তাই পের্শেরন কেনা আমার দ্বারা হবে না।’
‘তার জন্যে ব্যাংক আছে।’
‘যাতে শেষ সম্পত্তিটুকুও নিলামে ওঠে? না বাবা, রক্ষা করুন!
‘চাষ-আবাদের মান আরো উঁচুতে তোলা দরকার এবং সম্ভব, এ কথায় আমার সায় নেই’, লেভিন বললেন, ‘আমি চাষ-আবাদ নিয়েই আছি, তার জন্যে টাকাও আছে আমার, কিন্তু কিছুই করতে পারছি না। ব্যাংকে কার উপকার হচ্ছে জানি না। আমি অন্তত চাষবাসে যতই না টাকা ঢালি, সবই লোকসান : গরু-বাছুরে লোকসান, যন্ত্রপাতিতে লোকসান।’
‘এই হল খাঁটি কথা’, সন্তুষ্টিতে এমন কি হাসিমুখেই সমর্থন করলেন পাকা-মোচ জোতদার।
‘আর আমিই একা নই’, লেভিন বলে চললেন, ‘যুক্তিযুক্তভাবে চাষ-আবাদ চালায় এমন সমস্ত মালিকেরই উল্লেখ করব আমি; বিরল ব্যতিক্রম বাদে সবাই তারা চালাচ্ছে লোকসান দিয়ে। আপনিই বলুন, বিষয়-আশয় থেকে আপনার লাভ হচ্ছে কি?’ লেভিন বললেন এবং তৎক্ষণাৎ য়িাঙ্কি দৃষ্টিতে লক্ষ্য করলেন ক্ষণিক সেই ভয়টা, সি্ভ্য়াজ্স্কির মানসের অভর্থনা কক্ষের চেয়ে বেশি দূর অগ্রসর হতে গেলে যা তাঁর চোখে পড়েছে।
তাছাড়া লেভিনের দিক থেকে প্রশ্নটা করা সঙ্গত হয়নি। চায়ের টেবিলে গৃহকর্ত্রী এইমাত্র তাঁকে বলেছেন যে, এ বছর গ্রীষ্মে তাঁরা মস্কো থেকে হিসাব-নিকাশে পারদর্শী জনৈক জার্মানকে আমন্ত্রণ করে আনেন, পাঁচশ রুব্ল পারিতোষিকে তিনি তাঁদের বিষয়-আশয়ের হিসাব কষে দেখেন যে তাতে লোকসান যাচ্ছে তিন হাজার রুবলের কিছু বেশি করে। তাঁর মনে নেই ঠিক, তবে জার্মানটা মনে হয় শেষ কপর্দকটি হিসেব করে দেখেছেন।
সি্ভ্য়াজ্স্কির বিষয়-আশয় থেকে লাভের উল্লেখে জোতদার ভদ্রলোকটি হাসলেন, স্পষ্টতই তাঁর জানা ছিল প্রতিবেশী অভিজাত-প্রমুখের কতটা মুনাফা হওয়া সম্ভব।
সি্ভ্য়াজ্স্কি বললেন, ‘হতে পারে যে লাভজনক নয়। তাতে শুধু প্রমাণ হয় যে আমি হয় খারাপ মালিক, নয় পুঁজি ঢালছি খাজনা বাড়বার জন্যে।’
‘খাজনা, বটে!’ সভয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন লেভিন, ‘হয়ত খাজনা আছে ইউরোপে, জমিতে শ্রম নিয়োগ করায় তা উন্নত হয়েছে, কিন্তু আমাদের এখানে শ্রম নিয়োগ করে জমি খারাপই হচ্ছে, মানে, তাকে বেদম চষা হচ্ছে, সুতরাং খাজনা আসতে পারে না।’
‘খাজনা আসবে না মানে? ওটা যে আইন।’
‘তাহলে আমরা আইন-বহির্ভূত : খাজনা আমাদের কিছুই ব্যাখ্যা করে না, বরং গুলিয়ে দেয়। না, বলুন তো, খাজনার তত্ত্ব কি করে…’
‘দই খাবেন? মাশা, আমাদের এখানে কিছু দই বা রাস্পবেরি পাঠাও’, স্ত্রীকে বললেন তিনি, এ বছর র্যাম্পবেরি ধরে আছে অনেক বেশি দিন।’
অতি খোশমেজাজে সি্ভ্য়াজ্স্কি উঠে চলে গেলেন, স্পষ্টতই তিনি ধরে নিয়েছিলেন যে কথাবার্তাটা সেখানেই শেষ হয়ে গেছে যেখানে সবে শুরু হচ্ছে বলে মনে হয়েছিল লেভিনের।
সহালাপীকে না পেয়ে লেভিন কথা চালিয়ে গেলেন জোতদারটির সাথে, তাঁর কাছে প্রমাণ করার চেষ্টা করলেন যে সমস্ত মুশকিলটা এই থেকে আসছে যে আমরা আমাদের শ্রমিকদের গুণাগুণ ও অভ্যাস জানতে চাই না; কিন্তু স্বাধীনভাবে একা একা চিন্তা করতে অভ্যস্ত সমস্ত লোকের মতই অপরের চিন্তা ভোজা জোতদারটির পক্ষে কঠিন হচ্ছিল, নিজের চিন্তাতেই তাঁর বিশেষ পক্ষপাত। এই কথায় তিনি জোর দিচ্ছিলেন যে রুশ কৃষক শূকুর শূকরত্বই সে ভালোবাসে, শূকরত্ব থেকে বের করে আনতে হলে দরকার ক্ষমতা, সেটা নেই, দরকার ডাণ্ডা, কিন্তু আমরা এতই উদারনীতিক হয়ে পড়েছি যে হাজার বছরের পুরানো ডাণ্ডার স্থলাভিষিক্ত করেছি উকিলদের আর কারাদণ্ডকে, যেখানে অপদার্থ দুর্গন্ধময় কৃষকদের খাওয়ানো হয় ভালো স্যুপ, তাদের জন্য বরাদ্দ হয় অত ঘন ফুট বাতাস।
