‘খতিয়ে দেখা সে শুধু একটাই, নিজের বাড়িতে থাকি, কেনা নয়, ভাড়া করা নয়। তাছাড়া আরো আশা রাখি যে কৃষকদের চৈতন্য হবে, নইলে বিশ্বাস করুন, এ শুধু মাতলামি, লাম্পট্য! জমি কেবল ভাগ্যের পর ভাগ, ঘোড়া নেই, গরু নেই। না খেয়ে মরবে, তাকে মজুর খাটাও, আপনার সর্বনাশ করার বুদ্ধিতে ঘাটতি পড়বে না, তার ওপর আবার সালিশী আদালতে টেনে নিয়ে যাবে।’
‘সালিশী আদালতের কাছে আপনিও নালিশ করুন’, বললেন সি্ভ্য়াজ্স্কি।
‘আমি নালিশ করব? জান গেলেও নয়! এমন গুজব রটবে যে নালিশে আনন্দ পাব না! এই কারখানার কথাই ধরুন-না-অগ্রিম দাদন নিয়ে পালাল। কি করল সালিশী আদালত? বেকসুর মাপ। সব টিকে থাকছে কেবল ভলো স্ত্ আর গ্রামপ্রধানের জন্যে। আগের কালের মত ছাল ছাড়িয়ে নেয় তারা। তা না হলে সব চুলোয় দাও! পালাও দুনিয়ার শেষ কিনারায়!’
স্পষ্টতই জোতদার খেপাচ্ছিলেন সি্ভ্য়াজ্স্কিকে, কিন্তু তিনি শুধু চটছিলেন না তাই নয়, বোঝা যার মজাই পাচ্ছিলেন।
‘ও সব ব্যবস্থা ছাড়াই তো আমরা জোতজমা চালাচ্ছি’, হেসে বললেন তিনি, ‘আমি, লেভিন, উনি।’ অন্য জোতদারকে দেখালেন তিনি।
‘হ্যাঁ, মিখাইল পেত্রভিচ চালাচ্ছেন, কিন্তু জিজ্ঞেস করুন-না, কিভাবে? এটা কি-একটা যুক্তিযুক্ত ব্যবস্থা?’ বললেন জোতদার, স্পষ্টতই নিজের ‘যুক্তিযুক্ত’ শব্দটায় প্রীতি লাভ করে।
‘আমার জোতজমা চালানো সহজ’, বললেন মিখাইল পেত্রভিচ, ‘সৃষ্টিকর্তার দয়ায়; হৈমন্তী ট্যাক্সের টাকাটা তৈরি রাখলেই হল। কৃষকরা আসে; মালিক, উদ্ধার কর! তা সবাই আপনার লোক, পাড়া-প্রতিবেশী, মায়া হয়। তিন ভাগের প্রথম ভাগটা দিয়ে শুধু বলি; মনে রেখো, তোমাদের সাহায্য করলাম, আমার যখন দরকার পড়বে-ওট বুনতে, বিচালি বানাতে, ফসল তুলতে, তখন তোমারও সাহায্য করো। তারার কথা বলে নাও কার ভাগে কি। তবে তাদের মধ্যেও ধড়িবাজ আছে তা সত্যি।’
এই পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থা বহুদিন থেকে লেভিনের জানা, য়িাঙ্কির সাথে দৃষ্টি বিনিময় করে, মিখাইল পেত্রভিচের কথায় বাধা দিয়ে তিনি আবার ফিরলেন পাকা-মোচ জোতদারের দিকে
জিজ্ঞেস করলেন, ‘তাহলে কি আপনি বলতে চাইছেন? কিভাবে এখন জোতজমা চালাতে হবে?’
‘চালান মিখাইল পেত্রভিচের মত করে : হয় কৃষকদের আধভাগ দিন, নয় জমি পত্তনি দিন তাদের কাছে; এটা করা যায়, তবে এতে করে ধ্বংস পাচ্ছে রাষ্ট্রের সাধারণ সম্পদ। ভূমিদাসপ্রথায় আর ভালো ব্যবস্থাপনায় যেখানে আমি পেতাম নয় ভাগ, আধি প্রথায় পাচ্ছি তিন ভাগ। কৃষকমুক্তি রাশিয়ার সর্বনাশ করল।’
স্মিত দৃষ্টিতে সি্ভ্য়াজ্স্কি তাকালেন, লেভিনের দিকে, এমন কি প্রায় অলক্ষ্য একটা উপহাসেরও ইঙ্গিত দিলেন; কিন্তু জোতদারের কথাটা হাস্যকর ঠেকল না লেভিনের কাছে; সি্ভ্য়াজ্স্কিকে যতটা তিনি বোঝেন, তার চেয়ে জোতদারের কথাগুলো তাঁর কাছে বেশি বোধগম্য। কৃষকমুক্তিতে রাশিয়ার সর্বনাশ হয়েছে, এটা প্রমাণ করার পরে জোতদার আরো যা যা বলেছিলেন তার অনেক কিছুই লেভিনের কাছে মনে হয়েছিল সঠিক, তাঁর পক্ষে নতুন এবং অকাট্য। স্পষ্টতই জোতদার বলছিলেন তাঁর নিজস্ব মতামত যেটা ঘটে কদাচিৎ, আর সে মতামতে তিনি পৌঁছেছেন অলস মস্তিষ্ককে ব্যস্ত রাখার বাসনা থেকে নয়, গ্রামের নিঃসঙ্গতায় যে জীবন তিনি কাটিয়েছেন আর সব দিক দিয়ে ভেবে দেখেছেন, এ মতামত দেখা দিয়েছে তাঁর সেই পরিস্থিতি থেকেই।
‘দেখুন না, ব্যাপারটা হল এই যে সব কিছু প্রগতি ঘটে কেবল ক্ষমতার জোরে’, বলছিলেন তিনি, স্পষ্টতই দেখাতে চাইছিলেন যে শিক্ষা-দীক্ষার তিনি নেহাৎ অপাক্তেয় নন, পিচার, ইয়েকাতেরিনা, আলেকজান্ডারের সংস্কারগুলো ধরুন। ইউরোপের ইতিহাস নিন। কৃষির প্রগতির তো আরো বেশি। এমন কি আলু, তাও আমাদের এখানে চালু হয়েছে জোরজবরদস্তিতে। লোকে লাঙ্গল দিয়ে সব সময় জমি চষেছে এমন তো নয়। তাও চালু হয়েছে সম্ভবত ছোট ছোট রাজ্য গড়ে ওঠার সময়, কিন্তু নিশ্চয় চালু হয়েছে জোরজবরদস্তিতে। এখন, আমাদের কালে, আমরা জমিদাররা ভূমিদাসপ্রথার আমলে চাষ-আবাদ চালিয়েছি উন্নত পদ্ধতিতে; শুকাবার যন্ত্র, ঝাড়াইয়ের যন্ত্র, গোবর-সার দেওয়া, যত কিছু যন্ত্র—সব আমরা চালু করেছি নিজেদের ক্ষমতার জোরে, কৃষকরা প্রথমে বিরোধিতা করেছিল, পরে আমাদের অনুসরণ করতে থাকে। এখন, ভূমিদাসপ্রথা উঠে যাওয়ায় আমাদের ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হল, আর আমাদের চাষ-আবাদ যেখানে উঁচু মানে উঠেছিল তাকে একটা অতি আদিম, বর্বর স্তরে নেমে যেতে হবে। এই আমি বুঝি।’
‘কেন? পদ্ধতিটা যদি যুক্তিযুক্ত হয়, তাহলে মজুর খাটিয়ে তা চালাতে পারেন’, সি্ভ্য়াজ্স্কি বললেন।
‘ক্ষমতা নেই যে। জিজ্ঞেস করি কাকে দিয়ে তা চালাব?’
‘হ্যাঁ, শ্রমিক শক্তি—এই হল চাষ-আবাদের প্রধান উপাদান’, লেভিন ভাবলেন।
‘মজুর দিয়ে।
‘ভালো করে খাটতে আর ভলো হাতিয়ারপত্র নিয়ে খাটতে চায় না মজুরেরা। আমাদের মজুরেরা জানে শুধু একটা জিনিস—শুয়োরের মত মদ গিলতে, যে যন্ত্র ওদের দেওয়া হবে মাতাল হয়ে সবই নষ্ট করে ফেলবে। ঘোড়াকে পানি খাইয়ে খাইয়ে মারবে, ভালো সাজ কেটে ফেলবে, টায়ার পরানো চাকা বদলিয়ে মদ খাবে, মাড়াই কলে বোল্ট ঢুকিয়ে দেবে তা ভাঙাবার জন্যে। যা নিজের মতনটি নয়, তা দেখলে বমি আসে ওদের। চাষ-আবাদের সমস্ত মান নেমে গেছে এই জন্যে। জমি পড়ে থাকছে, ভরে উঠছে আগাছায় অথবা পত্তনি দেওয়া হচ্ছে কৃষকদের, আগে যেখানে ফলত দশ লাখ, এখন সেখানে ফলে কয়েক লাখ, চার ভাগের এক ভাগ; দেশের মোট সম্পদ কমে গেছে। যদি একই জিনিস করা হত হিসেব করে…’
