লেভিন যা আশা করেছিলেন, শিকারটা তেমন ভালো হয় না। জলা শুকিয়ে গিয়েছিল; স্নাইপ ছিল না একটাও। সারা দিন তিনি ঘুরলেন, আনলেন শুধু তিনটা পাখি, তবে শিকার থেকে ফিরলে সব সময় তাঁর যা হয়, এলেন চমৎকার খিদে, চমৎকার মেজাজ আর প্রচণ্ড শারীরিক শ্রমের পর তাঁর মানসিকতায় বরাবর যে উত্তেজনা দেখা দেয় তাই নিয়ে এবং শিকারকালে, যখন মনে হচ্ছিল তিনি কিছুই ভাবছেন না, তখনো থেকেই থেকেই তাঁর মনে পড়ছিল বৃদ্ধ আর তার সংসারের কথা আর সেটা যেন শুধু মনোযোগ নয়, তার সাথে জড়িত কি একটার সমাধানও দাবি করছিল।
সন্ধ্যায় চায়ের টেবিলে একটা অছির ব্যাপার নিয়ে আগত দুই জোতদারের উপস্থিতিতে শুরু হল লেভিনের প্রত্যাশিত সেই চিত্তাকর্ষক আলাপটা।
চায়ের টেবিলে লেভিন বসেছিলেন গৃহকর্ত্রীর কাছে, তাই তাঁর এবং লেভিনের সামনে উপবিষ্ট বোনটির সাথে তাঁর কথাবার্তা চালাতে হয়। গোলগাল মুখ গৃহস্বামিনীর। পাতলা রঙের চুল, মাথায় খাটো, কেবলি জ্বলজ্বলে করছেন গালের টোলে আর হাসিতে। তাঁর স্বামী লেভিনের কাছে যে গুরুত্বপূর্ণ প্রহেলিকা হাজির করেছেন লেভিন চেষ্টা করলেন ওঁর মারফত সেটার সমাধান পেতে; কিন্তু অবাধ চিন্তার সুযোগ তাঁর হচ্ছিল না, কেনন কষ্টকর অস্বস্তি হচ্ছিল তাঁর। কষ্টকর অস্বস্তি তাঁর হচ্ছিল এই জন্য যে তাঁর সামনে বসেছিল গৃহস্বামীর শালী, লেভিনের মনে হল সে যে পোশাকটা পরেছে সেটা বিশেষ করে তাঁর জন্যই, তাতে সাদা বুকের ওপর বিশেষ রকমের একটা উন্মুক্ত ট্রাপেজইডাল কাট; বুক ধবধবে সাদা হওয়া সত্ত্বেও, কিংবা বিশেষ করে বুক ধবধবে সাদা বলেই ওই চতুষ্কোণ কাটটা লেভিনের চিন্তার স্বাধীনতা হরণ করছিল। তিনি কল্পনা করলেন, খুব সম্ভবত ভুল করে, যে কাটটা তাঁর কথা ভেবেই করা হয়েছে। ভাবলেন ওটার দিকে তাকাবার অধিকার নেই তাঁর এবং চেষ্টা করলেন না তাকাতে; কিন্তু অনুভব করলেন, কাটটা যে করা হয়েছে, শুধু সে জন্যই তিনি দোষ। লেভিনের মনে হল তিনি দোষী। লেভিনের মনে হল তিনি কাউকে প্রতারণা করছেন, তাঁর উচিত কিছু-একটা বুঝিয়ে বলা, কিন্তু সেটা বোঝানো কিছুতেই চলে না, তাই তিনি অনবরত লাল হয়ে উঠতে লাগলেন, বোধ করলেন অস্থিরতা আর অস্বস্তি। তাঁর অস্থিরতা সঞ্চারিত হল সুন্দরী শালীটির মধ্যেও। কিন্তু গৃহকর্ত্রী মনে হল সেটা লক্ষ্য করছেন না এবং ইচ্ছে করেই তাঁকে টানলেন কথাবার্তায়।
‘আপনি বলছেন যে’, শুরু করা আলোচনাটা চালিয়ে গেলেন গৃহকর্ত্রী, ‘রুশী সব কিছুতে আমার স্বামীর আগ্রহ থাকতে পারে না। বরং উল্টো, বিদেশে থাকলে তিনি খুশি হন, কিন্তু কখনোই এখানকার মত নয়। এখানে নিজেকে তিনি অনুভব করেন স্বীয় পরিবেশে। কত কাজ ওঁর, সব কিছুতে আগ্রহী হবার গুণ আছে তাঁর। ওহো, আমাদের স্কুলে গেছেন আপনি?’
‘দেখেছি … আইভিতে ছাওয়া বাড়িটা তো?’
‘হ্যাঁ, ওটি নাস্তিয়ার কীর্তি’, বোনকে দেখিয়ে বললেন তিনি।
‘আপনি নিজেই পড়ান?’ লেভিন জিজ্ঞেস করলেন কাটটা এড়িয়ে তাকাবার চেষ্টা করে যদিও টের পাচ্ছিলেন, যেদিকেই তিনি তাকান না কেন, কাটটা তাঁর চোখে পড়বেনই।
‘হ্যাঁ, আমি নিজেই পড়াতাম এবং পড়াই, তবে আমাদের শিক্ষয়িত্রীটি চমৎকার। আমরা শরীরচর্চাও চালু করেছি।’
‘না, ধন্যবাদ। আর চা খাব না’, লেভিন বললেন, এবং অনুভব করছিলেন যে অসৌজন্য হচ্ছে, কিন্তু এ কথোপকথন আর চালাতে পারছেন না তিনি, লাল হয়ে উঠে দাঁড়ালেন। ‘খুব আগ্রহোদ্দীপক কথাবার্তা কানে আসছে’, যোগ দিলেন তিনি এবং গেলেন টেবিলের অন্য প্রান্তে যেখানে বসেছিলেন গৃহস্বামী ও জোদতার দুজন। য়িাঙ্কি বসেছিলেন টেবিলের দিকে পাশকে হয়ে, কনুই ভর দিয়ে কাপ ঘোরাচ্ছিলেন, অন্য হাত মুঠো করে দাড়ি ধরে থেকে থেকে তা নাকের কাছে নিয়ে যাচ্ছিলেন আবার নামিয়ে আনছিলেন, যেন শুঁকছেন। জ্বলজ্বলে কালো চোখে তিনি সোজা তাকিয়ে আনছিলেন, পাকা-মোট জোতদারের দিকে, স্পষ্টতই ভদ্রলোক যা বলছিলেন তাতে মজা পাচ্ছিলেন তিনি। কৃষকদের তিনি নিন্দা করছিলেন। লেভিন বেশ বুঝতে পারছিলেন, এর এমন জবাব সি্ভ্য়াজ্স্কির জানা আছে যে সাথে সাথেই ওঁর সমস্ত বক্তব্য ধূলিসাৎ হয়ে যাবে, কিন্তু যে পদে তিনি অধিষ্ঠিত তাতে সে জবাব দেওয়া য়ায় না, তাই জোতদারের মজাদার বক্তব্য তিনি শুনে যাচ্ছেন তৃপ্তির সাথেই।
পাকা-মোট জোতদারটি স্পষ্টতই ভূমিদাসপ্রথার ঝানু ভক্ত। গ্রামের পুরানো বাসিন্দা, বিষয়-কড়া মালিক। লেভিন তার লক্ষণ দেখলেন পোশাকে-সাবেককালের জীর্ণ সাটুকে, যাতে জোতদার অনভ্যস্ত, তাঁর বুদ্ধিমান ভ্রূকটিত চোখে, তাঁর রুশ ভাষার বাঁধুনিতে, স্পষ্টতই দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় রপ্ত করা প্রভুত্বব্যঞ্জক সুরে, অনামিকায় একটা পুরানো বিয়ের আংটি পরা বড় বড় লাল রোদে পোড়া হাতের দৃঢ় ভঙ্গিতে।
সাতাশ
‘যা গড়ে তুলেছি, যত মেহনত ঢালা হয়েছে, তা সব ভাসিয়ে দিতে মায়া না হলে…দূর ছাই বলে নিকোলাই ইভানিচের মত চলে যেতাম…সুন্দরী হেলেন শুনতে’, বুদ্ধিমান বৃদ্ধ মুখখানা প্রসন্ন হাসিতে উদ্ভাসিত করে জোতদার বললেন।
‘ভাসিয়ে তো দিচ্ছেন না’, বললেন নিকোলাই ইভানোভিচ সি্ভ্য়াজ্স্কি, ‘তার মানে খতিয়ে দেখেছেন। ‘
