শিকারে আমন্ত্রণ জানিয়ে সি্ভ্য়াজ্স্কি যে চিঠি দেন, সেটা পাওয়া মাত্র কথাটা তিনি ভেবেছিলেন, তাহলেও স্থির করলেন তাঁকে নিয়ে সি্ভ্য়াজ্স্কির এমন কিছু একটা চিন্তা আছে, এ অনুমানের মোটেই কোন ভিত্তি নেই, সুতরাং যাবেন। তাছাড়া অন্তরে অন্তরে চাইছিলেন নিজেকে পরীক্ষা করবেন, আবার মেয়েটার জন্য নিজের হৃদয়াবেগ বুঝে দেখবেন। সি্ভ্য়াজ্স্কির গার্হস্থ্য জীবন ভারি চমৎকার, আর লেভিন যাদের জানেন, তাদের মধ্যে জেমভের সেরা কর্মকর্তাদের অন্যতম হলেন সি্ভ্য়াজ্স্কি, লেভিনের তাঁকে সব সময়ই অতি চিত্তাকর্ষক লেগেছে।
সি্ভ্য়াজ্স্কি সেই ধরনের একজন লোক যারা সব সময়ই অবাক করে লেভিনকে, মতামত যাদের অতি সঙ্গতিপূর্ণ যদিও কখনোই স্বাধীন নয়, সেটা এসে যায় আপনা-আপনি, অথচ জীবনের ধারা অসাধারণ সুনির্দিষ্ট ও দৃঢ়, চলে আপনা থেকে, একেবারে স্বাধীনভাবে এবং প্রায় সব সময়ই যুক্তিকে নাকচ করে। সি্ভ্য়াজ্স্কি ছিলেন অসাধারণ উদার মতাবলম্বী ব্যক্তি। অভিজাত সম্প্রদায়কে ঘৃণা করতেন তিনি, মনে করতেন অধিকাংশ অভিজাতই গোপনে ভূমিদাস মালিক যদিও ভীরুতাবশে সেটা প্রকাশ করে না। মনে করতেন, রাশিয়া তুরস্কের মত একটা ধ্বংসপ্রাপ্ত দেশ আর রুশ সরকার এতই নচ্ছার যে, গুরুত্বসহকারে তার ক্রিয়াকলাপের সমালোচনা করতে দেয় না কখনো; সেই সাথে নিজে কিন্তু সরকারী কাজ চালাতেন, ছিলেন আদর্শ অভিজাত-প্রমুখ, আর বাইরে বেরোবার সময় সব সময়ই পরতেন লাল কর্ড দেওয়া পদপরিচায়ক টুপি। তিনি মনে করতেন যে মনুষ্যোচিত জীবনযাপন সম্ভব কেবল বিদেশে এবং সুযোগ পেলেই সেখানে যেতেন অথচ সেই সাথে রাশিয়ায় অতি জটিল ও আধুনিক একটা জোত চালাতেন, আর রাশিয়ার যা ঘটেছে, অসাধারণ আগ্রহে তার সব কিছু অনুধাবন করতেন, জানতেন সব কিছু। তিনি মনে করতেন বিকাশের দিক দিয়ে রুশ কৃষক রয়েছে বানর ও মানুষের মাঝামাঝি, অথচ জেমভো সভার নির্বাচনে সবার চেয়ে বেশি আগ্রহে করমর্দন করতেন কৃষকদের, শুনতেন তাদের মতামত। তন্ত্রেমন্ত্রে বিশ্বাস ছিল না তাঁর, কিন্তু যাজকদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন ও প্যারিসের সংখ্যা হ্রাসের প্রশ্ন নিয়ে খুবই ভাবিত থাকতেন, যদিও তাঁর গ্রামের উপাসনালয়টি যাতে থাকে তার জন্য তিনি চেষ্টার ত্রুটি করেননি।
নারীদের প্রশ্নে তিনি ছিলেন তাদের পূর্ণ স্বাধীনতার, বিশেষ করে শ্রমের অধিকারের চরমপন্থী পক্ষপাতীদের দলে, কিন্তু স্ত্রীর সাথে এমনভাবে দিন কাটাতেন যে লোকে তাঁদের নিঃসন্তান, মিলমিশ সংসার দেখে মুগ্ধ হত, স্ত্রীর জীবন তিনি এমনভাবে বেঁধে দিয়েছিলেন যে স্ত্রী কিছু করতেন না, কি করে আরো ভালোভাবে ফুর্তিতে দিন কাটানো যায়, স্বামীর সাথে এই সাধারণ উদ্বেগে ভাগ নেওয়া ছাড়া কিছু করতেও পারতেন না তিনি।
লোককে তার ভালো দিকটা দিয়ে বিচার করার গুণ লেভিনের না থাকলে সি্ভ্য়াজ্স্কির চরিত্র নিয়ে তাঁর মনে কোন জটিলতা বা প্রশ্ন দেখা দিত না; মনে মনে বলতেন লোকটা হাঁদা কিংবা ওঁছা, সব কিছুই পরিষ্কার হয়ে যেত। হাঁদা তিনি বলতে পারেন না, কেননা সি্ভ্য়াজ্স্কি নিঃসন্দেহেই শুধু অতি বুদ্ধিমানই নন, অতিশয় শিক্ষিতও আর সে শিক্ষা নিয়ে তাঁর কোন জাঁক নেই। এমন বিষয় নেই যা তিনি জানতেন না; কিন্তু নিজের জ্ঞান তিনি জাহির করতেন কেবল যখন তা করতে বাধ্য হতেন। তাঁকে ওঁছা বলতে লেভিন পারেন আরো কম, কেননা নিঃসন্দেহেই য়িাঙ্কি ছিলেন সৎ, দয়ালু, বিচক্ষণ লোক, সজীব ফূর্তিতে তিনি নিরন্তর যে কাজ করে যেতেন, চারপাশের লোকেরা তাতে খুবই মূল্য দিত এবং নিশ্চয় সজ্ঞানে কোন খারাপ কাজ তিনি কখনো করেননি, তাঁর পক্ষে করা সম্ভবই নয়।
লেভিন চেষ্টা করেছেন তাঁকে বুঝতে কিন্তু বুঝতে পারেননি, তিনি এবং তাঁর জীবনে লেভিনের কাছে সব সময় মনে হয়েছে একটা জীবন্ত প্রহেলিকা।
লেভিনের সাথে তাঁর বন্ধুত্ব ছিল, তাই সি্ভ্য়াজ্স্কিকে জেরা করে ভাঁর জীবনদৃষ্টির মূলে পৌঁছানোর চেষ্টা করা সম্ভব বলে লেভিন মনে করেছিলেন; কিন্তু সর্বদা বৃথা হয়েছে সে চেষ্টা। যতবার সি্ভ্য়াজ্স্কির মানসের যে অভ্যর্থনা কক্ষ সবার কাছে উন্মুক্ত তার আরো ভেতরে যেতে গেছেন, ততবার সি্ভ্য়াজ্স্কি যে সামান্য বিব্রত বোধ করছেন, সেটা নজরে পড়েছে তাঁর; প্রায় অলক্ষ্য একটা শংকা ফুটেছে তাঁর, দৃষ্টিতে, যেন ভয় পাচ্ছেন লেভিন তাঁকে বুঝে ফেলবেন, হৃদয় হাসি-খুশিতে তিনি নিরস্ত করেছেন লেভিনকে।
এখন, বিষয়-আশয়ে মোহভঙ্গ হবার পর সি্ভ্য়াজ্স্কির ওখানে যাওয়াটা খুবই মনোরম লেগেছিল লেভিনের কাছে। নিজেদের এবং অন্য সবাইকে নিয়ে খুশি এই সৌভাগ্যবান কপোতেরা, তাঁদের সুন্দর বাসাটি তাঁর ওপর যে সুখাবেশ ফেলছিল সে কথা ছেড়ে দিলেও নিজের জীবনে অতি অসন্তুষ্ট বোধ করে লিভেনের ইচ্ছে হচ্ছিল সি্ভ্য়াজ্স্কির মধ্যে তিনি সেই গোপন রহস্যটা ধরতে পারবেন, যা তাঁর জীবনে এনে দিচ্ছে এতটা স্পষ্টতা, সুনির্দিষ্টতা আর আনন্দ। তাছাড়া লেভিন জানতেন যে সি্ভ্য়াজ্স্কির প্রতিবেশীর জোতদার, আর জোতজমা নিয়ে, ফসল, ভাড়া করা মুনিষ ইত্যাদি নিয়ে যে কথাবার্তাগুলো সবচেয়ে নিচু স্তরের গণ্য করা হয় বলে লেভিন জানতেন কিন্তু যা তাঁর কাছে এখন একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ, তা শোনা এবং তা নিয়ে কথার আদান-প্রদান তাঁর কাছে এখন অতি আগ্রহজনক। ‘এটা হয়ত ভূমিদাসপ্রথার আমলে কিংবা ইংলন্ডের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ নয়, উভয় ক্ষেত্রেই পরিস্থিতিটা সুনির্দিষ্ট। কিন্তু আমাদের এখানে এখন যখন সব কিছু ওলটপালট হয়ে গেছে এবং মাত্র সুস্থির হচ্ছে, পরিস্থিতিটা কি রকম হওয়া উচিত, এ প্রশ্ন যখন সবে দানা বাঁধছে, তখন রাশিয়ায় শুধু এটাই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন’, ভাবলেন লেভিন 1
