‘কি চষলে?’ লেভিন জিজ্ঞেস করলেন।
‘আলু। আমাদেরও জমি আছে। ফেদত, খাসি ঘোড়াটাকে তুই ছাড়িস না, পাতনার সাথে বেঁধে রাখ, অন্যটাকে জুত।’
‘কি বাবা, আমি যে ফাল আনতে বলেছিলাম, এনেছ?’ জিজ্ঞেস করল দীর্ঘাঙ্গী স্বাস্থ্যবান এক ছোকরা, স্পষ্টতই বুড়োর ছেলে।
‘ওই যে…স্লেজে’, লাগামগুলো খুলে গুটিয়ে মাটিতে ফেলে দিয়ে বুড়ো বলল, ‘ওরা খেতে খেতে জুড়ে ফ্যাল।’
ভরা বালতিতে টানটান কাঁধে সুশ্রী মেয়েটা ঢুকল বারান্দায়। কোত্থেকে দেখা দিল আরো মেয়ে — অল্পবয়সীরা সুন্দরী, মধ্যবয়সী ও বৃদ্ধারা অসুন্দর, কারো সাথে শিশু, কারো নেই।
সামোভারের নল গোঁ-গোঁ করে উঠল। ঘোড়াগুলোর ব্যবস্থা করে মজুর আর ঘরের লোক সবাই গেল খেতে। লেভিন গাড়ি থেকে নিজের খাবার-দাবার এনে বুড়োকে আমন্ত্রণ করলেন তাঁর সাথে চা খেতে।
‘আজ চা তো খাওয়া হয়ে গেছে’, বুড়ো বলল, স্পষ্টতই আনন্দের সাথে প্রস্তাবটা গ্রহণ করে, ‘তবে সঙ্গদান করা আর-কি।’
লেভিন চা খেতে খেতে বুড়োর বিষয়-আশয়ের সমস্ত খবরাখবর শুনলেন। দশ বছর আগে জমিদারনীর কাছ থেকে একশ’ বিশ দেসিয়াতিনা জমি সে ইজারা নেয়। গত বছর জমিটা সে কিনে নিয়েছে। আরো তিনশ’ দেসিয়াতিনা সে পত্তনি নিয়েছে পাশের জমিদারের কাছ থেকে। জমিটার অল্পাংশ, সবচেয়ে খারাপ যেটা, নিজেই সে পত্তনি দিয়েছে অন্যকে। সে নিজে পরিবারের লোকজন আর দুটো মুনিষ ভাড়া করে চষেছে মাঠের চল্লিশ দেসিয়াতিনা। বুড়ো খেদ করলে যে অবস্থা ভালো যাচ্ছে না। তবে লেভিন বুঝলেন যে খেদটা নেহাৎ সৌজন্যবশত, বিষয়-আশয় ভালোই চলছে। খারাপ হলে একশ’ পাঁব রুব্ল দরে জমি কিনত না, বিয়ে দিত না তিন ছেলে আর ভাইপোর, আগুন লাগার পর দু’বার নতুন করে বাড়ি বানাত না, আর প্রতিবারই তা আগের চেয়ে ভালো। বুড়োর খেদ সত্ত্বেও বেশ বোজা যাচ্ছিল সে সঙ্গত কারণেই নিজের শ্রীবৃদ্ধিতে গর্বিত, নিজের ছেলেদের নিয়ে, ভাইপোকে নিয়ে, বৌমাদের নিয়ে, ঘোড়া, গরু এবং বিশেষ করে সে যে এই সম্পত্তিটা চালাচ্ছে গর্বিত তার জন্য। বুড়োর সাথে কথাবার্তা থেকে লেভিন জানতে পারলেন নতুনত্ব প্রবর্তনে সে মোটেই গররাজী নয়। আলু বুনেছে সে, আর আসার সময় লেভিন যা দেখেছেন, আলুগাছগুলোর ফুল এর মধ্যেই, ঝরে ফল দিতে শুরু করেছে যেক্ষেত্রে লেভিনের নিজের আলুগাছগুলোর ফুল ফুটতে শুরু করেছে সবে। জমিদারের কাছ থেকে নেওয়া লাঙল, যাকে সে বলছিল লাওল, তা দিয়ে আলুগাছগুলোর চারপাশের মাটি সে আলগা করে দেয়। গম বুনেছে সে। ছোট্ট একটা ঘটনা বিশেষ রকম অবাক করল লেভিনকে : রাই খেত নিড়ানির সময় সে ওই নিড়ানির রাই খাওয়াত ঘোড়াকে। চমৎকার এই খাদ্যটা নষ্ট হচ্ছে দেখে লেভিন কতবার ওগুলো সংগ্রহ করতে চেয়েছেন কিন্তু প্রতিবারই দেখা গেছে তা অসম্ভব। এ কৃষকটি কিন্তু তা করেছে, এ খাদ্যের প্রশংসায় যে পঞ্চমুখ।
‘মহিলাগুলো আছে কি করতে? রাস্তায় স্তূপ দিয়ে রাখুক, গাড়ি এসে নিয়ে যাবে।’
‘আর আমাদের জমিদারদের মহা ঝামেলা মজুর নিয়ে’, এক গ্লাস চা এগিয়ে দিয়ে লেভিন বললেন।
‘ধন্যবাদ’, বুড়ো বলল। চা নিলে, কিন্তু চিনি নিতে চাইল না, কামড়ে খাওয়া একদলা মিছরি পড়ে ছিল, সেটা সে দেখাল। বলল, ‘মুনিষ দিয়ে কাজ চলে কখনো? শুধুই লোকসান। এই সি্ভ্য়াজ্স্কির কথাই ধরুন-না কেন। কি জমি সে তো আমরা জানি, সরেস, কিন্তু ফসলটি তেমন হয় কি? সবই হেলা ফেলা!’
‘কিন্তু তুমিও তো মুনিষ খাটিয়ে চালাও?
‘আমরা যে কৃষক। নিজেরাই সব দেখি। কাজ যদি খারাপ করে দূর হও; নিজেরাই চালিয়ে নেব।’
‘বাবা, ফিনোগেন আলকাতরা চাইছে’, ঘরে ঢুকে বলল গালোশ পরা মেয়েটা।
‘এই হল গিয়ে ব্যাপার সাহেব!’ উঠে দাঁড়িয়ে বুড়ো বলল, ক্রুশ করল সে অনেকক্ষণ ধরে, তারপর লেভিনকে ধন্যবাদ জানিয়ে বেরিয়ে গেল।
কোচোয়ানকে ডাকার জন্য লেভিন যখন কুটিরের ভেতরে ঢুকলেন, দেখলেন—সব পুরুষেরা টেবিল ঘিরে বসেছে। মেয়েরা পরিবেশন করছে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। হৃষ্টপুষ্ট ছোকরা একটা ছেলে এক গ্রাস চরু মুখে পুরে হাস্যকর কি-একটা ব্যাপার বলছিল আর সবাই ফেটে পড়ছিল হাসিতে, বিশেষ করে গালোশ পরা মেয়েটা, পেয়ালায় বাঁধাকপির স্যুপ ঢালছিল সে।
লেভিনের মনে এই কৃষক গৃহটি সমৃদ্ধির যে ছাপ ফেলেছিল, গালোশ পরা মেয়েটার সুশ্রী মুখখানা তাতে বহু দিক থেকে সাহায্য করে থাকতে পারে, কিন্তু ছাপটা এতই প্রবল যে লেভিন তা থেকে ছাড়ান পাচ্ছিলেন না। বুড়োর ওখান থেকে সি্ভ্য়াজ্স্কির কাছে যাওয়ার গোটা পথটায় থেকে থেকেই তিনি স্মরণ করছিলেন এই সংসারটার কথা, যেন তাঁর বিশেষ মনোযোগ দাবি করছে সেটা।
ছাব্বিশ
সি্ভ্য়াজ্স্কি ছিলেন তাঁর উয়েদের অভিজাত-প্রমুখ। লেভিনের চেয়ে তিনি পাঁচ বছরের বড়, বিয়ে হয়েছে অনেকদিন। তাঁদের সাথে বাড়িতে থাকত সি্ভ্য়াজ্স্কির তরুণী শালী, যাকে খুবই সুন্দরী বলে মনে হত লেভিনের। লেভিন এও জানতেন যে, সি্ভ্য়াজ্স্কি এবং তাঁর স্ত্রী খুবই চান যে লেভিনের সাথে মেয়েটার বিয়ে হোক। সেটা তিনি নিঃসন্দেহে জানতেন যেমন তা সব সময়ই জানা থাকে বর নামক যুবাপুরুষদের, যদিও কাউকে কখনো সে কথা বলার সাহস পাননি এবং এও তিনি জানতেন যে যদিও তিনি বিবাহিত হতে ইচ্ছুকই, যদিও অতি মনোহারিণী মেয়েটার উত্তম স্ত্রী হওয়ারই কথা, তাহলেও কিটির প্রেমের না পড়লেও এ মেয়েটাকে তিনি বিয়ে করতে পারেন না, যেমন পারেন না আকাশে উড়ে যেতে। সি্ভ্য়াজ্স্কির কাছে আসা থেকে যে তৃপ্তি তিনি পাবেন বলে আশা করছিলেন, এই জ্ঞানটা তা মাটি করে দিচ্ছিল।
