এর সাথে আবার যোগ দিয়েছে তাঁর কাছ থেকে তিরিশ ভার্স্ট দূরে কিটি শ্যেরবাৎস্কায়ার উপস্থিতি, যাকে তিনি দেখতে চাইছেন অথচ পারছেন না। যখন উনি দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনা অলোস্কায়ার ওখানে গিয়েছিলেন উনি তখন আসতে বলেছিলেন লেভিনকে : আসতে বলেছিলেন যাতে বোনের কাছে উনি পুনরায় বিবাহপ্রস্তাব দেন। ইঙ্গিত করেছিলেন যে সেটা এখন সে গ্রহণ করবে। কিটি শ্যেরবাৎস্কায়াকে দেখে লেভিন নিজেও বুঝেছিলেন যে কিটিকে তিনি ভালোবাসেন এখনো; কিন্তু কিটি অব্লোন্স্কিদের ওখানে আছে এটা জানা থাকায় তিনি সেখানে যেতে পারেন না। তিনি প্রস্তাব দিয়েছিলেন আর সে যে তা প্রত্যাখ্যান করেছে, এতে সৃষ্টি হয়েছে ওঁদের মধ্যে এক অনতিক্রম্য বাধা। ‘কিটি যাকে চেয়েছিল তার স্ত্রী হতে সে পারল না। শুধু এ কারণেই আমি তাকে অনুরোধ করতে পারি না আমার স্ত্রী হতে’, মনে মনে ভাবলেন লেভিন। এই ভানটা তাঁকে করে তুলল কিটির প্রতি নিরুত্তাপ ও বিরূপ। ‘ভর্ৎসনার একটা বোধ না নিয়ে ওর সাথে কথা বলা, বিদ্বেষ বোধ না করে ওকে তাকিয়ে দেখার সাধ্য আমার হবে না, এতে সে শুধু আমাকে আরো ঘৃণা করবে এবং তাই উচিত। তাছাড়া এখন দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনা আমাকে যা বলেছেন তারপর কি করে ওঁদের যেতে পারি? ওঁর বলা থেকে আমি যা জেনে গেছি সেটা কি না-দেখাতে পারি আমি? আর মহত্ত্ব নিয়ে আমি কিনা যাব তাকে ক্ষমা করতে, কৃপা করতে। তার সামনে কিনা নেব ক্ষমাশীল প্রেমদাতার ভূমিকা!… কেন যে দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনা আমাকে ওটা বললেন? দৈবাৎ আমি যদি ওকে দেখতে পেতাম, তাহলে সব কিছু হতে পারত আপনা থেকে কিন্তু তা অসম্ভব, অসম্ভব!’
কিটির জন্য মেয়েদের একটা জিন চেয়ে পাঠিয়েছিলেন দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনা। লিখেছিলেন, ‘শুনেছি, আপনার জিন আছে। আশা করি, নিজেই সেটা নিয়ে আসবেন।
এটা তাঁর সহ্যাতীত। বুদ্ধিমতী সুচরিতা নারী বোনকে এমন হীনতায় ফেলতে পারেন কি করে! গোটা দশেক চিঠি লিখলেন তিনি, কিন্তু সব ছিঁড়ে ফেলে জিনটা পাঠালেন কোন জবাব না দিয়ে। তিনি যাবেন এ কথা লেখা অসম্ভব কারণ তিনি যেতে পারেন না। আবার উনি যেতে পারছেন না কারণ কিছু-একটা বাধা আছে অথবা অন্য কোথাও চলে যাচ্ছেন, এ কথা লেখা আরো খারাপ। জবাব না দিয়ে জিনটা পাঠালেন এই চেতনা নিয়েই যে একটা লজ্জার কাজ করলেন, পরের দিন বিরক্তিকর চাষাবাসের সমস্ত বার গোমস্তার হাতে তুলে দিয়ে তিনি বন্ধু সি্ভ্য়াজ্স্কির কাছে চলে গেলেন দূরের উয়েদে যার কাছাকাছি আছে একটা চমৎকার স্নাইপ জলা। ওঁর ওখানে যাবার সংকল্প তাঁর বহুদিনের, সেটা পূরণ করার অনুরোধ জানিয়ে সম্প্রতি চিঠিও লিখেছেন বন্ধুটি। সুরোভস্কি উয়েদের স্লাইপ জলা বহুদিন প্রলুব্ধ করেছে লেভিনকে, কিন্তু বিষয়কর্মের দরুন যাত্রাটা তিনি কেবলি পিছিয়েছেন। এবার কিন্তু শ্যেরবাৎস্কিদের নৈকট্য, বড় কথা বিষয়-আশয় ছেড়ে ঠিক শিকারে যেতেই আনন্দ হল তাঁর। সমস্ত দুঃখ-কষ্টে শিকারেই তিনি সেরা সান্ত্বনা পেয়েছেন।
আন্না কারেনিনা – ৩.২৫
সুরোভস্কি উয়েদে রেলপথ বা ডাকপথ কিছুই ছিল না, লেভিন গেলেন নিজের ঘোড়ায় টানা তারান্তাসে। মাঝপথে ঘোড়াগুলোকে খাওয়াবার জন্য লেভিন থামলেন এক ধনী কৃষকের বাড়ির কাছে। গালের কাছে পেকে যাওয়া পাটকিলে চাপ-দাড়িওয়ালা এক টেকো চাঙ্গা বুড়ো ফটক খুলে থামের সাথে সেঁটে তিন ঘোড়ার গাড়িটায় যাবার পথ করে দিলে। রোদে পোড়া কাঠের লাঙল রাখা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন প্রশস্ত একটা নতুন আঙিনায় চালার তলে ঘোড়াগুলোকে রাখবার জায়গাটা কোচোয়ানকে দেখিয়ে দিয়ে বুড়ো লেভিনকে ডাকল বড় ঘরে। বিনা মোজার গালোশ পরা পরিচ্ছন্ন পোশাকের একটা যুবতী ঘাড় গুঁজে নতুন বারান্দার মেঝে ঘষছিল। লেভিনের পিছু পিছু ছুটে আসা কুকুরটা দেখে ভয় পেয়ে চেঁচিয়ে উঠল সে, কিন্তু কামড়াবে না শুনে তখনই নিজের ভয় পাওয়াতেই হেসে ফেললে। সুন্দর মুখখানা লুকিয়ে আবার পরিষ্কার করতে লাগল মেঝে।
মেয়েটা জিজ্ঞেস করলে, ‘সামোভার আনব?’
‘তা আনুন-না।’
ঘরখানা বেশ বড়, পার্টিশান দেওয়া, একটা ওলন্দাজ চুল্লি আছে। দেবপটগুলোর নিচে রঙিন নকশা আঁকা টেবিল, বেঞ্চি, দুটো চেয়ার। ঢোকার মুখে বাসনপত্রে ভরা আলমারি। জানালার খড়খড়ি বন্ধ, তাই মাছি কম, আর সবই এমন ঝকঝকে-তকতকে যে লেভিনের ভয়ই হল, রাস্তায় ছুটতে ছুটতে তাঁর কুকুর লাস্কা পানিতে ডুব দিয়ে এসেছে, সে না আবার মেঝে মাড়ায়, দরজার কাছে এক কোণে তাকে বসে থাকার হুকুম দিলেন তিনি। ঘরখানা দেখে লেভিন পেছনকার আঙিনায় বেরোলেন। গালোশ পরা সুশ্রী মেয়েটা বাঁকে দুটো খালি বালতি দোলাতে দোলাতে লেভিনের সামনে দিয়ে ছুটে গেল কুয়ো থেকে পানি আনতে।
‘চটপট!’ তার উদ্দেশে ফুর্তিতে চেঁচিয়ে বুড়ো এল লেভিনের কাছে। ‘সাহেবের কি নিকোলাই ইভানোভিচ সি্ভ্য়াজ্স্কির ওখানে যাওয়া হচ্ছে? আমাদের এখানেও উনি এসে থাকেন’, অলিন্দের রেলিঙে কনুই ভর দিয়ে বুড়ো শুরু করল আলাপের আগ্রহ নিয়ে।
সি্ভ্য়াজ্স্কির সাথে তার পরিচয়-বৃত্তান্তের মাঝখানে আবার ক্যাচক্যাচ করে উঠল ফটক, কাঠের লাঙল আর মই নিয়ে খেত থেকে আঙিনায় ফিরল মুনিষেরা। লাঙল আর মইয়ের সাথে জোতা ঘোড়াগুলো হৃষ্টপুষ্ট, বড় বড়। মুনিষেরা স্পষ্টতই ঘরের লোক, দুজন জোয়ান, পরনে ক্যালিকো কামিজ, মাথায় টুপি, বাকি দুজন ঘরে বোনা জামা পরা ভাড়া করা মুনিষ—একজন বুড়ো, অন্যজন ছোকরা। অলিন্দ থেকে নেমে বুড়ো গেল ঘোড়া খুলতে।
