আন্না হল পেরিয়ে দৃঢ় পদক্ষেপে এগোলেন তাঁর উদ্দেশে। যখন ঘরে ঢুকলেন উনি তখন উর্দি পরে আছেন, স্পষ্টতই বেরোবার জন্য তৈরি, বসে আছেন ছোট টেবিলটায় কনুইয়ে ভর দিয়ে, বিষণ্নভাবে তাকিয়ে আছেন সামনে উনি আন্নাকে দেখতে পাওয়ার আগে আন্নাই ওঁকে দেখেন প্রথম এবং বুঝলেন যে তাঁর কথাই উনি ভাবছেন।
আন্নাকে দেখে উনি উঠতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু মত পালটালেন, তারপর হঠাৎ মুখ তাঁর লাল হয়ে উঠল যা আগে কখনো আন্না দেখেননি। তাড়াতাড়ি করে উঠে তিনি এলেন আন্নার কাছে, আন্নার চোখের দিকে না চেয়ে তাকালেন ওপরে, তাঁর কপাল আর কবরীর দিকে। তাঁর হাতটা নিয়ে বসতে বললেন তাঁকে।
‘আমি খুশি হয়েছি যে আপনি এসেছেন’, আন্নার কাছে বসে তিনি বললেন, বোঝা যায় কিছু-একটা জানাতে চাইছিলেন তিনি, কিন্তু থতমত খেলেন। বারকয়েক তিনি কথা শুরু করতে চেয়েছিলেন কিন্তু থেমে যাচ্ছিলেন … এই সাক্ষাটার জন্য তৈরি হতে গিয়ে ওঁকে ঘৃণা করা এবং ওঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ করা উচিত বলে নিজেকে বোঝালেও আন্না ভেবে পেলেন না কি ওঁকে বলবেন, করুণা হচ্ছিল ওঁর ওপর। এভাবেই নীরবতা চলল বেশ কিছুক্ষণ ধরে। ‘সেরিওজা ভালো আছে?’ এবং জবাবের জন্য অপেক্ষা না করে কারেনিন যোগ দিলেন, ‘আজ আমি বাড়িতে খাব না আর এখুনি বেরোতে হবে আমাকে।’
আন্না বললেন, ‘আমি মস্কো যেতে চাইছিলাম।’
‘না, আপনি এসে খুবই—খুবই ভালো করেছেন’, এই বলে আবার চুপ করে গেলেন উনি
কথা বলতে শুরু করার সাধ্য ওঁর নেই দেখে আন্না নিজেই শুরু করলেন : ‘কারেনিন’, আন্না বললেন তাঁর দিকে তাকিয়ে, তাঁর কবরীতে নিবদ্ধ স্বামীর দৃষ্টি থেকে চোখ না নামিয়ে, ‘আমি পাতকিনী নারী, আমি বদ মেয়ে, কিন্তু আমি যা ছিলাম, আপনাকে তখন যা বলেছিলাম আমি তাই, আপনাকে বলতে এসেছি যে কিছুই বদলাতে পারব না আমি।’
‘আমি আপনাকে ও-কথা বলিইনি’, উনি বললেন হঠাৎ দৃঢ়ভাবে, আক্রোশ সোজা আন্নার চোখের দিকে তাকিয়ে, ‘আমিও তাই অনুমান করেছিলাম।’ বোঝা যায় ক্রোধের প্রভাবে উনি আবার তাঁর সমস্ত সামর্থ্যের ওপর দখল পেয়ে গেছেন, কিন্তু আপনাকে আমি তখন যা বলেছিলাম এবং লিখেছি’, তীক্ষ্ণ সরু গলায় বলে উঠলেন তিনি, ‘আর এখন পুনরুক্তি করছি যে আমি ওটা জানতে বাধ্য নই। ওটা আমি উপেক্ষা করছি। সব নারী আপনার মত অমন সহৃদয় নয় যে তাড়াতাড়ি করে এত উপভোগ্য একটা সংবাদ স্বামীকে জানাতে যাবে’, ‘উপভোগ্য’ কথাটার ওপর বিশেষ জোর দিলেন তিনি। ‘যতদিন সমাজ এটা জানছে না, আমার সুনাম কলংকিত হচ্ছে না, ততদিন ওটা আমি উপেক্ষা করব। সেই কারণে আমি আপনাকে শুধু সাবধান করে দিয়েছে যে, আমাদের সম্পর্ক বরাবর যেমন ছিল তেমনি থাকা চাই। আর আপনি যদি নিজের মান খোয়ান, কেবল সেক্ষেত্রেই আমার মর্যাদা বাঁচাবার জন্যে ব্যবস্থা নিতে হবে আমাকে।’
‘কিন্তু আমাদের সম্পর্ক বরাবর যা ছিল তা থাকতে পারে না’, সভয়ে ওঁর দিকে তাকিয়ে ভীরু ভীরু গলায় বললেন আন্না।
আন্না যখন আবার তাঁর এই অবিচলিত ভঙ্গিটা দেখলেন, শুনলেন তাঁর এই তীক্ষ্ণ, ছেলেমানুষি, হাস্যকর কণ্ঠস্বর, বিতৃষ্ণায় তাঁর ভেতরকার করুণা উবে গেল, এখন মাত্র ভয় পাচ্ছিলেন তাঁকে, কিন্তু যে করেই হোক নিজের অবস্থাটা পরিষ্কার করে নিতে চাইছিলেন তিনি।
‘আমি আপনার স্ত্রী থাকতে পারি না যখন আমি…’ বলার উপক্রম করলেন আন্না।
আক্রোশ-ভরা নিরুত্তাপ হাসি হেসে উঠলেন উনি। ‘যে ধরনের জীবন আপনি বেছে নিয়েছেন সেটা নিশ্চয় আপনার বোধগুলোয় ছায়া ফেলেছে। আমি এতই শ্রদ্ধা বা ঘৃণা এবং দুই-ই…আপনার অতীতের প্রতি শ্রদ্ধা, বর্তমানের প্রতি ঘৃণা পোষণ করি…যে আমার কথার যে ব্যাখ্যা আপনি করছেন তা থেকে আমি বহু দূরে।’
দীর্ঘশ্বাস ফেলে আন্না মাথা নিচু করে বললেন, ‘তবে আমি বুঝতে পারছি না। আপনার মত এতটা স্বাধীনতা পেয়ে’, উত্তেজিত হয়ে বলে চললেন তিনি, ‘সরাসরি নিজের বিশ্বাসঘাতকতার কথা স্বামীকে বলার মধ্যে দোষের কিছু দেখতে না পেলেও, যা মনে হচ্ছে, স্বামীর কাছে স্ত্রীর দায়-দায়িত্ব পালনটা কেন দোষের বলে ধরছেন।’
‘কারেনিন, আমার কাছ থেকে কি আপনার চাই?’
আমি চাই যে লোকটাকে আমি যেন এখানে না দেখি আর আপনি এমনভাবে চলবেন যাতে সমাজ বা চাকর- বাকররা আপনার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনতে না পারে…এবং আপনি ওর সাথে দেখা না করেন। মনে হয় এটা তেমন বেশি কিছু নয়। এর জন্যে আপনি স্ত্রীর দায়িত্ব পালন না করেও সাধ্বী স্ত্রীর অধিকার ভোগ করবেন। আপনাকে এ কথাটাই বলতে চাইছিলাম। এবার আমার যাবার সময় হয়ে গেছে। বাড়িতে খাব না।’
দরজার দিকে উনি উঠে গেলেন। আন্নাও উঠলেন। আন্নার যাবার জন্য নীরবে উনি মাথা নুইয়ে পথ করে দিলেন।
চব্বিশ
যে রাতটা লেভিন বিচালির স্তূপের ওপর কাটান সেটা তাঁর ওপর ছাপ না ফেলে যায়নি; যে চাষ-আবাদ তিনি দেখছিলেন তাতে তাঁর বিরাগ ধরল, কোন আগ্রহ আর রইল না তাতে। চমৎকার ফসল হলেও এ বছরের মত এত অসাফল্য এবং তাঁর ও কারেনিনদের মধ্যে এত শত্রুতা আর কখনো দেখা যায়নি। অন্ততপক্ষে তাঁর মনে হল যে, দেখা যায়নি। এই অসাফল্য আর শত্রুতার কারণ এখন তাঁর কাছে একেবারে পরিষ্কার। খোদ কাজ করার মধ্যেই যে অপূর্বতা তিনি অনুভব করেছিলেন, তার ফলে কৃষকদের সাথে ঘনিষ্ঠতা, তাদের প্রতি, তাদের জীবনের প্রতি তাঁর ঈর্ষা, যে জীবনে চলে যাবার জন্য তাঁর বাসনা, সে রাতে যেটা আর স্বপ্ন নয়, সুচিন্তিত সমস্ত খুঁটিনাটি নিয়ে তাঁর একটা সংকল্প, চাষ-আবাদ দেখাশোনা নিয়ে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি এসবে এত বদলে গেল যে তিনি ও কাজে পূর্বের আগ্রহ আর বোধ করতে পারলেন না, কর্মীদের সাথে যে নিজের বিরূপ সম্পর্কটা গোটা ব্যবস্থাটার ভিত্তি, না দেখে পারলেন না সেটা। পাভার মত উন্নত জাতের গরু, সার ফেলা হাল দেওয়া মাটি, ঝোপে ঘেরা নয়টি সমতল খেত, গভীর করে গোবর দেওয়া নব্বই দেসিয়াতিনা জমি, হলরেখা বরাবর বপনযন্ত্র ইত্যাদি— এসবই চমৎকার যদি এগুলো তিনি করতেন নিজে অথবা তাঁর প্রতি সহানুভূতিশীল বন্ধুদের সাথে একত্রে। কিন্তু এখন তিনি পরিষ্কার দেখতে পেলেন (কৃষি নিয়ে যে লেখাটায় তিনি বলেছেন যে জোতের প্রধান উপাদান হওয়া উচিত শ্রমিক, তা নিয়ে খাটতে গিয়ে এ ব্যাপারে বহু দিক থেকে সাহায্য হয়েছে তাঁর), পরিষ্কার দেখতে পেলেন, যে চাষ-আবাদ তিনি দেখাশোনা করছিলেন সেটা কেবল তাঁর আর তাঁর কর্মীদের মধ্যে একরোখা নির্মম একটা সংগ্রাম যাতে এক দিকে, তাঁর পক্ষে ছিল সেরা নিদর্শন বলে তিনি যা গণ্য করছেন সেই অনুসারে সব কিছু ঢেলে সাজার জন্য নিরন্তর প্রাণপণ প্রয়াস, অন্যদিকে স্বভাবসিদ্ধ একটা গতানুগতিকতা। এই সংগ্রামে তিনি দেখলেন যে, তাঁর দিক থেকে প্রচণ্ড শক্তি নিয়োগ এবং অপর দিকে কোনরূপ প্রয়াস। এমন কি ইচ্ছারও অভাবে ফল হয়েছে কেবল এই যে চাষবাসে দাঁড়ায়নি কিছু, একেবারে খামোকা নষ্ট হয়েছে চমৎকার হাতিয়ারপত্র, চমৎকার গবাদি পশু আর মাটি। প্রধান কথা, এই দিকে নিযুক্ত কর্মোদ্যোগ শুধু যে একেবারে বৃথা গেছে তাই নয়, এখন-তাঁর চাষ-আবাদের অর্থ যখন তাঁর কাছে উদ্ঘাটিত হয়ে পড়েছে তখ তিনি এটা অনুভব না করে পারেন না যে কর্মোদ্যোগের লক্ষ্যটাই ছিল অমর্যাদাকর। আসলে সংগ্রামটা কি নিয়ে? তাঁর দিকে থেকে প্রতিটা পয়সা নিয়ে (আর তা না হয়ে পারে না, কেননা উদ্যমে ঢিল দিলে শ্রমিকদের বেতন দেবার মত টাকাও জুটবে না তাঁর), আর ওরা শুধু শান্তিতে আর আনন্দে অর্থাৎ যেভাবে তারা অভ্যস্ত শুধু সেভাবে খাটার পক্ষপাতী। তাঁর স্বার্থ হল প্রতিটা মুনিষ যেন যথাসম্ভব বেশি খাটে, না ঝিমায়, যেন চেষ্টা করে চাষের যন্ত্রপাতি ভেঙে না ফেলতে, যে কাজটা সে করছে তা নিয়ে যেন মাথা ঘামায়; মুনিষের কিন্তু ইচ্ছে যথাসম্ভব আনন্দে, বিশ্রাম নিয়ে খাটায়, সবচেয়ে বড় কথা, খাটতে চায় বিনা চিন্তা-ভাবনায় ঝিমিয়ে ঝিমিয়ে। এবারকার গ্রীষ্মে লোভিন এটা লক্ষ্য করেছেন প্রতি পদে। যেসব খারাপ দেসিয়াতিনা আগাছা আর ঝোপঝাড়ে ভরে উঠেছে। ক্লোভার থেকে বীজ ভালো হবে না, সেখানে বিচালির জন্য ক্লোভার কাটতে পাঠান তিনি, ওরা একের পর এক বীজের উপযোগী সেরা দেসিয়াতিনাগুলো কেটে সাফ করল আর কৈফিয়ত দিলে যে গোমস্তা তাই বলেছিল এবং এই বলে সান্ত্বনা দিলে যে বিচালি হবে চমৎকার; কিন্তু উনি জানতেন যে ব্যাপারটা ঘটেছে কারণ এই দেসিয়াতিনাগুলোয় ঘাস কাটা সহজ। বিচালি ঝাঁকাবার জন্য যন্ত্র পাঠালেন তিনি, প্রথম সারিতেই ভেঙে ফেলা হল সেটা, কারণ মাথার ওপরে আন্দোলিত পাখনার তলে বসে থাকতে কৃষকের বেজার লাগছিল। তাঁকে বলা হল, ‘ভাবনা করবেন না, মেয়েরা ঝটাঝট ঝাঁকিয়ে দেবে।’ লাঙ্গল অকেজো হয়ে পড়ল কেননা মুনিষটার খেয়ালই হল না যে উঠে আসা ফালটা নামিয়ে দেওয়া দরকার, তার বদলে জবরদস্তি করে হাল দিয়ে সে ঘোড়াকে কষ্ট দিলে, নষ্ট করলে জমি; আর তাঁকে বলা হল শান্ত থাকতে। ঘোড়া ছেড়ে দেওয়া হল গম খেতে, কেননা কোন মুনিষই রাত-পাহারার কাজে থাকতে চায়নি এবং বারণ করা সত্ত্বেও তারা রাত পাহারায় রইল পালা করে, আর সারা দিন খাটার পর ঘুমিয়ে পড়ল ভানকা এবং নিজের দোষের জন্য এই বলে অনুতাপ করলে, ‘সে আপনার যা মর্জি, মালিক।’ তিনটা সেরা বাছুর মারা পড়ল কারণ পানি না খাইয়ে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল দ্বিতীয় বার গজানো ক্লোভারের জমিতে; আর কিছুতেই বিশ্বাস করতে চাইল না যে ওরা ফেঁপে উঠেছে ক্লোভার খেয়ে আর সান্ত্বনা দিলে যে প্রতিবেশীর একশ’ বারোটা গরু মারা পড়েছে তিন দিনে। এ সব ঘটছিল এজন্য যে কেউ লেভিন বা তাঁর জোতজমির ক্ষতি চাইছিল; উল্টে বরং লেভিনের জানা ছিল যে ওরা তাঁকে ভালোবাসে, তাঁকে মনে করে সরল ভদ্রলোক (যার অর্থ সর্বোচ্চ প্রশংসা); এ সব ঘটত কারণ ওরা খাটতে চাইত আনন্দে-ফুর্তিতে, বিনা চিন্তা-ভাবনায় আর লেভিনের স্বার্থ ওদের কাছে শুধু পরকীয়া ও দূর্বোধ্যই নয়, তাদের নিজেদের স্বার্থের মারাত্মক বিরোধী। বহু দিন থেকেই লেভিন চাষ-আবাদের সাথে নিজের সম্পর্কে অসন্তোষ বোধ করে আসছিলেন। তিনি দেখতে পাচ্ছিলেন যে তাঁর নৌকায় পানি উঠছে, সম্ভবত ইচ্ছে করেই আত্মপ্রতারণায় ফুটোটা তিনি খোঁজেননি পাননি। কিন্তু এখন নিজেকে আর প্রতারণা করা চলে না। যে চাষ-আবাদ তিনি চালাচ্ছিলেন সেটা তাঁর কাছে শুধু আকর্ষণহীন নয়, বিরক্তিকর হয়ে উঠল, ও নিয়ে আর তিনি ব্যাপৃত থাকতে পারেন না।
