ভ্রন্স্কিও টের পাচ্ছিলেন গলায় কি যেন আটকে যাচ্ছে, চিমটি কাটছে নাকে, জীবনে কি তাঁর প্রথম তিনি অনুভব করলেন যে কেঁদে ফেলতে পারেন। ঠিক কি তাঁর কাছে এত মর্মস্পর্শী সেটা তিনি বলতে পারতেন না। করুণা হচ্ছিল আন্নার জন্য অথচ অনুভব করছিলেন যে তাঁকে সাহায্য করতে তিনি অক্ষম। আর সেই সাথে এটাও জানতেন যে, আন্নার দুঃখের জন্য তিনিই দায়ী, কিছু-একটা করেছেন তিনি।
‘বিবাহবিচ্ছেদ কি অসম্ভব?’ ক্ষীণকণ্ঠে তিনি বললেন। জবাব না দিয়ে মাথা নাড়লেন আন্না। ‘ছেলেকে নিয়ে ওকে ছেড়ে যাওয়া চলে না?’
‘চলে, কিন্তু সব নির্ভর করছে ওর ওপর। এবার আমার যেতে হবে ওর কাছে’, শুকনো গলায় আন্না বললেন। সব কিছু আগের মতই থেকে যাবে-তাঁর এই প্রাগ্বোধটা প্রবঞ্চিত করেনি তাঁকে।
‘মঙ্গলবার আমি পিটার্সবুর্গে থাকব, সব কিছু তখন স্থির করা যাবে।’ আন্না বললেন, ‘হ্যাঁ, কিন্তু ও-নিয়ে আর কোন কথা নয়।’
আন্নার যে গাড়িটা তিনি ফেরত পাঠিয়ে আবার ভ্রেদে’র ফটকের কাছে আসতে বলেছিলেন, এল সেটা। ভ্রন্স্কির কাছে বিদায় নিয়ে বাড়ি চলে গেলেন আন্না।
তেইশ
জুন মাসের ২ তারিখের কমিশনের সাধারণ বৈঠক বসল সোমবার। অধিবেশনকক্ষে ঢুকে বরাবরের মত সদস্যদের এবং সভাপতির সাথে সম্ভাষণ বিনিময় করলেন কারেনিন। নিজের আসন গ্রহণ করে সামনে তাঁর জন্য তৈরি করে রাখা কাগজপত্রগুলোর ওপর হাত রাখলেন। কাগজপত্রগুলোর মধ্যে তথ্যাদি এবং যে বিবৃতি তিনি দেবেন বলে স্থির করেছিলেন তার খসড়া সংক্ষিপ্তসারও ছিল। তবে তথ্যাদির প্রয়োজন ছিল না তাঁর। সব কিছু তাঁর মনে ছিল, আর যা বললেন, মনে মনে তা আওড়ে নেবারও দরকার বোধ করলেন না তিনি। তাঁর জানা ছিল যে সময় যখন আসবে, সামনে যখন দেখবেন প্রতিপক্ষের মুখ যে বৃথাই চেষ্টা করছে একটা নির্বিকার ভাব ফোটাতে এখন তৈরি হবার চেষ্টা করার চেয়ে ভালোভাবে তখন তাঁর বক্তৃতাটা আপনাআপনি নিঃসৃত হতে থাকবে। তিনি টের পাচ্ছিলেন যে তাঁর ভাষণের বিষয়বস্তু এতই বৃহৎ যে তার প্রতিটা শব্দই হবে তাৎপর্যপূর্ণ। অথচ সাধারণ একটা প্রতিবেদন তিনি শুনছিলেন অতি নিরীহ, গোবেচারা ভাব করে। শিরা ফুলে ওঠা তাঁর সাদা হাত, লম্বা লম্বা আঙুলে যা সামনে একখানা সাদা কাগজের দুই প্রান্ত সন্দেহে নাড়াচাড়া করছে, ক্লান্তির ভাব নিয়ে পাশে হেলানো মাথা—এসব দেখে কেউ ভাববে না যে, এখনই তাঁর মুখ থেকে এমন বক্তৃতা নির্গত হবে যা ভয়াবহ ঝড় তুলবে, পরস্পরকে বাধা দিয়ে চেঁচামেচি করতে বাধ্য করবে সভ্যদের, শৃঙ্খলা মেনে চলার দাবি করতে হবে সভাপতিকে। প্রতিবেদন শেষ হলে কারেনিন তাঁর শান্ত মিহি গলায় ঘোষণা করলেন যে অরুশ লোকদের সুব্যবস্থা নিয়ে তিনি নিজের কিছু বক্তব্য রাখতে চান। মনোযোগ আকৃষ্ট হল তাঁর দিকে। কেশে নিলেন কারেনিন, প্রতিপক্ষের দিকে দৃষ্টিপাত না করে বরাবর যা করে থাকেন, বক্তৃতা দেবার সময় তাঁর সামনে উপবিষ্ট প্রথম ব্যক্তিটিকে বেছে নিলেন, (এক্ষেত্রে লোকটা ক্ষুদ্রকায় শান্তশিষ্ট এক বৃদ্ধ, কমিশনে যিনি কদাচ কোন মত প্রকাশ করেননি) এবং শুরু করলেন তাঁর বক্তব্য। মৌল ও আঙ্গিক আইনের কথা যখন উঠল। প্রতিপক্ষ লাফিয়ে উঠে আপত্তি জানাতে লাগলেন। স্ত্রেমভ, ইনিও কমিশনের সদস্য, এক হাত নেওয়া হয়েছিল এঁকে, ইনি কৈফিয়ত দিতে শুরু করলেন এবং মোটের ওপর বৈঠকটা হল ঝড়-তোলা; কিন্তু জিতলেন কারেনিন। গৃহীত হল তাঁর প্রস্তাব; নিযুক্ত হল তিনটা নতুন কমিশন; পরের দিন পিটার্সবুর্গের নির্দিষ্ট একটা মহলে চলল শুধু এই বৈঠকেরই আলোচনা। কারেনিনের সাফল্য ছাড়িয়ে গিয়েছিল তাঁর নিজের আশাকেও।
পরের দিন মঙ্গলবার কারেনিন সন্তুষ্টির সাথে গতকালের বিজয়ের কথা স্মরণ করে না হেসে পারলেন না। যদিও কার্যালয়ের তত্ত্ববধায়ক যখন তাঁকে তোষামোদ করার জন্য জানালেন যে, কমিশনের ঘটনাবলীর খবর তাঁর কানেও গেছে তখন তিনি নির্বিকার ভাব দেখাতে চাইছিলেন।
তত্ত্বাবধায়কের সাথে ব্যস্ত থাকায় কারেনিন একেবারে ভুলে গিয়েছিলেন যে সেদিন মঙ্গলবার। আন্না আর্কাদিয়েভনার আসার তারিখ তিনি ধার্য করেছেন সেই দিন, তাই যখন লোক এসে খবর দিল যে তিনি এসেছেন তখন তিনি বিস্মিত, এমন কি অভিভূত হলেন বিশ্রী রকমে।
আন্না পিটার্সবুর্গে আসেন বেশ সকালে; তাঁর টেলিগ্রাম অনুসারে গাড়ি পাঠানো হয় তাঁ জন্য, তাই তাঁর আসার ব্যাপারটা কারেনিনের পক্ষে জানা অসম্ভব। কিন্তু আন্না যখন পৌঁছলেন, উনি দেখা করতে এলেন না। তাঁকে বলা হয় যে উনি এখনো বেরোননি তত্ত্বাবধায়কের সাথে কাজ করছেন। তাঁর আসার খবর স্বামীকে জানাতে বলে তিনি এলেন তাঁর কেবিনেটে, স্বামী তাঁর কাছে আসবে এই প্রতীক্ষায় নিজের জিনিসপত্র গোছগাছ করতে লাগলেন। কিন্তু এক ঘণ্টা কেটে গেল, উনি এলেন না। কিছু হুকুম-টুকুম দেবার অছিলায় তিনি গেলেন ডাইনিং-রুমে, ইচ্ছে করে কথা বলতে লাগলেন জোরে জোরে, আশা করছিলেন উনি ওখানে আসবেন; কিন্তু উনি বেরোলেন না। যদিও আন্না শুনতে পেয়েছিলেন যে, তত্ত্বাবধায়ককে বিদায় দেবার জন্য তিনি স্টাডির দরজা পর্যন্ত এসেছিলেন। আন্না জানতেন যে, বরাবরের মত শিগগিরই উনি কাজে চলে যাবেন। তার আগেই নিজেদের সম্পর্কটা স্থির করে নেবার জন্য ওঁর সাথে দেখা করতে চাইছিলেন তিনি।
