কিন্তু আন্না তাঁর কথা শুনছিলেন না, মুখভাব দেখে ধরতে চাইছিলেন তাঁর মনোভাব। তাঁর জানার কথা নয় যে ভ্রন্স্কির মুখভাব যার পরিচায়ক সেটা তাঁর মনে আসা প্রথম চিন্তাটা—এখন অনিবার্য ডুয়েলের কথাটা নিয়ে। ডুয়েলের কথা কখনো আন্নার মাথায়ই আসেনি তাই কঠোরতার এই ক্ষণিক মুখভাবকে তিনি নিলেন অন্যভাবে।
স্বামীর চিঠি পেয়ে আন্না অন্তরে অন্তরে বুঝেছিলেন যে—সবই থাকবে আগের মতই, নিজের প্রতিষ্ঠা তুচ্ছ করে, ছেলেকে ফেলে দিয়ে প্রণয়াস্পদের সাথে মিলনের ক্ষমতা তাঁর নেই। প্রিন্সেস ভেস্কায়ার ওখানে যে সকালটা কাটিয়েছেন তাতে তিনি আরো নিঃসন্দেহ হন এ বিষয়ে। তাহালেও ভ্রন্স্কির সাথে এই সাক্ষাৎটা ছিল তাঁর কাছে অসাধারণ গুরুত্বপূর্ণ। তিনি আশা করেছিলেন যে এতে তাঁর অবস্থা বদলে যাবে, বেঁচে যাবেন তিনি। খবরটা শুনে ভ্রন্স্কি যদি দৃঢ়ভাবে, সবেগে, এক মুহূর্ত দ্বিধা না করে তাঁকে বলতেন, ‘সব ফেলে রেখে এসো আমার সাথে!’ তাহলে তিনি ছেলেকে রেখে তাঁর সাথেই চলে যেতেন। কিন্তু তিনি যা আশা করেছিলেন, সংবাদটায় তেমন প্রতিক্রিয়া হল না ভ্রন্স্কির : তিনি শুধু কিসে যেন অপমানিত বোধ করলেন।
‘আমার এতটুকু কষ্ট হয়নি। এটা ঘটে গেছে আপনা থেকেই’, আন্না বললেন উত্যক্ত স্বরে, ‘আর এই যে…’, দস্তানা থেকে স্বামীর চিঠিটা বের করলেন তিনি।
‘আমি বুঝতে পারছি, বুঝতে পারছি’, চিঠিটা নিয়ে আন্নাকে বাধা দিলেন ভ্রন্স্কি, তবে চিঠিটা পড়লেন না, চেষ্টা করলেন তাঁকে সান্ত্বনা দিতে, ‘আমার শুধু একটা কামনা একটা মিনতি—এই অবস্থাটা চুরমার করে দাও, তোমার সুখের জন্যে যাতে আমার জীবন নিবেদন করতে পারি।’
‘ও কথা কেন বলছ আমাকে?’ আন্না বললেন, ‘ওতে কি আমি সন্দেহ করতে পারি? সন্দেহ যদি করতাম…’
‘কে আসছে?’ যে দুজন মহিলা তাঁদের দিকে আসছিলেন, তাঁদের দেখিয়ে হঠাৎ বলে উঠলেন অন্স্কি, ‘হয়ত আমাদের চিনতে পারবে’, এবং তাড়াতাড়ি করে আন্নাকে সাথে নিয়ে তিনি চলে গেলেন পার্শ্ববর্তী পথটায়।
‘আমার বয়ে গেল!’ আন্না বললেন। ঠোঁট তাঁর কাঁপছিল। ভ্রন্স্কির মনে গল ঝলরের তল থেকে চোখ দুটো তাঁর দিকে তাকিয়ে আছে অদ্ভুত একটা বিরাগে। ‘তাই যা বলছিলাম, ব্যাপারটা ও নিয়ে নয়। ওতে আমার সন্দেহ হতে পারে না; দ্যাখো আমাকে ও কি লিখেছে, পড়’, আবার থেমে গেলেন আন্না।
স্বামীর সাথে ছাড়াছাড়ির খবর শুনে প্রথম মুহূর্তে যা হয়েছিল, অপমানিত স্বামীর সাথে তাঁর সম্পর্কের ব্যাপারে যে স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া ঘটেছিল, চিঠি পড়ার পর ভ্রন্স্কি অজান্তে আবার তাতে আত্মসমর্পণ করলেন। এখন ওঁর চিঠিহাতে ভ্রন্স্কি অজ্ঞাতসারে কল্পনা করতে লাগলেন আজই অথবা কাল নিশ্চিতই যে চ্যালেঞ্জ আসবে তাঁর এবং খোদ ডুয়েলটার কথা। এখন তাঁর যে নিরুত্তাপ অহংকৃত মুখভাব। সেই ভাব নিয়ে তিনি সে ডুয়েলে শূন্যে গুলি ছুঁড়ে অপমানিত স্বামীর গুলির মুখে দাঁড়াবেন। আর তখনই মাথায় ঝলক দিয়ে গেল একটা চিন্তা যা কিছু আগে সেপুখোভস্কয় বলছিলেন এবং নিজেই তিনি সকালে যা চিন্তার কথাটা তিনি আন্নাকে বলতে অক্ষম।
চিঠি পড়ে তিনি চোখ তুললেন আন্নার দিকে, দৃষ্টিতে তাঁর কোন দৃঢ়তা ছিল না। আন্না তখনই বুঝলেন যে,এ ব্যাপারটা তিনি ভেবে রেখেছিলেন আগেই। আন্না জানতেন যে, ভ্রন্স্কি যাই বলুন, তিনি কি ভাবছেন তা পুরো বলবেন না। বুঝলেন যে তাঁর শেষ আশাটা গেল। তিনি যার অপেক্ষায় ছিলেন এটা তা নয়।
‘দেখছ তো কেমন লোক’, কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন আন্না, ‘উনি…’
‘মাপ কর, কিন্তু এতে আমি খুশি’, আন্নাকে বাধা দিলেন ভ্রন্স্কি, ‘সৃষ্টিকর্তার দোহাই, আমার কথাটা শেষ করতে দাও’, নিজের বক্তব্যটা বুঝিয়ে বলার জন্য সময় চেয়ে মিনতি করলেন দৃষ্টি দিয়ে, ‘আমি খুশি কারণ উনি যা প্রস্তাব করছেন। ব্যাপারটা সেভাবে থেকে যেতে পারে না।’
‘কেন পারে না?’ অশ্রু বোধ করে আন্না বললেন, ভ্রন্স্কি যা বললেন, স্পষ্টতই তাতে তিনি আর কোন গুরুত্ব দিচ্ছিলেন না। তিনি টের পাচ্ছিলেন যে নির্ধারিত হয়ে গেছে তাঁর ভাগ্য।
ভ্রন্স্কি বলতে চেয়েছিলেন যে তাঁর মতে, যে ডুয়েল অনিবার্য, তারপর এটা চলতে পারে না, কিন্তু বললেন অন্য কথা।
‘এটা চলতে থাকবে, এ হতে পারে না। আমি আশা করি এবার তুমি ছেড়ে দেবে ওকে। আমি আশা করি’, একটু থতমত খেয়ে লাল হয়ে উঠলেন ভ্রন্স্কি, ‘আশা করি যে আমাদের জীবন গড়ে তুলতে এবং ভেবে কিছু-একটা ঠিক করতে তুমি আমাকে দেবে। কাল…’ উনি কিছু-একটা বলতে যাচ্ছিলেন।
‘কিন্তু আন্না তাঁকে শেষ করতে দিলেন না।’
‘কিন্তু ছেলে?’ চেঁচিয়ে উঠলেন তিনি, ‘দেখেছ তো কি লিখেছে। ওকে ছেড়ে দেওয়াই উচিত কিন্তু সে ক্ষমতা আমার নেই, চাই-ও না।’
‘সৃষ্টিকর্তার দোহাই, কোনটা ভালো? ছেলেকে ছেড়ে আসা, নাকি এই অপমানকর অবস্থাটা চালিয়ে যাওয়া?’
‘কার সাথে অপমানকর
‘সবার পক্ষে, সবচেয়ে বেশি করে তোমার পক্ষে
‘বলছ অপমানকর…এ কথা বলো না আমার কাছে কথাটার কোন অর্থ নেই।’ কাঁপা কাঁপা গলায় আন্না বললেন। এখন তিনি আর চাইছিলেন না যে ভ্রনস্কি অসত্য কিছু বলুক। এখন তাঁর অবশিষ্ট আছে কেবল তাঁর প্রেম, ভ্রন্স্কিকে ভালোবাসতে চাইছিলেন তিনি, ‘তুমি বুঝে দ্যাখো, যেদিন তোমাকে ভালোবেসেছি, সেদিন থেকে সব কিছু বদলে গেছে আমার। আমার আছে শুধু একটা জিনিস, শুধু একটা-সেটা তোমার ভালোবাসা। সে ভালোবাসা যদি আমি তাহলে নিজেকে এই উঁচু, এত দৃঢ় বলে অনুভব করব যে আমার পক্ষে কিছুই অপমানকর হতে পারে না। নিজের অবস্থায় আমি গর্বিত…গর্বিত কারণ…গর্বিত…’ কেন গর্বিত সে কথাটা তিনি শেষ করতে পারলেন না। লজ্জা আর হতাশার অশ্রুতে রুদ্ধ হয়ে গেল তাঁর কণ্ঠ। থেমে গিয়ে ফুঁপিয়ে উঠলেন তিনি।
