‘তাহলে বিদায়। কর্মের স্বাধীনতা দিবি তো?’
‘পরে কথা হবে। তোকে পিটার্সবুর্গে ধরব।’
বাইশ
পাঁচটা বেজে গেছে তখন, তাই সময়মত পৌঁছানো আর সেই সাথে নিজের যে ঘোড়াগুলোকে সবাই চেনে তাতে করে না যাবার জন্য ভ্রন্স্কি ইয়াভিনের ভাড়া করা গাড়িটায় উঠে তাড়াতাড়ি চালাবার হুকুম দিলেন। চার আসনের পুরানো ছ্যাকরা গাড়িটা বেশ প্রশস্ত। এক কোণে বসে উনি পা তুলে দিলেন সামনের সিটে, ডুবে গেলেন চিন্তায়।
নিজের ব্যাপারগুলোকে তিনি যে স্পষ্টতায় নিয়ে এসেছেন তার ঘোলাটে চেতনা, সেপুখোভস্কয় যে তাঁর প্রয়োজনীয় লোক বলে মনে করেন, তাঁর এই প্রশংসা আর বন্ধুত্ব, প্রধান কথা সাক্ষাৎকারের আশা, সব মিলে গেল জীবনের একটা সাধারণ সানন্দ অনুভূতিতে। সে অনুভূতি এতই প্রবল যে, অজান্তে হাসি ফুটল তাঁর মুখে। পা নামিয়ে তিনি এক হাঁটুর ওপর অন্য পা-টা তুলে দিলেন এবং আগের দিন পড়ে যাবার সময় চোট খাওয়া পায়ের স্থিতিস্থাপক ডিমটা হাতড়ে দেখলেন এবং পেছনে হেলান দিয়ে বুক ভরে নিঃশ্বাস নিলেন কয়েকবার।
‘বেশ ভালো, দিব্যি ভালো!’ মনে মনে বললেন তিনি। আগেও তিনি প্রায়ই নিজের দেহের একটা পুলকিত চেতনা অনুভব করেছেন। কিন্তু এখন নিজেকে, নিজের দেহকে তিনি এতটা ভালোবাসেননি কখনো। বলিষ্ঠ পায়ে মৃদু এই ব্যথাটা অনুভব করতে তাঁর ভালো লাগিছল, ভালো লাগিছল শ্বাস-প্রশ্বাসে বক্ষপেশীর নাড়াচাড়া অনুভন করতে। আগস্টের যে পরিষ্কার দিনটা অমন হতাশ করেছিল আন্নাকে, সেটাই তাঁর কাছে মনে হচ্ছিল সঞ্জীবনীর মত উত্তেজক, প্রক্ষালনে, চিনচিন করা মুখ আর ঘাড়কে তা তাজা করে তুলছিল। মোট থেকে ব্রিলিয়ান্টিনের গন্ধটা এই তাজা হাওয়ায় বিশেষ মনোরম ঠেকছিল তাঁর কাছে। জানালা দিয়ে তিনি যা দেখতে পাচ্ছিলেন, ঠাণ্ডা নির্মল তাঁর কাছে। জানালা দিয়ে তিনি যা দেখতে পাচ্ছিলেন, ঠাণ্ডা নির্মল এই বাতাসে, সূর্যোস্তের দিকে আলোয় সব কিছুই তাঁর নিজের মতই তবতাজা, প্রফুল্ল, বলিষ্ঠ : ঢলে পড়া সূর্যের কিরণে বাড়ির ঝকঝকে চাল, বেড়া আর বাড়ি কোণগুলোর তীক্ষ্ণ রেখা, মাঝে-মধ্যে চোখে পড়া পথচারী বা গাড়ির মূর্তি, গাছ আর ঘাসের অচঞ্চল শ্যামলিমা, সঠিক ফারের সারিতে চিত্রিত আলুর খেত, ঘর-বাড়ি, গাছপালা আর খোদ আলু খেতটারই তির্যক ছায়া—সব কিছুই। বার্নিশ করা সদ্য সমাপ্ত ভালো একটা ছবির মত সবই সুন্দর।
‘চালাও, চালাও!’ পকেট থেকে তিন রুবলের একটা নোট নিয়ে জানালা দিয়ে মুখ বের করে তিনি বললেন কোচোয়ানকে। সে পেছনে মুখ ফেরাতে ভ্রন্স্কি নোটটা দিলেন তাকে। লণ্ঠনের আলোয় কোচোয়ানের হাত কি যেন খুঁজছিল, শোনা গেল চাবুকের শিস, গাড়ি সমতল সড়ক দিয়ে দ্রুত ছুটল।
দুই জানালার মাঝখানে হাড়ের ঘণ্টি-হাতলের দিকে তাকিয়ে এবং শেষবার আন্নাকে যা দেখেছিলেন সেই মূর্তিতে তাঁকে কল্পনা করে তিনি ভাবলেন, ‘এই সুখটুকু ছাড়া আর কিছুই, কিছুই আমি চাই না। যত দিন যাচ্ছে ততই বেশি করে ভালোবাসছি ওকে। আরে, এই তো ভ্রেদে’র সরকারী পল্লীভবনের বাগান। কোথায় সে এখানে? কোথায়? কেমন করে? কেন সে এখানে দেখা করতে চেয়েছে আর লিখেছে বেত্সির চিঠিটায়? ভাবলেন মাত্র যেতেই তিনি কোচোয়ানকে থামালেন এবং দরজা খুলে চলন্ত গাড়ি থেকে লাফিয়ে নেমে চললেন তরুবীথি এবং দরজা খুলে বাড়ি পর্যন্ত। বীথিতে কেউ ছিল না; কিন্তু ডান দিকে তাকাতেই তিনি দেখতে পেলেন আন্নাকে। মুখ তাঁর ঝালরে ঢাকা, কিন্তু উৎফুল্ল দৃষ্টিতে তিনি ধরতে পারলেন আন্নার চলন, যেটা একান্ত তাঁরই নিজস্ব, কাঁধের ডৌল, মাথার ভঙ্গি আর অমনি যেন একটা বৈদ্যুতিক তরঙ্গ খেলে গেল তাঁর দেহে। নবশক্তিতে তিনি টের পেলেন নিজেকে, পায়ের স্থিতিস্থাপক গতি থেকে শ্বাস-প্রশ্বাসে ফুসফুসের সঞ্চালন পর্যন্ত, তাঁর ঠোঁটে কি যেন সুড়সুড়ি দিয়ে উঠল
আন্না কাছে এসে সজোরে তাঁর করদন করলেন।
‘তোমাকে ডেকে পাঠিয়েছি বলে রাগ করোনি তো? তোমার সাথে দেখা করা আমার বড় দরকার’, আন্না বললেন; আর ঝালরের তল থেকে ভ্রন্স্কি তাঁর ঠোঁটের যে গম্ভীর ভাঁজ দেখলেন তাতে তৎক্ষণাৎ তাঁর হৃদয়াবেগ বদলে গেল।
‘আমি রাগ করব! কিন্তু তুমি এখানে এলে কেমন করে?’
‘ওতে কিছু এসে যায় না’, নিজের বাহু ওঁর বাহুতে রেখে আন্না বললেন, ‘চল যাই, তোমার সাথে কথা আছে।’ ভ্রন্স্কি বুঝলেন কিছু-একটা ঘটেছে, এ মিলনটা আনন্দের হবে না। আন্নার উপস্থিতিতে নিজের ইচ্ছাশক্তি থাকত না ভ্রন্স্কির : তাঁর উদ্বেগের কারণ না জানলেও ভ্রন্স্কি টের পাচ্ছিলেন যে অজান্তে সে উদ্বেগ সঞ্চারিত হয়েছে তাঁর মধ্যেও।
কনুই দিয়ে আন্নার বাহু চেপে মুখ দেখে তাঁর মনোভাবনা বোঝার চেষ্টা করতে করতে ভ্রন্স্কি বললেন, ‘কি ব্যাপার? কি হয়েছে?’
মন বাঁধার জন্য আন্না নীরবে হেঁটে গেলেন কয়েক পা, তারপর হঠাৎ থেমে গেলেন।
‘কাল তোমাকে বলিনি’, ঘনঘন হাঁপাতে হাঁপাতে আন্না বললেন, ‘কারেনিনের সাথে বাড়ি ফেরার সময় আমি তাঁকে সব কিছু জানিয়েছি…বলেছি যে আমি তাঁর স্ত্রী থাকতে পারি না, বলেছি যে…সবই বলেছি।’
ভ্রন্স্কি তাঁর কথা শুনছিলেন অজ্ঞাতসারে সারা দেহ নুইয়ে, যেন এতে করে তাঁর অবস্থার দুঃসহতা তিনি নরম করে আনতে চাইছিলেন। কিন্তু আন্না এ কথা বলামাত্র তিনি খাড়া হয়ে উঠলেন, গর্বিত কঠোর একটা ভাব ফুটে উঠল মুখে। বললেন, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, এই ভালো হাজার গুণ ভালো! তোমার পক্ষে এটা কত কষ্টকর হয়েছিল তা আমি বুঝতে পারছি।’
