খাটো জ্যাকেট আর সরু প্যান্টলুন পরা কিটির চাচাতো ভাই নিকোলাই শ্যেরবাৎস্কি স্কেট পরা পায়ে বসে ছিলেন বেঞ্চিতে, লেভিনকে দেখে চেঁচিয়ে উঠলেন : ‘আরে পয়লা নম্বরের রুশ স্কেটার যে! কতদিন এসেছেন? চমৎকার বরফ, নিন, কেট পরে নিন।
‘স্কেট আমার নেই’, বললেন লেভিন। কিটির উপস্থিতিতে তার এই অসংকোচ অকুণ্ঠতায় অবাক লাগল লেভিনের। কিটির দিকে না তাকালেও তাকে দৃষ্টিপথচ্যুত করতে এক সেকেন্ডও তিনি অপব্যয় করছিলেন না। তিনি টের পাচ্ছিলেন যে সূর্য কাছিয়ে এসেছে। কিটি ছিল কোণে, উঁচু বুট পরা সরু পায়ে ভর দিয়ে স্পষ্টতই একটু ভয়ে ভয়ে সে এগিয়ে এল তাঁর দিকে। জোরে হাত দুলিয়ে রুশী কোর্তা পরা একটা ছেলে প্রায় মাটি পর্যন্ত নুয়ে ছাড়িয়ে গেল তাকে। কিটি কেট করছিল খুব নিশ্চিত ভঙ্গিতে নয়; রশিতে ঝোলানো হোট মাফ থেকে হাত বার করে সে তৈরি হয়ে রইল, তারপর লেভিনের দিকে তাকিয়ে তাকে চিনতে পেরে হাসল তার উদ্দেশে আর হেসে ওড়াল নিজের ভয়ও। বাঁক নেওয়াটা শেষ হলে সে তার স্থিতিস্থাপক পায়ে ঠেলা দিয়ে ফেট করে এল সোজা শ্যেরবাৎস্কির কাছে। আর তার হাত আঁকড়ে ধরে হেসে মাথা নোয়ালে লেভিনের দিকে। লেভিন যা কল্পনা করেছিলেন, তার চেয়েও সে অপরূপা।
তার কথা লেভিন যখন ভাবতেন, তখন সব কিছু জীবন্ত হয়ে কিটি ভেসে উঠত তার কল্পনায়, বিশেষ করে এই মাধুরী, শিশুর স্বচ্ছ শুভময়তার ব্যঞ্জনা, সুকুমার কুমারী কাঁধের ওপর ফরসা চুলের অনায়াস মাথাটি। তার মুখের শিশুসুলভ অভিব্যক্তি দেহের সূক্ষ্ম সৌন্দর্যের সাথে মিলে গড়ে তুলেছিল তার বিশেষ একটা লাবণ্য, যেটা তার বেশ মনে আছে? কিন্তু তার ভেতর অপ্রত্যাশিত যে জিনিসটা তাকে সব সময়ই বিস্মিত করেছে সেটা তার নম্র, শান্ত, সত্যনিষ্ঠ চোখের দৃষ্টি, বিশেষ করে তার হাসি, লেভিনকে তা সব সময়ই নিয়ে যেত ইন্দ্রজালের জগতে, সেখানে তিনি নিজেকে অনুভব করতেন কোমল, মরমী, যেমনটি তিনি স্মরণ করতে পারেন তার একান্ত শৈশবের বিরল কয়েকটি দিনের ক্ষেত্রে।
‘অনেকদিন এসেছেন? হাত বাড়িয়ে দিয়ে কিটি বলল। আর লেভিন তার মাফ থেকে খসে পড়া রুমাল কুড়িয়ে দিলে যোগ করল, ধন্যবাদ।
‘আমি? আমি এসেছি সম্প্রতি, গতকাল… মানে আজকেই এসেছি’, উত্তেজনাবশে চট করে তার প্রশ্নটা ধরতে না পেরে জবাব দিলেন লেভিন। ভাবছিলাম আপনাদের ওখানে যাব’, বললেন লেভিন এবং তখনই কি সংকল্প নিয়ে তিনি ওকে খুঁজছিলেন সেটা মনে পড়ায় থতমত খেয়ে লাল হয়ে উঠলেন, ‘আমি জানতাম না যে, আপনি স্কেট করেন। এবং সুন্দর করেন।
কিটি মন দিয়ে তাকিয়ে দেখল তার দিকে, যেন অস্বস্তির কারণটা বুঝতে চায়।
‘আপনার প্রশংসার কদর করতে হবে বৈকি। এখানে লোকমুখে এখনো চলে আসছে যে, আপনি সেরা স্কেটার, কালো দস্তানা পরা হোট হাত দিয়ে মাফের ওপর জমা হিমের কাঁটাগুলোকে ঝেড়ে ফেলতে ফেলতে বলল কিটি।
হ্যাঁ, এক সময় আমি ফেট করতাম পাগল হয়ে; ইচ্ছে হত সুসম্পূর্ণতায় পৌঁছাই।’
মনে হয় আপনি সব কিছুই করেন পাগল হয়ে’, একটু হেসে সে বলল, আমার ভারি ইচে হচ্ছে আপনি কি রকম ক্ষেট করেন দেখব। কেট পরে নিন, চলুন আমরা একসাথে কেটিং করব।’
‘এক সাথে স্কেটিং! সে কি সম্ভব?’ লেভিন ভাবলেন কিটির দিকে তাকিয়ে। বললেন : ‘এখনই পরে আসছি।
স্কেটিঙের জুতা পরতে চলে গেলেন তিনি।
‘অনেকদিন আমাদের এখানে আসেননি’, পা ধরে হিলে স্কু পেঁচাতে পেঁচাতে বলল স্কেটিং পরিচারক, আপনার পর ওদের মধ্যে ওস্তাদ আর কেউ নেই। এটা চলবে’ বেল্ট টানতে টানতে সে বলল।
‘চলবে, চলবে, তাড়াতাড়ি কর, সুখের যে হাসিটা আপনা থেকে তার মুখে এসে গিয়েছিল সেটাকে বহু কষ্টে সংযত করে তিনি বললেন। ভাবলেন, হ্যাঁ, এই হল জীবন, এই হল সুখ। ও বলল এক সাথে, আসুন এক সাথে স্কেট করি। এবার ওকে বলব? কিন্তু আমি যে এখন সুখী, অন্তত সুখ পাচ্ছি আশা থেকে, সেই জন্যই যে বলতে ভয় হচ্ছে..আর যদি বলি?…কিন্তু বলা যে দরকার, দরকার! দূর হোক ছাই এই দুর্বলতা!
লেভিন উঠে দাঁড়ালেন, তারপর কুটিরের সামনের খড়খড়ে বরফের ওপর দিয়ে ছুটে গেলেন মসৃণ বরফে, তারপর অনায়াসে, যেন তার ইচ্ছাশক্তিতেই গতিবেগ বাড়িয়ে পথ সংক্ষিপ্ত করে ছুটলেন। কিটির কাছে তিনি এলেন সসংকোচে, কিন্তু আবার তার হাসি আশ্বস্ত করল তাঁকে।
কিটি তার দিকে হাত বাড়িয়ে দিলে, গতিবেগ বাড়তে থাকল আর যতই তা হল দ্রুত, ততই সজোরে কিটি হাত চেপে ধরল তার।
‘আপনার কাছে হলে আমি তাড়াতাড়ি শিখে ফেলতে পারতাম, কেননা আপনার ওপর বিশ্বাস আছে আমার।’
আর আপনি যখন আমার ওপর ভর দেন তখন আমিও বিশ্বাস রাখি নিজের ওপর, আর যা বলে ফেলেছেন তাতে তখনই ঘাবড়ে গিয়ে লাল হয়ে উঠলেন তিনি। এবং সত্যিই, এ কথাগুলো বলা মাত্র সূর্য যেন মেঘে ঢাকা পড়ল, মুছে গেল মুখের মৃদুলতা, লেভিন লক্ষ্য করলেন মুখের সেই ভাব পরিবর্তন যাতে বোঝায় চিন্তায় নিমগ্নতা ও তার মসৃণ কপালে দেখা দিয়েছে কুঞ্চন।
তাড়াতাড়ি করে তিনি বললেন, আপনার অপ্রীতিকর কিছু ঘটেনি তো? অবশ্য এ কথা জিজ্ঞেস করার অধিকার আমার নেই।’
‘কি কারণে?…না, অপ্রীতিকর কিছু আমার ঘটেনি’, নিরুত্তাপ গলায় জবাব দিল সে, তারপর সাথে সাথেই যোগ করল, মাদমোয়াজেল লিনোর সাথে দেখা হয়েছে আপনার?
