‘কেন?’ ক্ষমতাধর কয়েকজন লোকের নাম করলেন ভ্রন্স্কি, ‘কেন, এরা কি স্বাধীন লোক নয়?’
‘শুধু এজন্যে যে, জন্মগত সম্পত্তির স্বাধীনতা তাদের ছিল না, কর্তৃত্ব ছিল না, সূর্যের যে নৈকট্যে আমরা জন্মেছি—সেটা ছিল না। ওদের কিনে নেওয়া হয় টাকায়, নয় নেকনজরে। টিকে থাকার জন্যে ওদের কোন-একটা নবধারা ভেবে বের করা দরকার। যে আইডিয়া, ধারা তারা চালু করে তাতে তাদের নিজেদেরই বিশ্বাস নেই, তাতে অনিশ্চেষ্টই হয়; এসব ধারা হল শুধু সরকারী বাংলা আর অতটা বেতন পাবার উপায়। এসবে তেমন চতুরতার কিছু নেই, যখন দেখা যায় তাদের হাতের তাস। হয়ত আমি ওদের চেয়ে খারাপ, নির্বোধ, যদিও ওদের চেয়ে কোন আমার খারাপ হওয়ার কথা সেটা আমার চোখে পড়ছে না। কিন্তু কঠিন। আর সে রকম লোকের প্রয়োজনীয়তা আজ যত বেশি তা আগে কখনো দেখা যায় না।’
ভ্রন্স্কি শুনছিলেন মন দিয়ে। তিনি আকৃষ্ট হচ্ছিলেন কথাগুলোর বিষয়বস্তু ততটা নয়, যতটা রাষ্ট্রীয় ব্যাপার সম্পর্কে সেপুখোভস্কয়-এর মনোভাবে যিনি ক্ষমতাধরদের সাথে লড়ার কথা ভাবছেন, এ ব্যাপারে যাঁর নির্দিষ্ট অনুরাগ ও বিরাগ বর্তমান, যেক্ষেত্রে কাজে ভ্রন্স্কির আগ্রহ কেবল তাঁর ফ্লোয়াড্রনে সীমাবদ্ধ। যে মহলে ওঁর চলাফেরা সেখানে বুদ্ধি দিয়ে, বাক্যে শক্তি নিয়ে ব্যাপারটা ভেবে দেখা ও বোঝার যে সামর্থ্য অত বিরল, তাতে সেপুখোভস্কয় কত শক্তিশালী তাও টের পেলেন ভ্রন্স্কি। তাঁর পক্ষে লজ্জাকর হলেও ঈর্ষা হচ্ছিল তাঁর। বললেন, ‘তাহলেও এর জন্যে একটা প্রধান জিনিসের অভাব আছে আমার—ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা। সেটা ছিল, কিন্তু চলে গেছে।’
‘মাপ করিস, কথাটা সত্যি নয়’, হেসে বললেন সেপুখোভস্কয়।
‘না, সত্যি!…সত্যি বর্তমানে’, অকপট হবার জন্য যোগ দিলেন ভ্রন্স্কি।
‘হ্যাঁ, বর্তমানে সত্যি। সেটা অন্য ব্যাপার। কিন্তু এই বর্তমানটা তো আর চিরকাল নয়।’
‘হতে পারে’, জবাব দিলেন ভ্রন্স্কি।
‘তুই বলছিস—হতে পারে’, যেন তাঁর চিন্তাধারা অনুমান করে বলে চললেন সেপুখোভস্কয়, ‘আর আমি তোকে বলছি, নিশ্চয়ই হবে। এর জন্যেই তোর সাথে দেখা করতে চাইলাম। যা করা উচিত ছিল সেটা করেছিস তুই। এটা আমি বুঝি, কিন্তু বড় বেশি মেতে উঠিস না। আমি শুধু তোর কাছে কর্মের স্বাধীনতার অনুরোধ জানাবো। আমি তোর পৃষ্ঠপোষকতা করব না…যদিও করব না-ই বা কেন? কতবারই তো তুই পৃষ্ঠপোষকতা করেছিস আমার! আশা করি, আমাদের বন্ধুত্ব এর ঊর্ধ্বে। হ্যাঁ’, হেসে উনি বললেন নারীর মত কোমলতায়, ‘আমাকে কর্মের স্বাধীনতা দে, চলে যা রেজিমেন্ট থেকে। আমি তোকে টেনে তুলব অলক্ষ্যে।’
‘কিন্তু তুই কেন বুঝছিস না যে, আমার কিছুরই দরকার নেই’, ভ্রন্স্কি বললেন, ‘শুধু সব কিছু যেমন ছিল তেমনি থাক।’ সেপুখোভস্কয় উঠে ভ্রন্স্কির সামনে দাঁড়ালেন। ‘তুই বললি, সব কিছু যেমন ছিল তেমনি থাক। আমি বুঝি, কি তার অর্থ। কিন্তু শোন’—সেপুখোভস্কয়-এর হাসি আর ভঙ্গি যেন বলছিল যে, ভ্রন্স্কির ভয় পাবার কিছু নেই। ক্ষতস্থানটা তিনি স্পর্শ করছেন আলগোছে, সন্তপর্ণে, ‘তবে আমি বিবাহিত, আর আমাকে বিশ্বাস কর, নিজের হাজারো নারীকে জানলে যতটা পারতিস তার চেয়েও ভালো করে জানবি সমস্ত নারীকে।’
‘এখনই আসছি!’ যে অফিসারটি ঘরে উঁকি দিয়ে ওঁদের ডাকতে এসেছিল রেজিমেন্ট কমান্ডারের কাছে তার উদ্দেশে চেঁচিয়ে বললেন ভ্রন্স্কি।
ভ্রন্স্কির এখন ইচ্ছে হচ্ছিল ওঁর কথা সবটা শুনে জেনে নেবেন কি উনি বলতে চান।
‘শোন, আমার মত। মানুষের ক্রিয়াকলাপে প্রধান হোঁচট হল নারী। নারীকে ভালোবাসলে আর কিছু করা কঠিন। আরাম করে নির্বিঘ্নে ভালোবাসার একটা পন্থা আছে—সেটা বিয়ে। কি আমি ভাবছি সেটা কি করে যে তোকে বোঝাই’, উপমার ভক্ত সেপুখোভস্কয় বললেন, ‘দাঁড়া, দাঁড়া! বোঝা বইতে বইতে হাত দিয়ে কিছু করা সম্ভব শুধু সেই ক্ষেত্রে যখন বোঝাটা বাঁধা থাকে পিঠে—আর সেটা হল বিয়ে। বিয়ে করে—এটা আমি টের পেয়েছি। হঠাৎ হাত আমার খোলা পেলাম। কিন্তু বিয়ে না করে যদি এই বোঝাটা বইতে থাকিস, তাহলে হাত এমনই জোড়া থাকবে যে কিছু করতে পারবি না। মাজানকোভ, ক্রুপভকে দ্যাখ। নারীর জন্য তারা নষ্ট করল নিজেদের ভবিষ্যৎ।’
‘আহা, কি আবার নারী!’ উল্লিখিত ব্যক্তিদ্বয়ের সাথে যে ফরাসিনী আর অভিনেত্রীটির সম্পর্ক ছিল তাদের কথা স্মরণ করে বললেন অনস্কি।
‘সমাজে নারী সম্পর্কে যত পাকা, ব্যাপারটা দাঁড়ায় ততই খারাপ। সেটা হয় হাত দিয়ে আর বোঝা বওয়া নয়, অন্যের কাছ থেকে তা ছিনিয়ে নেবার মত।’
‘তুই কখনো ভালোবাসিসনি’, সামনের দিকে তাকিয়ে আন্নার কথা ভাবতে ভাবতে মৃদুস্বরে বললেন ভ্রন্স্কি
‘হতে পারে। কিন্তু আমি তোকে যা বললাম, সেটা মনে রাখিস। আরো একটা কথা : মেয়েরা সবাই পুরুষদের চেয়ে বেশি সাংসারিক। আমরা ভালোবাসা নিয়ে বড় একটা কিছু খাড়া করি আর ওরা সব সময়ই নিত্যনৈমিত্তিক।’
‘এখনই, এখনই আসছি!’ ঘরে যে চাপরাশি ঢুকেছিল তাকে তিনি বললেন। কিন্তু চাপরাশি ওঁদের আবার ডাকতে আসেনি—যা তিনি ভেবেছিলেন। সে এসেছিল ভ্রনস্কির জন্য একটা চিঠি নিয়ে।
‘প্রিন্সেস ভেস্কায়ার কাছ থেকে একটা লোক এটা নিয়ে এসেছে।’ চিঠি খুলে লাল হয়ে উঠলেন ভ্রন্স্কি। সেপুখোভস্কয়কে তিনি বললেন, ‘আমার মাথা ধরে উঠেছে, বাড়ি যাব।’
