সেপুখোভস্কয় কোয়ার্টার-মাস্টারের সিক্ত তাজা ঠোঁটে চুম্বন করে রুমালে মুখে মুছে এলেন ভ্রন্স্কির কাছে। করদমন করে তাঁকে পাশে সরিয়ে এনে বললেন, ‘কি যে আনন্দ হচ্ছে!’
ভ্রন্স্কিকে দেখিয়ে রেজিমেন্ট কমান্ডার চেঁচিয়ে বললেন ইয়াভিনকে, ওঁর দেখাশোনা করুন!’ নিজে নেমে গেলেন সৈনিকদের কাছে।
‘কাল ঘোড়দৌড়ে এলি না যে? ভেবেছিলাম সেখানে তোর দেখা পাব’, সেপুখোভস্কয়-এর দিকে তাকিয়ে ভ্রন্স্কি বললেন।
‘এসেছিলাম, তবে পরে। ঘাট মানছি’, এই বলে উনি ফিরলেন অ্যাডজুট্যান্টের দিকে, ‘মাথা-পিছু যা দাঁড়া, অনুগ্রহ করে আমার হয়ে তা সবার মধ্যে বিলি করতে বলুন কাউকে।’
তাড়াতাড়ি করে মানিব্যাগ থেকে একশ’ রুলের তিনটা নোট বের করে তিনি লাল হয়ে উঠলেন
‘ভ্রন্স্কি কিছু খাবি নাকি পান করবি?’ ইয়াভিন জিজ্ঞেস করলেন। ‘এই, কাউন্টকে খাবার দাও! আর ধর, এটা পান কর।’
রেজিমেন্ট কমান্ডারের ওখানে ফুর্তি চলল অনেক সময়।
মদ্যপান হল প্রচুর। সেপুখোভস্কয়কে নিয়ে ছোঁড়াছুঁড়ি করল লোকে। তারপর রেজিমেন্ট কমান্ডারকে। অতঃপর পেত্রিৎস্কির সাথে স্বয়ং রেজিমেন্ট কমান্ডারের ধেই-ধেই নৃত্য। অবশেষে খানিকটা ক্লান্ত হয়ে রেজিমেন্ট কমান্ডার আঙিনার বেঞ্চিতে বসে ইয়াভিনকে বোঝাতে লাগলেন প্রাশিয়ার চেয়ে রাশিয়ার শ্রেষ্ঠর কতটা, বিশেষ করে ঘোড়সওয়ার আক্রমণে, ফুর্তিও কিছুক্ষণের জন্য থিতিয়ে এল। সেপুখোভস্কয় গেলেন বাড়ির ভেতরে প্রক্ষালণকক্ষে হাত ধোবার জন্য। সেখানে পেলেন ভ্রন্স্কিকে : ভ্রন্স্কি হাত-মুখ ধুচ্ছিলেন। উর্দি খুলে রেখে তিনি তাঁর লোমে ভরা লাল ঘাড় পেতে রেখেছেন পানির ধারার নিচে এবং হাত দিয়ে ঘাড় আর মাথা রগড়াচ্ছেন। প্রক্ষালণ শেষ করে ভ্রন্স্কি বসলেন সেপুখোভস্কয়-এর কাছে। দুজনেই তাঁরা ওখানেই সোফায় বসে যে কথাবার্তা শুরু করলেন তাতে উভয়েরই আগ্রহ ছিল।
সেপুখোভস্কয় বললেন,’বৌয়ের কাছ থেকে তোর কথা সবই শুনেছি। তুই ওর সাথে প্রায়ই দেখা করিস বলে আমি খুশি।’
‘ওঁর সাথে ভারিয়ার বন্ধুত্ব আছে। পিটার্সবুর্গে ওঁরা দুজন একমাত্র নারী যাঁদের দেখে আমার আনন্দ হয়’ হেসে জবাব দিলেন ভ্রন্স্কি। হাসলেন কারণ কথাবার্তাটা কোন প্রসঙ্গে যাবে সেটা তিনি আন্দাজ করেছিলেন এবং সেটা তাঁর ভালোই লাগল।
‘একমাত্র?’ হেসে জিজ্ঞেস করলেন সেপুখোভস্কয়।
‘হ্যাঁ, আর তোর কথাও আমি শুনেছি তবে শুধু তোর বৌয়ের কাছ থেকে নয়; মুখের কড়া একটা ভাবে ইঙ্গিতটা বন্ধ করে দিয়ে বললেন ভ্রন্স্কি, ‘তোর সাফল্যে আমি খুবই খুশি, কিন্তু মোটেই অবাক হইনি। আশা করেছিলাম আরো বেশি।’
সের্পুখোভস্কয় হাসলেন। তাঁর সম্পর্কে এই মতটা যে তাঁর ভালো লেগেছিল, সেটা স্পষ্টই বোঝা যায়, লুকোবার প্রয়োজন তিনি বোধ করলেন না।
এটা
‘খোলাখুলি স্বীকার করছি, আমি কিন্তু এর চেয়ে কমই আশা করেছিলাম। তবে খুশি। আমি উচ্চাভিলাষী, স্বীকার করছি সেটা আমার দুর্বলতা।’
‘সাফল্যলাভ না করলে সম্ভবত তুই এটা স্বীকার করতিস না’, ভ্রন্স্কি বললেন।
‘তাহলেও করতাম বলে আমার ধারণা’, আবার হেসে বললেন সের্পুখোভস্কয়, ‘এ কথা বলব না যে এ ছাড়া জীবনধারণের মানে হয় না, তবে একঘেয়ে লাগত। হয়ত আমার ভুল হচ্ছে, কিন্তু যে কর্মক্ষেত্রটা আমি বেছে নিয়েছি তার উপযোগী কিছু গুণ, আমার আছে বলে আমার ধারণা, এবং আমার হাতে যদি আসে, তবে যে কর্তৃত্বই আসুক, সেটা পালিত হবে আমার পরিচিত অনেকের চেয়ে ভালোভাবে’, সাফল্যে জ্বলজ্বলে হয়ে বললেন সের্পূখোভস্কয়। ‘তাই সাফল্যের মত কাছাকাছি আসি, ততই আনন্দ হয় আমার।’
‘হয়ত ব্যাপারটা তোর ক্ষেত্রে তাই-ই, তবে সকলের ক্ষেত্রে নয়। আমিও তাই ভাবতাম, কিন্তু এখন দিন কাটাচ্ছি আর দেখতে পাচ্ছি যে শুধু এর জন্যেই বেঁচে থাকার মানে হয় না’, ক্রস্কি বললেন।
এই কথাটাই শুনতে চাইছিলাম রে, এই কথাটাই!’ হেসে বললেন সের্পূখোভস্কয়, ‘আমি তো এই বলেই শুরু করেছিলাম, যে আমি যে তোর সম্পর্কে শুনেছি, তুই যে পদোন্নতি প্রত্যাখ্যান করেছিস, সে কথাটাও…বলাই বাহুল্য আমার অনুমোদন ছিল তাতে। তবে সব কিছুরই একটা ধরন আছে। আমি মনে করি কাজটা ঠিকই হয়েছে, তবে যেভাবে করা উচিত ছিল সেভাবে করিসনি।’
‘যা করেছি, করেছি। তুই তো জানিস, যা করলাম তা থেকে আমি পালাই না। পরে কসম লাগে আমার।’
‘কসম লাগাটা শুধু সাময়িক। তাতে করে তুই পরিতৃপ্ত হবি না। তোর বড় ভাইকে এ কথা বলতে যাব না আমি। উনি মিষ্টি মানুষ, আমাদের এই গৃহস্বামীটির মত। ঐ যে তিনি!’
‘হুররে’ চিৎকার শুনে যোগ করলেন তিনি, ‘উনি খুশিই, কিন্তু তুই তো এতে পরিতৃপ্ত হবি না।’
‘আমি তো বলছি না যে পরিবৃত্তি পেয়েছি।
‘এই গেল এক কথা। তাছাড়া তোর মত লোকের দরকার আছে।’
‘কার দরকার?’
‘কার? সমাজের। লোকের দরকার আছে রাশিয়ার, দরকার আছে পার্টির। না হলে সব চুলোয় যাবে।’
‘তার মানে? রুশী কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে বের্তেনেভের পার্টি।’
‘না’, তাঁর মধ্যে ও-ধরনের একটা মূর্খতা সন্দেহ করা হচ্ছে বলে রাগে মুখবিকৃত করে সেপুখোভস্কয় ফরাসি ভাষায় বললেন, ‘এ সবই মূর্খতা।’ ওটা সব সময়ই ঘটেছে এবং ঘটবে। কমিউনিস্ট-টমিউনিস্ট কিছু নয়। কিন্তু কুচক্রী লোকদের সব সময়ই কোন-একটা অনিষ্টকর বিপজ্জনক পার্টি গড়ে তোলা দরকার। ওটা একটা পুরানো খেল। ওর নয়, প্রয়োজন তোর-আমার মত স্বাধীন লোকদের ক্ষমতাশীল পার্টি।
