পিটার্সবুর্গে আসতেই তাঁর সম্পর্কে লোকে বলতে লাগল যে এবার প্রথম শ্রেণীর একটা তারকার উদয় হয়েছে। ভ্রন্স্কির সমবয়সী ও সতীর্থ ইতিমধ্যেই জেনারেল, এমন একটা পদ তাঁর জন্য অপেক্ষা করছে যাতে রাষ্ট্রের ভাগ্যচক্র নির্ধারিত হতে পারে আর ভ্রন্স্কি স্বাধীনচেতা, উজ্জ্বল, রমণীয় মরণীর দয়িত হলেও মাত্র একজন ঘোড়সওয়ার ক্যাপটেন, যে স্বাধীনতা ভোগ করতে পারে যতখুশি। ‘বলাই বাহুল্য আমি সেপুখোভস্কয়কে ঈর্ষা না, করতে পারিও না, কিন্তু তার পদোন্নতিতে আমি দেখতে পাচ্ছি যে আমার মত লোকের পক্ষে কিছু সবুর করা দরকার, উন্নতি হবে শিগগিরই। তিন বছর আগে সে-ও তো ছিল আমারই অবস্থায়। ইস্তফা দিলে আমি নিজের পথেই কাঁটা দেব। চাকরিতে থাকলে আমার লোকসান নেই কিছুই। আন্না তো নিজেই বলেছে সে তার অবস্থার কোন অদলবদল চায় না। তার ভালোবাসা যখন আছে, সেপুখোভস্কয়কে তখন আমার হিংসে হতে পারে না।’ ধীরে ধীরে মোচে পাক দিয়ে তিনি উঠে পায়চারি করতে লাগলেন ঘরে। চোখ তাঁর খুবই জ্বলজ্বল করছিল, নিজের অবস্থাটা পরিষ্কার করে নেবার পর বরাবরের মত প্রাণ তাঁর শান্ত, নিশ্চিত, সানন্দ হল। হিসাব-নিকাশ করে সব কিছুই হয়ে উঠল পরিষ্কার, সুস্পষ্ট। দাড়ি কামিয়ে, ঠাণ্ডা পানিতে গোসল সেরে বেরিয়ে গেলেন তিনি।
একুশ
‘আমি তোর কাছেই আসছিলাম। তোর ধোয়া-ধুয়ি আজ চলেছে অনেকক্ষণ’, বললেন পেত্রিৎস্কি, ‘শেষ হয়েছে তো?’
‘হয়েছে’, শুধু চোখের হাসি হেসে বললেন ভ্রন্স্কি, মোচের ডগায় পাক দিলেন এমন সন্তপর্ণে যেন নিজের অবস্থাটায় যে শৃঙ্খলা তিনি নিয়ে এসেছেন যে কোন দ্রুত বা বড় বেশি দুঃসাহসী গতিবেগে তা ধ্বসে পড়তে পারে।
‘তোকে সব সময়ই দেখায় যেন এইমাত্র গোসল সেরে এলি’, পেত্রিৎস্কি বললেন, ‘আমি আসছি গ্রিস্কোর কাছ থেকে’ (রেজিমেন্ট কমান্ডারকে তাঁরা ঐ নামে ডাকতেন), ‘তোর অপেক্ষায় আছে সবাই।
কোন জবাব না দিয়ে ভ্রন্স্কি বন্ধুর দিকে তাকালেন এবং ভাবতে লাগলেন অন্য কথা।
পোল্কা আর ওয়াল্জ নাচের পরিচিত ব্রাশ ব্যান্ডের ধ্বনিতে কান পেতে ভ্রন্স্কি বললেন, ‘ওর ওখানে বাজনা? উৎসবটা কিসের?’
‘সের্পুখোভস্কয় এসেছে।’
‘ও’, ভ্রন্স্কি বললেন, ‘আমি জানতাম না।’
চোখের হাসিটা তাঁর আরো উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
তিনি যে তাঁর প্রেমে সুখী, নিজের উচ্চাকাঙ্ক্ষা বিসর্জন দিয়েছেন তাঁর জন্য, নিদেনপক্ষে সেই ভূমিকাটা নিয়েছেন, নিজের কাছে এটা একবার স্থির করে নেবার পর ভ্রন্স্কি সেপুখোভস্কয়-এর প্রতি ঈর্ষা অথবা রেজেমেন্টে তাঁর সাথে প্রথম দেখা করলেন না বলে দুঃখ-কিছুই বোধ করলেন না। সের্পূখোভস্কর তাঁর ভালো বন্ধু, এসেছেন বলে খুশি।
‘খুব আনন্দ হল।’
রেজিমেন্ট কমান্ডার দেমিন একটা বড় জমিদার বাড়িতে উঠেছিলেন। গোটা দলটা জুটেছে নিচের প্রশস্ত ব্যালকনিতে। আঙিনায় প্রথম যেটা ভ্রন্স্কির নজরে পড়ল সেটা এক ব্যারেল ভোদ্কার কাছে দণ্ডায়মান উর্দি-পরিহিত গায়কবৃন্দ আর অফিসার পরিবেষ্টিত রেজিমেন্ট কমান্ডারের হৃষ্টপুষ্ট হাসি-খুশি মূর্তি। ব্যালকনির প্রথম ধাপে এসে তিনি অফেনবাখ কাড্রিলের সঙ্গীত ছাপিয়ে চিৎকার করে কি যেন হুকুম করলেন আর দূরে দাঁড়ানো সৈনিকদের উদ্দেশ্যে হাত নাড়লেন। ভ্রন্স্কির সাথে একদল সৈন্য, কোয়ার্টার-মাস্টার আর কিছু সাব-অলটার্ন এল ব্যালকনির কাছে। টেবিলের কাছে গিয়ে রেজিমেন্ট আর কিছু সাব-অলটার্ন এল ব্যালকনির কাছে। টেবিলের কাছে গিয়ে রেজিমেন্ট কমান্ডার হাতে পানপাত্র নিয়ে আবার বেরিয়ে এলেন অলিন্দে এবং টোস্ট প্রস্তাব করলেন : ‘আমাদের ভূতপূর্ব সঙ্গী এবং নির্ভীক জেনারেল প্রিন্স সেপুখোভস্কয়-এর স্বাস্থ্যের জন্যে। হুররে!’
রেজিমেন্ট কমান্ডারের পেছনে পেছনে পানপাত্র হাতে হাসিমুখে বেরিয়ে এলেন সেপুখোভস্কয়ও।
‘বয়স তোর কেবলি যে কমছে বন্দারেঙ্কো’, ঠিক তাঁর সামনে দাঁড়ানো, ফৌজে দ্বিতীয় টার্মে ওঠা, রক্তিমগণ্ড ছোকরাগোছের কোয়ার্টার-মাস্টারকে বললেন তিনি।
তিন বছর সেপুখোভস্কয়কে দেখেননি ভ্রন্স্কি। গাঁট্টাগোট্টা হয়েছেন তিনি, গালপাট্টা রেখেছেন, কিন্তু আছেন একইরকম মুঠাম, সেটা বিস্মিত করে রূপে ততটা নয়, যতটা মুখখানার কোমলতা আর মহিমায় এবং দেহের গঠনে শুধু একটা যে পরিবর্তন ভ্রন্স্কির চোখে পড়ল সেটা তাঁর অবিরাম মৃদু একটা জ্বলজ্বলে ভাব যা ফুটে ওঠে তেমন লোকদের মুখে যারা সাফল্য লাভ করেছে এবং সকলের কাছ থেকে সে সাফল্যের স্বীকৃতিতে নিশ্চিত। এ দীপ্তি ভ্রন্স্কির জানা এবং তৎক্ষণাৎ সেটা তিনি লক্ষ্য করলেন সেপুখোভস্কয়-এর মধ্যে।
সিঁড়ি থেকে নামতেই তিনি দেখতে পেলেন ভ্রন্স্কিকে। আনন্দের হাসিতে উদ্ভাসিত হয়ে উঠল সেপুখোভস্কয়-এর মুখ। ভ্রন্স্কিকে অভিনন্দন জানবার ভঙ্গিতে তিনি পানপাত্র তুলে পেছন দিকে মাথা হেলালেন এবং এই ভঙ্গিতে বুঝিয়ে দিলেন যে আগে কোয়ার্টার-মাস্টারের কাছে না গিয়ে পারেন না। ইতিমধ্যেই চুম্বনের জন্য ঠোঁট তৈরি রেখে সে দাঁড়িয়ে ছিল টানটান হয়ে।
‘এই যে উনি!’ চেঁচিয়ে উঠলেন রেজিমেন্ট কমান্ডার, ‘অথচ ইয়াভিন আমাকে বলেছিল যে তোর মন ভালো নেই।
