ভ্রন্স্কি জীবনে বিশেষ সৌভাগ্যবান এই দিক থেকে যে কি তিনি করবেন, কি করবেন না, তা সুনিশ্চিতরূপে স্থির করে দেবার মত একগোছা নিয়ম ছিল তাঁর। নিয়মগুলো খুবই ছোট্ট একটা এলাকা নিয়ে, তবে সেগুলো সুনিশ্চিত, আর এই এলাকার বাইরে কখনো না গিয়ে, যা উচিত তা পালনে মুহূর্তের জন্য ভ্রন্স্কি দ্বিধা করতেন না। এই নিয়মগুলো নিশ্চিতরূপে স্থির করে দিয়েছিল যে-জুয়ার ঠগের টাকাটা মিটিয়ে দেওয়া দরকার, কিন্তু দর্জির নয়; পুরুষদেরকে মিথ্যা কথা বলা চলবে না, কিন্তু নারীদের চলবে, কাউকে প্রতারণা করা উচিত নয়, কিন্তু স্বামীকে করা যাবে, অপমান ক্ষমা করা অনুচিত, কিন্তু অন্যকে অপমান করা যাবে ইত্যাদি। হতে পারে এ সব নিয়ম অবিবেচনাপ্রসূত, অন্যায়, কিন্তু সুবিশ্চিত, আর নিয়মগুলো পালন করে ভ্রন্স্কি অনুভব করতেন যে তিনি স্বস্তিতে আছেন, মাথা উঁচু করে চলতে পারেন। কিন্তু ইদানীং আন্নার সাথে তাঁর সম্পর্কে উপলক্ষে ভ্রন্স্কি টের পেতে শুরু করেছেন যে তাঁর নিয়মগুচ্ছ সমস্ত পরিস্থিতি পুরোপুরি স্থির করে দেয় নি এবং ভবিষ্যতে তা মুশকিল ও সন্দেহ ঘটাবে, আর তখন কিভাবে চলতে হবে তার সূত্র তিনি পাচ্ছিলেন না।
আন্না এবং তাঁর স্বামীর সাথে তাঁর বর্তমান সম্পর্ক তাঁর কাছে ছিল সুস্পষ্ট এবং সোজা। যে নিয়মগুলোতে তিনি পরিচালিত তার সাথে তা কাঁটায় কাঁটায় মেলে।
আন্না সুচরিতা নারী, তাঁকে দিয়েছেন তাঁর ভালোবাসা, তিনিও তাঁকে ভালোবাসেন, তাই তাঁর কাছে আন্না এমন এক নারী যিনি বৈধ স্ত্রীর চেয়েও সম্মানীয়। বাক্যের বা ইঙ্গিতে তাঁকে শুধু অপমানিত করা নয়, নারীর কাম্য যে মর্যাদা তা না দেওয়ার চেয়ে তিনি বরং তাঁর হাতখানা কেটে ফেলতেই রাজী।
সমাজের সাথে তাঁর সম্পর্কটাও ছিল স্পষ্ট। সবাই জানতে পারে, সন্দেহ করতে পারে, কিন্তু সে কথা কারো বলা চলবে না। অন্যথায় যে বলবে তাকে তিনি চুপ করিয়ে দিতে এবং যে নারীকে ভালোবাসেন তাঁর অবিদ্যমান মর্যাদাকে মান্য করাতে তিনি প্রস্তুত।
আন্নার স্বামীর প্রতি মনোভাবটা ছিল সর্বাধিক পরিষ্কার। ভ্রন্স্কিকে আন্না যখন ভালোবেসেছেন, তখন থেকেই তিনি ধরে নিয়েছেন তাঁর ওপর নিজের একাধিকার। স্বামী শুধু অবাস্তর একটা বিঘ্ন। সন্দেহ নেই যে তাঁর অবস্থাটা করুণ, কিন্তু কি করা যাবে? স্বামীর আছে শুধু একটা অধিকার, অস্ত্র হাতে শোধ-বোধ দাবি করা, ভ্রন্স্কি তার জন্য প্রথম থেকেই প্রস্তুত।
কিন্তু ইদানীং একটা নতুন আভ্যন্তরীণ সম্পর্ক গড়ে উঠেছে আন্না এবং তাঁর মধ্যে, যা তার অনিশ্চয়তার ত্রস্ত করছে ভ্রন্স্কিকে। কাল আন্না জানিয়েছেন যে তিনি গর্ভবতী। তিনি অনুভব করেছিলেন যে এই সংবাদটা এবং তাঁর কাছ থেকে আন্না যা আশা করছেন তার দাবি তিনি যে নিয়মগুলোর দ্বারা চালিত তার সাথে পুরো খাপ খাচ্ছে না। এবং সত্যিই আন্না যখন নিজের অবস্থার কথা বলেন তখন প্রথম মুহূর্তে তিনি হতচকিত হয়ে পড়েছিলেন, তাঁর হৃদয় যা চেয়েছিল, তাই তিনি দাবি করেছিলেন—স্বামীকে ত্যাগ করা উচিত। সে কথা তিনি বলেওছিলেন। কিন্তু এখন ব্যাপারটা ভেবে দেখে তিনি পরিষ্কার বুঝলেন যে ওটা এড়িয়ে যাওয়াই ভালো, কিন্তু নিজেকে সেটা বুঝিয়ে ও তাঁর আশংকা হল, এটা কি খারাপ হবে না?
‘স্বামীকে ত্যাগ করার কথা যদি বলে থাকি, তার মানে আমার সাথে থাকে। তার জানো আমি কি কি তৈরি? এখন আমার যখন টাকা নেই তখন কি করে নিয়ে আসি ওকে? ধরা যাক, সে ব্যবস্থা করা গেল… কিন্তু কি করে ওকে নিয়ে যখন আমি আছি চাকরিতে? যখন বলেছি, তখন তৈরি হতে হবে এর জন্যে, অর্থাৎ টাকা জোগাড় করে ইস্তফা দিতে হবে কাজে।’
চিন্তায় মগ্ন হয়ে গেলেন তিনি। কাজে ইস্তফা দেওয়া কি না দেওয়ার প্রশ্নের তাঁর মনে উদিত হল অন্য একটা গোপন কথা যা শুধু তাঁরই জানা, যেটা তাঁর গোটা জীবনের প্রায় প্রধান স্বার্থ।
আত্মশ্লাঘা তাঁর শৈশব ও তারুণ্যের পুরানো স্বপ্ন। এ বিষয়ে তিনি সজ্ঞান না থাকলেও সেটা ছিল এতই প্রবল যে এই কামনার সাথে এখন বিবাদ বাঁধল ভালোবাসার। সমাজে এবং চাকরিতে প্রথমদিকটায় তাঁর ভালোই চলেছিল, কিন্তু দু’বছর আগে একট বেমক্কা ভুল করেন তিনি। তাঁর যে পদোন্নতির প্রস্তাব এসেছিল, সেটা তিনি নিজের স্বাধীনচিত্ততা হাজির করার বাসনায় প্রত্যাখ্যান করেন, ভেবেছিলেন এতে তাঁর মূল্য বাড়বে; কিন্তু দেখা ওটা বড়ই স্পর্ধিত একটা আশা, তাঁকে ফেলে রাখা হল। আর চান বা না চান নিজেকে স্বাধীনতা মানুষের পর্যায়ে ফেলে তিনি এটা সহ্য করে নেন এবং বেশ সূক্ষ্ম বুদ্ধিমানের মত ব্যবহার করে যান, যেন কারো ওপর তাঁর রাগ নেই, নিজেকে ক্ষুব্ধ বোধ করছেন না, তিনি, শুধু চান শান্তিতে থাকতে, কারণ বেশ ফুর্তিতেই তিনি আছেন। আসলে গত বছর যখন তিনি মস্কোর আসেন, ফুর্তি তাঁর মাটি হয়ে গিয়েছিল। তিনি অনুভব করছিলেন যে লোকটা সবাই করতে পারে কিছু কিছুই করতে চায় না, এমন একটা অভিমত লোকের মনে দানা বাঁধতে শুরু করেছে এবং অনেকেই ভাবছে যে সং আর সহৃদয় ছোকরা হওয়া ছাড়া কিছুই তিনি করতে পারেননি। কারেনিনার সাথে প্রেমঘটিত ব্যাপারে যে কোলাহল উঠেছিল, মনোযোগ আকৃষ্ট হয়েছিল তাঁর দিকে, তাতে একটা নতুন চমক দিতে পেরেছিলেন তিনি, তাঁর ক্ষীয়মাণ আত্মভিমান তাতে আপাতত শান্ত হয়েছিল, কিন্তু সপ্তাহ কানেক আগে তার কামড় নবশক্তিতে জানান দেয়। তাঁর ব্যাল্যকালের সাথে, একই মহল, একই সমাজের লোক, কোর-এ সহকর্মী একই সময়ে উত্তীর্ণ সেপুকোভস্কয়, যাঁর সাথে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল ক্লাসে, ব্যায়াম-ক্রীড়ায়, দুষ্টুমিতে, বড় হবার স্বপ্নে, তিনি ফিরেছেন মধ্য এশিয়া থেকে, দু’ধাপ উঁচিয়ে তাঁকে যে পদ দেওয়া হয়েছে সেটা অত অল্পবয়স্ক জেনারেলের পক্ষে বিরল।
© 2023 BnBoi - All Right Reserved
© 2023 BnBoi - All Right Reserved