শুকেভিচ এসে ঘোষণা করলেন যে সবাই ক্রিকেট খেলোয়াড়দের জন্য অপেক্ষা করছে।
‘না, যাবেন না দয়া করে’, আন্না চলে যাচ্ছেন শুনে মিনতি করলেন লিজা মেকালোভা। স্ত্রেমভ সায় দিলেন তাঁর কথায়।
‘এই দলটা ছেড়ে বৃদ্ধা ভ্রেদে’র কাছে যাওয়া, সে এক বড় বেশি বৈপরীত্য, তা ছাড়া আপনাকে পেয়ে উনি পরচর্চার উপলক্ষ পাবেন আর এখানে ব্যাপারটা অন্যরকম, ভালো ভালো অনুভূতি সঞ্চার করবেন আপনি যা পরর্চ্চার বিপরীত’, আন্নাকে বললেন তিনি।
অনিশ্চয়তার এক মুহূর্ত দ্বিধা করলেন আন্না। বুদ্ধিমান এই মানুষটার প্রশংসাবাক্য, তাঁর প্রতি লিজা মেকালোভার ছেলেমানুষি অনুরাগ, গোটা এই অভ্যস্ত বড়লোকী পরিবেশ—সবই তাঁর কাছে সহজ কিন্তু যা অপেক্ষা করছে সেটা এতই দুঃসহ যে এক মুহূর্তের জন্য তিনি অনিশ্চয়তায় পড়লেন, থেকে গেলে হয়-না, আলোচনার কষ্টকর মুহূর্তটা আরো পিছিয়ে দেবেন কি। কিন্তু কোন সিদ্ধান্ত না নিয়ে একলা বাড়ি ফিরলে কি তাঁর ভাগ্যে আছে সেটা মনে পড়ার, স্মৃতিতেও যা ভয়াবহ, দু’হাতে চুল চেপে ধরার সেই ভঙ্গিটা মনে পড়ায় তিনি বিদায় নিয়ে চলে গেলেন।
উনিশ
তাঁর জাগতিক জীবন দেখতে লঘুচিত্ত মনে হলেও বেবন্দোবস্ত ভ্রন্স্কি দু’চোখে দেখতে পারতেন না। তরুণ বয়সে যখন তিনি করেছিলেন, তখন মুশকিলে পড়ে টাকা চাইতে গিয়ে একবার প্রত্যাখ্যাত হবার পর থেকে তিনি নিজেকে এমন অবস্থায় পড়তে দেননি।
নিজের হাল সব সময় গুছিয়ে রাখার জন্য অবস্থাসাপেক্ষ ঘন ঘন, অথবা মাঝেমধ্যে, বছরে বার পাঁচেক তিনি একলা হয়ে নিজের অবস্থাটা পরিষ্কার করে নিতেন। এটাকে তিনি বলতেন শোধ-বোধ অথবা ধোয়াধুয়ি।
ঘোড়দৌড়ের পরের দিন দেরিতে ঘুম ভেঙে ভ্রন্স্কি দাড়ি না কামিয়ে, গোসল না সেরে উর্দি পরলেন এবং টেবিলের ওপর টাকা-পয়সা, বিল, চিঠিপত্র ছড়িয়ে কাজ শুরু করেছিলেন। পেত্রিৎস্কি জানতেন যে এরকম অবস্থায় তিনি রেগে থাকেন। ঘুম ভেঙে পেত্রিৎস্কি যখন দেখলেন বন্ধু, লেখার টেবিলে ব্যস্ত, তখন চুপচাপ পোশাক পরে ভ্রন্স্কির ব্যাঘাত না ঘটিয়ে রেবিয়ে যান।
একান্ত খুঁটিনাটিতে নিজের পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির সমস্ত জটিলতা যারা জানে এমন প্রত্যেকেই অজান্তে ধরে নেয় যে এসব পরিস্থিতির জটিলতা এবং তা আসন করার মুশকিলটা শুধু তারই ব্যক্তিগত একটা ঘটনা, বিশেষ একটা আপতিকতা, ভাবে না যে অন্যেরাও তারই মত ব্যক্তিগত পরিস্থিতির জটিলতায় আবেষ্টিত। ভ্রন্স্কিরও তাই মনে হয়েছিল। অন্য লোক তাঁর মত মুশকিল পড়রে অনেক আগেই হাল ছেড়ে দিত, দুষ্টচারী হতে বাধ্য হত, এ কথা ভেবে ভেতরে ভেতরে ভ্রন্স্কির গর্ব হত না এবং তার যুক্তি থাকত না এমন নয়। কিন্তু ভ্রন্স্কি টের পাচ্ছিলেন হত না এবং তার যুক্তি থাকত না এমন নয়। কিন্তু ভ্রন্স্কি টের পাচ্ছিলেন যে লেজেগোবরে জড়িয়ে পড়তে না হলে ঠিক এখনই তাঁকে হিসাব-নিকাশ করে নিয়ে নিজের অবস্থাটা সুস্পষ্ট করে তুলতে হবে।
সবচেয়ে সহজ হিসেবে ভ্রন্স্কি প্রথম যে জিনিসটা হাতে নিলেন সেটা আর্থিক ব্যাপার। যত তাঁর দেনা আছে, চিঠি লেখার একটা কাগজে নিজের ছোট ছোট অক্ষরে তা সব টুকে যোগ দিয়ে দেখলেন যে দাঁড়াচ্ছে সতেরো হাজার কয়েক শ’ রুল-কয়েক শ’টা তিনি বাদ দিলেন পরিষ্কার হয়ে নেবার জন্য। নিজের টাকাকড়ি আর ব্যাঙ্কের খাতা হিসাব করে দেখলেন যে তাঁর থাকছে এক হাজার আটশ’ রুল, নববর্ষের আগে আর কোন টাকা পাবার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। দেনার তালিকা আবার পড়ে তিনি তাকে নতুন করে লিখলেন তিন ভাগে ভাগ করে। প্রথম ভাগটায় রইল যেসব দেনা অবিলম্বে শোধ দিতে হবে, অন্তত চাইলে যাতে দেরি না হয় তার জন্য নগদ টাকা রাখতে হবে হাতে। এই ধরনের দেনা ছিল পায় চার হাজার রুব্ল : দেড় হাজার ঘোড়ার জন্য আর আড়াই হাজার তাঁর তরুণ বন্ধু ভেনেস্কির জামিন হিসেবে। ভ্রন্স্কির উপস্থিতিতে ভেনেস্কির তাসে এই টাকাটা হেরেছিলেন এক ঠগের কাছে। ভ্রন্স্কি তখনই টাকাটা দিয়ে দিতে চেয়েছিলেন (সেটা তাঁর সাথেই ছিল), কিন্তু ভেনেস্কি আর ইয়াভিন জেদ ধরেননি। সেটা ভালোই, কিন্তু ভ্রন্স্কি জানতেন যে নোংরা নোংরা এই যে ব্যাপারটায় তিনি অংশ নিয়েছেন শুধু ভেনেস্কির মৌখিক জামিনদার হিসেবে তাতে ঠগটার মুখের ওপর ছুঁড়ে ফেলে তার সাথে আর কোন কথাবার্তা না চালাবার জন্য এই আড়াই হাজার তাঁর দরকার। তাই এই গুরুত্বপূর্ণ ভাগটার দরুন চাই চার হাজার। দ্বিতীয় ভাগটার আট হাজারটা কম জরুরি দেনা। সেটা হল প্রধানত ঘোড়াদৌড়ের আস্তাবল, ওট আর বিচালির জন্য এবং ইংরেজটি, সহিস ইত্যাদির কাছে। একেবারে নিশ্চিন্ত থাকতে হলে এই দেনা বাবদেও হাজার দুয়েক টাকা দেওয়া দরকার। দোকান, হোটেল, দর্জির কাছে যা ধার, সে ভাগটা এমন যে তা নিয়ে ভাবনা না করলেও চলে। তাই চলতি খরচার জন্য দরকার নিদেনপক্ষ ছ’হাজার, অথচ আছে কেবল এক হাজার আটশ’। ভ্রন্স্কির বার্ষিক আয় লোকে এক লক্ষ বলে ধরে, এমন ব্যক্তির পক্ষে এ দেনাটা কোন মুশকিলের ব্যাপার নয়; কিন্তু আসরে তাঁর আয়টা মোটেই এক লাখ নয়।
পিতার বিশাল যে সম্পত্তি থেকে বছরে এক থেকে দু’লাখ অবধি আয় হত সেটা ভাইদের মধ্যে ভাগাভাগি হয়নি। এক রাশ দেনা নিয়ে বড় ভাই যখন ডিসেম্ব্রিস্ট বিপ্লবীর কন্যা, সম্পত্তিহীনা ভারিয়া চিরকোভাকে বিয়ে করেন, আলেক্সেই তখন পিতৃসম্পত্তির সমস্ত আয় বড় ভাইকে ছেড়ে দিয়ে নিজের জন্য শুধু বছরে পঁচিশ হাজার রাখতে বলেন। বড় ভাইকে আলেকসেই তখন জানিয়েছিলেন যে, যতদিন তিনি না বিয়ে করছেন, আর সেটা খুব সম্ভব কখনো ঘটবে না, তত দিন ঐ টাকাতেই তাঁর বেশ চলে যাবে। এবং ব্যয়বহুল একটা রেজিমেন্টের কমান্ডার, সদ্যবিবাহিত বড় ভাইও এ দান গ্রহণ না করে পারেননি। মায়ের নিজস্ব পৃথক সম্পত্তি ছিল, যে পঁচিশ হাজারের কথা হয়েছিল তা ছাড়াও তিনি আরেক্সেইকে দিতেন বছরে আরো বিশ হাজার আর সবই উড়িয়ে দিতেন আলেকসেই। ইদানীং আন্নার সাথে আলেকসেইয়ের গুপ্ত সম্পর্কের কথা কানে আসার এবং মস্কো থেকে তাঁর চলে যাওয়ার ঝগড়াঝাঁটি করে তাঁকে টাকা পাঠানো তিনি বন্ধ করে দিয়েছেন। ইতিমধ্যে পঁয়তাল্লিশ হাজারে দিন কাটাতে অভ্যস্ত হয়ে গিয়ে আর এ বছর শুধু পঁচিশ হাজার পেয়ে আলেক্সেই পড়েছেন মুশকিলে। এ মুশকিল আসানের জন্য তিনি মায়ের কাছে টাকা চাইতে পারেন না। ইদানীং মায়ের যে শেষ চিঠি তিনি পেয়েছেন সেটা তাঁকে বিশেষ চটিয়ে দিয়েছে এই কারণে যে তাঁকে তিনি সাহায্য করতে রাজী জীবনে এবং রাজসেবায় তাঁর উন্নতির জন্য, কিন্তু সমস্ত সজ্জন লোকের যাতে মাথা হেঁটে হচ্ছে সে জীবন যাপনের জন্য নয়, এমন একটা ইঙ্গিত ছিল তাতে। তাঁকে কিনে নেবার জন্য মায়ের এই আকাঙ্ক্ষায় গভীর অপমানিত বোধ করলেন তিনি, এবং হয়ে উঠলেন তাঁর প্রতি আরো নিরুত্তাপ। কিন্তু মহানুভবের মত তিনি ভাইকে যে কথা দিয়েছেন তা তিনি ফিরিয়ে নিতে পারেন না এবং আন্নার সাথে সম্পর্কে কিছু কিছু আপতিকতার একটা ঝাপসা ভবিষ্যৎ দেখতে পেয়ে তিনি এখন টের পাচ্ছিলেন যে ঐ মহানুভব কথাগুলো বলা হয়েছিল লঘুচিত্তে, তিনি অকৃতদার, পুরো ঐ এক লক্ষের আয়ই তাঁর দরকার হতে পারে। তবে কথা ফেরত নেওয়া চলে না। যেই তিনি ভ্রাতৃবধূর কথা ভাবতেন, যেই তাঁর মনে পড়ত যে সুবিধা পেলেই মিষ্টি, লক্ষ্মী এই ভারিয়া তাঁকে বলতেন যে তাঁর মহানুভবতা তিনি মনে রেখেছেন, তাতে মূল্য দেন, অমনি বোজা যেত যা দেওয়া হয়েছে তা ফেরত নেওয়া অসম্ভব। নারীকে প্রহার করা, চুরি করা, মিথ্যা কথা বলার মতই অসম্ভব এটা সম্ভব আর উচিত শুধু একটাই আর মুহূর্ত দ্বিধা না করে ভ্রন্স্কি তাই স্থির করলেন : কুশীদজীবীর কাছে দশ হাজার ধার করবেন, তাতে অসুবিধে হবে না, সাধারণভাবেই নিজের ব্যয় ছেঁটে ফেলবেন, বিক্রি করে দেবেন দৌড়ের ঘোড়াগুলো। এই স্থির করে তিনি তখনই চিঠি লিখলেন রোলান্দাকিকে, যে একাধিকবার তাঁর ঘোড়াগুলো কিনতে চেয়েছিল। তারপর তিনি ইংরেজটি আর কুশীদজীবীর কাছে লোক পাঠালেন, তাঁর কাছে যে টাকা ছিল সেটা ভাগ করে রাখলেন বিল অনুসারে। এ ব্যাপারটা ঢুকিয়ে তিনি মায়ের চিঠির একটা নিরুত্তাপ রূঢ় জবাব লিখলেন। তারপর পকেট বই থেকে আন্নার তিনটা চিঠি বের করে আবার পড়লেন সেগুলো, পুড়িয়ে ফেললেন এবং গতকাল সন্ধ্যায় আন্নার সাথে তাঁর কথাবার্তা স্মরণ করে চিন্তায় ডুবে গেলেন।
