ইনি সাফোর নতুন ভক্ত। ভাস্কার মত ইনিও তাঁর পায়ে পায়ে ঘুরতে লাগলেন।
একটু পরেই এলেন প্রিন্স কালুজস্কি আর লিজা মেকালোভা, সাথে স্ত্রেমভ। কৃষবেশী কৃশতনু মহিলা লিজা মের্কালোভা, মুখখানায় তাঁর প্রাচ্যদেশীয় অলসতা, চোখ দুটো সুন্দর, সবাই যা বলে, অবর্ণনীয়। তাঁর অন্ধকার রঙের পোশাক একেবারে খাপ খেয়ে গেছে তাঁর রূপের সাথে (আন্না তখনই তা লক্ষ্য করে কদর করেছিলেন)। সাফো যেমন প্রখর আর উচ্চকিত লিজা ঠিক তেমনি নরম আর এলানো।
তবে আন্নার যা রুচি, তাতে লিজা অনেক বেশি আকর্ষণীয়। তাঁর সম্পর্কে বেত্সি আন্নাকে বলেছিলেন যে লিজা অবুঝ শিশুর ভাব নিয়েছেন কিন্তু তাঁকে দেখে আন্না অনুভব করলেন যে কথাটা ঠিক নয়। অবুঝ এবং বখে যাওয়া তিনি ঠিকই, কিন্তু মিষ্টি আর নিরীহ এক নারী। অবিশ্যি তাঁর ধরনটা সাফোর মতই তা সত্যি; সাফোর মতই তাঁর আঁচলে বাঁধা হয়ে ঘুরছিল আর চোখ দিয়ে গিলে খাচ্ছিল দুটো ভক্ত—একজন যুবক, অন্যজন বৃদ্ধ; কিন্তু তাঁর মধ্যে এমন একটা কিছু ছিল, যা তাঁর চতুষ্পার্শের ঊর্ধ্বে কাচগুলোর মাঝখানে তাঁর ভেতরে ছিল সাঁচ্চা হীরের টলটলে দ্যুতি। এ দ্যুতি ফুটত তাঁর সুন্দর, সত্যিই অবর্ণনীয় চোখে। গাঢ় বলয়ে ঘেরা এ চোখের ক্লান্ত সুন্দর, সত্যিই অবর্ণনীয় চোখে। গাঢ় বলয়ে ঘেরা এ চোখের ক্লান্ত অথচ সেইসাথে কামাতুর দৃষ্টি সবাইকে অভিভূত করত তার পরিপূর্ণ অকপটতায়। সে চোখের দিকে তাকিয়ে প্রত্যেকের মনে হত সে তাঁর সব কিছু জেনে ফেলেছে আর তা জেনে তাঁকে না ভালোবেসে পারছে না। আন্নাকে দেখে তাঁর মুখখানা আনন্দের হাসিতে জ্বলজ্বল করে উঠল।
‘আহ্ কি খুশি হলাম আপনাকে দেখে!’ আন্নার কাছে গিয়ে তিনি বললেন, ‘কাল ঘোড়াদৌড়ের মাঠে আমি যেই ভাবছিলাম যে আপনার কাছে যাব, ইচ্ছেই না আমার হয়েছিল। সত্যিই ভয়ংকর, তাই না?’ আন্নার দিকে যে দৃষ্টিতে তাকিয়ে তিনি বললেন, মনে হল তাতে তাঁর সমস্ত অন্তর উদ্ঘাটিত হয়ে আছে।
‘হ্যাঁ, ওটা আমাকে অত বিচলিত করবে ভাবতে পারিনি’, আন্না বললেন লাল হয়ে।
এই সময় লোকজনের উঠে দাঁড়াল বাগানে যাবার জন্য।
‘আমি যাব না’, হেসে আন্নার পাশে বসে লিজা বললেন, ‘আপনিও যাবেন না? কি যে এমন শখ ক্রকেট খেলার!’
‘কিন্তু আমার ভালো লাগে’, আন্না বললেন।
‘এই দেখুন, আচ্ছা কি করে আপনার একঘেয়ে লাগে না? আপনাকে দেখেই মেজাজ ভালো হয়ে যায়। আপনি বেঁচে আছেন, আর আমার একঘেয়ে লাগে।’
‘একঘেয়ে মানে? আপনার তো পিটার্সবুর্গের সবচেয়ে ফুর্তিবাজ সমাজ’, আন্না বললেন।
‘হয়ত যারা আমাদের সমাজের নয়, তাদের একঘেয়ে লাগে আরো বেশি : কিন্তু আমরা, আমি তো নিশ্চয়ই ফুর্তি পাই না, সাঙ্ঘাতিক একঘেয়ে লাগে।’
সিগারেট খেয়ে সাফো যুবক দুটোর সাথে চলে গেলেন বাগানে। বেত্সি আর স্ত্রেমভ রয়ে গেলেন চায়ের জন্য। ‘একঘেয়ে মানে?’ বেত্সি বললেন, ‘সাফো বললে যে কাল আপনাদের ওখানে সবাই খুব আনন্দ করেছে। ‘উঃ, কি যে ক্লান্তকর লেগেছিল!’ বললেন লিজা মের্কালোভা, ‘ঘোড়দৌড়ের পর আমরা সবাই আমাদের ওখানে যাই। সেই একই পুরানো কাসুন্দি! সেই একই ব্যাপার। সারা সন্ধে এলিয়ে রইলাম সোফায়। এতে ফুর্তির কি আছে? না বলুন, কেমন করে আপনি একঘেয়ে লাগতে দেন না?’ আবার তিনি ফিরলেন আন্নার দিকে, ‘আপনার দিকে তাকালেই বোজা যায় এ মহিলা সুখী বা অসুখী হতে পারেন। কিন্তু একঘেয়ে ওঁর লাগে না। শিখিয়ে দিন-না সেটা আপনি করেন কি করে।’
‘কিছুই করি না’, নাছোড়বান্দা প্রশ্নগুলোয় লাল হয়ে জবাব দিলেন আন্না।
‘এই হল যে সেরা পদ্ধতি’, কথোপকথনে ঢুঁ মারলেন স্ত্রেমভ।
বছর পঞ্চাশেক বয়স প্রেমভের, আধপাকা চুল, দেখতে এখনো তাজা, খুবই অসুন্দর চেহারা, কিন্তু মুখখানায় চরিত্র ও বুদ্ধির ছাপ। লিজা মের্কালোভা তাঁর স্ত্রীর ভাইঝি, স্ত্রেমভ তাঁর গোটা অবসর সময়টা কাটাতেন লিজার সাথে। আন্না করেনিনার সাথে দেখা হওয়ায় চাকরি ক্ষেত্রে কারেনিনের শত্রু হলেও স্ত্রেমভ চেষ্টা করলেন শত্রুর স্ত্রীর প্রতি সাতিশয় সৌজন্যপরবশ হতে।
‘কিছুই করি না’, সূক্ষ্ম হেসে তিনি খেই ধরলেন, এটাই সেরা উপায়। আমি বহুদিন থেকে আপনাকে বলছি’, লিজা মেকালোভার দিকে ফিরলেন তিনি, ‘একঘেয়ে যাতে না লাগে তার বন্যে দরকার একঘেয়ে লাগবে কথাটা না ভাবা। এটা হল অনিদ্রার আশংকা থাকলে গুম হবে না, এই ভয়টা না করার মত। এই কথাটাই আন্না আর্কাদিয়েভনা আপনাকে বললেন ‘
‘ও কথাটা আমি বলতে পারলে খুবই খুশি হতাম। কারণ ওটা শুধু বুদ্ধিমানের মত বলা হয়েছে তাই নয়, কথাটা সত্যিও’, হেসে আন্না বললেন।
কিন্তু ধরুন কেন ঘুম আসে না, একঘেয়ে না লেগে পারা যায় না?’
‘ঘুম আনাতে হলে কাজ করতে হয়, মনে ফুর্তি আনতে হলেও কাজ করতে হয়।’
‘কেন আমি কাজ করব যখন আমার কাজে কারো দরকার নেই? আর ইচ্ছে করে ফুর্তির ভান করব, সে আমি পারিও না, চাইও না। ‘
‘আপনি সংশোধনের বাইরে’, লিজার দিকে না তাকিয়ে স্ত্রেমভ বললেন এবং আবার ফিরলেন আন্নার দিকে 1 আন্নার সাথে কালেভদ্রে দেখা হয়ে বলে উনি তাঁকে ছেঁদো কথা ছাড়া অন্য কিছু বলতে পারতেন না, কিন্তু কবে তিনি পিটার্সবুর্গে ফিরছেন, কাউন্টেস লিদিয়া ইভানোভনা তাঁকে কেমন ভালোবাসেন, এই ধরনের ছেঁদো কথাগুলো বললেন এমন ভাব করে যে বোঝা গেল তিনি সর্বান্তঃকরণে আন্নার প্রীতি অর্জনে এবং তাঁর প্রতি নিজের শ্রদ্ধা এমন কি বেশি কিছু প্রদর্শনে ইচ্ছুক।
