বেত্সির চোখ হেসে উঠল, মন দিয়ে তিনি দেখলেন আন্নাকে। বললেন, ‘নতুন ধরন-ধারন, সবাই ওরা ওটা রপ্ত করেছে। চুলোয় দিয়েছে সমর্কর্তা। তবে চুলোয় দেবারও তো রকম আছে।’
‘হ্যাঁ, কিন্তু কালুজ্স্কির সাথে লিজার সম্পর্কটা কেমন?
বেত্সি হঠাৎ মজা পেয়ে বাঁধ ভাঙা হাসি হেসে উঠলেন যা তাঁর ক্ষেত্রে ঘটে কদাচিৎ।
‘আপনি প্রিন্সেস মিয়াগ্কায়ার এলাকায় দখল গাড়ছেন। এটা যে এক সাংঘাতিক শিশুর প্রশ্ন’, সংযত হতে চেয়েও তা না পেয়ে বেত্সি এক সংক্রামক হাসিতে ফেটে পড়লেন যেভাবে হাসে যে লোকেরা হেসে থাকে কদাচিৎ ‘ওঁদেরকেই জিজ্ঞেস করতে হয়’, বললেন তিনি হাসির অশ্রুজলের মধ্যে।
‘না, হাসবেন না বাপু’, অনিচ্ছাতেও হাসিতে সংক্রামিত আন্না বললেন, ‘কিন্তু আমি কখনো বুঝতে পারিনি এখানে স্বামীর ভূমিকাটা কি আমি বুঝি না।’
‘স্বামী? লিজা মের্কালোভার স্বামী তাঁর জন্যে কম্বল এনে দেন এবং সর্বদাই তাঁর খিদমতে প্রস্তুত। কিন্তু তা ছাড়া আসলে আর কি সেটা কেউ জানতে চায় না। জানেন তো, শালীন সমাজে লোকে সাজসজ্জায় কোন কোন খুঁটিনাটি নিয়ে কিছু বলেও না, ভাবেও না। এক্ষেত্রেও ব্যাপারটা তাই।’
প্রসঙ্গটা পালটাবার জন্য আন্না জিজ্ঞেস করলেন, ‘রোলান্দাকির উৎসবে আপনি যাচ্ছেন?’
‘সম্ভবত না’, এবং বান্ধবীর দিকে না তাকিয়ে বেত্সি সুগন্ধি চা ছোট ছোট স্বচ্ছ পেয়ালায় সাবধানে ঢালতে লাগলেন। একটা পেয়ালা আন্নার দিকে এগিয়ে দিয়ে তিনি মেয়েদের একটা সিগারেট নিয়ে রুপোর খাপে ঢুকিয়ে তা ধরালেন।
‘কি জানেন, আমার অবস্থাটা সৌভাগ্যের বলতে হবে’, চায়ের কাপ হাতে নিয়ে এবার না হেসে শুরু করলেন বেত্সি, ‘আমি আপনাকেও বুঝি, লিজাকেও বুঝি। লিজা হল গে সহজসরল স্বভাবের তেমন একটা লোক, বাচ্চাদের মত যে বোঝে না কোনটা ভালো, কোনটা খারাপ। অন্তত বোঝেনি যখন তার বয়স ছিল খুবই অল্প। এখন সে জানে যে এই না বোঝাটা তাকে মানায়। এখন সে হয়ত ইচ্ছে করেই বুঝতে চায় না’, সূক্ষ্ম হেসে বেত্সি বললেন, ‘তাহলেও ওটা তাকে মানায়। মানে, একটা জিনিসকেই শোকাবহ দৃষ্টিতে দেখে যন্ত্রণা পাওয়া সম্ভব আবার সহবভাবে, এমন কি ফূর্তি করেই সেটা দেখা চলে। আপনার ঝোঁক হয়ত বড় বেশি শোকাবহ দৃষ্টিতে দেখা।’
‘আমি নিজেকে যেমন জানি, অন্যদেরও ঠিক তেমনি করে জানার কি যে ইচ্ছে আমার’, আন্না বললেন গুরুত্ব সহকারে, চিন্তিতভাবে, ‘অন্যদের চেয়ে আমি খারাপ নাকি ভালো? আমার মনে হয় খারাপ।’
‘সাঙ্ঘাতিক শিশু সাঙ্ঘাতিক শিশু’, পুনরাবৃত্তি করলেন বেত্সি, ‘নিন, ওরা এসে গেছে।
আঠারো
শোনা গেল পদশব্দ, পুরুষের গলা, তারপর নারীকণ্ঠ আর হাসি, এর পর ঢুকলেন প্রত্যাশিত অতিথিরা : সাফো শ্টোস এক স্বাস্থ্যের আধিক্যে জ্বলজ্বলে এক যুবাপুরুষ, যাকে ডাকা হয় ভাস্কা বলে। দেখে বোঝা যাচ্ছিল যে ভেতরে রক্ত রেখে বর্জিত গোমাংস, কন্দ-ছত্রাক আর বার্গান্ডি সুরা তাঁর উপকারে লেগেছে। মাথা নুইয়ে মহিলাদের দিকে তাকাল ভাস্কা, কিন্তু শুধু এক সেকেন্ডের জন্য। সাফোর পিছু পিছু সে গেল ড্রয়িং-রুমে আর সেখানে তাঁর পিছু পিছুই ঘুরতে লাগল যেন আঁচলে বাঁধা, চকচকে চোখ তার সরছিল না তাঁর ওপর থেকে, যেন তাঁকে সে খাবে। সাফো পোসের চুল সোনালী, চোখ কালো। হাই-হিল জুতোয় ছোট ছোট ক্ষিপ্র পদক্ষেপে তিনি ভেতরে এসে মহিলাদের করমর্দন করলেন সজোরে, পুরুষালী ঢঙে।
আন্না আগে কখনো এই নতুন অসামান্যকে দেখেননি, চমৎকৃত হলেন তাঁর রূপে, বেশভূষার চূড়ান্তপনায়, ব্যবহারের অসংকোচে। নিজের এবং অপরের কোমল সোনালি কেশে রচিত তাঁর কবরী এতই বৃহৎ যে আয়তনে সেটা তাঁর সুঠাম, অতি অনাবৃত, সুডৌল, স্ফীত উরসের সমান। এগোবার ভঙ্গিটা তাঁর এতই প্রখর যে প্রতিটি গতিতেই গাউনের তল থেকে ফুটে উঠছিল জানু ও উরুর রূপরেখা এবং আপনা থেকেই মনে আসছিল ওপরে অত আনগ্ন আর পেছনে ও নিচে এত লুকানো ওঁর সত্যিকারের সুঠাম দেহটার শেষ কোথায়।
বেত্সি তাড়াতাড়ি করে এলেন আন্নার সাথে ওঁর পরিচয় করিয়ে দিতে।
‘ভাবতে পারেন, দুজন সৈনিককে আমরা প্রায় চাপা দিতে যাচ্ছিলাম’, সাথে সাথেই উনি চোখ মটকে, হেসে, পোশাকের পুচ্ছদেশ ঝাঁকিয়ে, সেটাকে বড় বেশি এক পাশে টেনে এনে বলতে শুরু করলেন, ‘আমি, ভাস্কার সাথে যাচ্ছিলাম…আরে হ্যাঁ, আপনাদের তো পরিচয় নেই’, এই বলে তিনি ভাস্কার উপাধি জানিয়ে যুবাপুরুষটির পরিচয় দিলেন এবং নিজের ভুলে, মানে অপরিচিতিদের সামনে ওকে তার ডাকনামে ‘ভাস্কা’ বলেছেন বলে লাল হয়ে হেসে উঠলেন।
ভাস্কা আরেকবার মাথা নোয়াল আন্নার উদ্দেশে, কিন্তু কিছু বলল না। সাফোকে সে বলল হেসে : ‘বাজি হেরেছেন। আমরা এসেছি আগে। পাওনা মেটান।’
সাফো আরো ফুর্তিতে হেসে উঠলেন। বললেন, ‘এখনই তো আর নয়।’
‘বেশ, পরে পাব।’
‘ঠিক আছে, ঠিক আছে। আরে যাঃ!’ গৃহকর্ত্রীর দিকে ফিরলেন তিনি, বেশ লোক আমি…ভুলে গিয়েছিলাম…একজন অতিথি নিয়ে এসেছি আপনার এখানে। এই যে সে।’
অপ্রত্যাশিত যে যুবক অতিথিটিকে নিয়ে এসে সাফো তার কথা ভুলে দিয়েছিলেন, সে কিন্তু এতই গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি যে তার আপ্যায়নে উভয় মহিলাই উঠে দাঁড়ালেন।
