কেন এটা তিনি বললেন যা এক সেকেন্ড তিনি ভাবেননি, সেটা তিনি বুঝে উঠতে পারলেন না। বললেন শুধু এই একটা চিন্তা থেকে যে ভ্রন্স্কি যেহেতু এখানে আসবেন না, তাই এখান থেকে ছাড়ান পেয়ে যেমন করে হোক তাঁর সাথে দেখা করার ব্যবস্থা করতে হবে। কিন্তু কেন ঠিক বৃদ্ধা ফ্রেলিনা ভ্রেদে’র কথাই বললেন যাঁর কাছে যাওয়া নাকি তাঁর প্রয়োজন যেমন প্রয়োজন আরো অনেকের কাছে যাবার, সেটা তিনি বোঝাতে পারতেন না, তবে পরে যা দেখা গেছে, ভ্রন্স্কির সাথে দেখা করার সবচেয়ে ধূর্ত উপায়ের কথা ভাবতে গিয়ে এর চেয়ে ভালো কিছু খুঁজে পেতেন না তিনি।
মন দিয়ে আন্নার মুখ লক্ষ্য করে বেত্সি বললেন, ‘না, আপনাকে আমি ছাড়ব না কিছুতেই। সত্যি, আপনাকে ভালো না বাসলে আমি রাগই করতাম আপনার ওপর। আপনি যেন ভাবছেন যে আমার আন্ডায় মিশলে আপনার মান খোয়া যাবে। ছোট ড্রয়িং-রুমটায় আমাদের চা দাও তো’, খানসামাদের সাথে কথা বলার সময় বরাবর তিনি যা করেন তেমনি চোখ কুঁচকে বললেন তিনি। তার কাছ থেকে নোটটা নিয়ে পড়লেন। ফরাসিতে বললেন, ‘আলেক্সেই চাল মেরেছে, লিখেছে আসতে পারবে না।’ কথাটা তিনি বললেন এমন সহজ স্বাভাবিক সুরে যেন ক্রকেটের খেলুড়ে ছাড়া ভ্রন্স্কি আন্নার কাছে অন্য তাৎপর্য ধরে এমন চিন্তা তাঁর মাথাতেই আসতে পারে না।
আন্না জানতেন যে বেত্সি সবই জানেন, কিন্তু তাঁর উপস্থিতিতে উনি যেভাবে ভ্রন্স্কির কথা বলতেন তা শুনে আন্না সব সময়ই মিনিট খানেকের জন্য নিঃসন্দেহ হতেন যে বেত্সি কিছুই জানে না।
‘আ!’ উদাসীনভাবে আন্না বললেন যেন এ নিয়ে তাঁর বিশেষ আগ্রহ নেই; তারপর হেসে যোগ দিলেন, আপনার সমাজে এলে কারো মান খোয়া যেতে পারে কেমন করে?’ কথার এই মারপ্যাচ, গোপন কথাটা লুকিয়ে রাখা সমস্ত নারীর মত আন্নার কাছেই উপাদেয় লাগত। লুকাবার আবশ্যকতা নয়, যার জন্য লুকানো হল তার উদ্দেশ্যটার জন্যও নয়, গোপন করার ব্যাপারটাই আকৃষ্ট করত তাঁকে। বললেন, ‘আমি পোপের চেয়েও তো আর বেশি ক্যাথলিক হতে পারি না। স্ত্রেমভ আর লিজা মের্কালোভা সমাজের ননীর অধিক ননী। তা ছাড়া সর্বত্র তাঁরা বরণীয়, আর আমি’, ‘আমি’ কথাটায় একটা বিশেষ জোর দিলেন তিনি, ‘আমি কখনো কড়া কি অসহিষ্ণু হতে পারি না। স্রেফ সে সময়ই নেই আমার।’
‘না, আপনি হয়ত চান না যে স্ত্রেমভের সাথে আপনার দেখা হোক? উনি আর কারেনিন নয় লাঠালাঠি করুন কমিটিতে, আমাদের সাথে তার কোন সম্পর্ক নেই। কিন্তু সমাজে আমি যতদূর জানি তার ভেতর স্ত্রেমভ সবচেয়ে সজ্জন ব্যক্তি আর ক্রিকেট খেলার নিদারুণ ভক্ত। আপনি নিজেই দেখবেন। আর লিজার বৃদ্ধ প্রণয়ী হিসেবে তাঁর অবস্থাটা হাস্যকর হলেও কিভাবে তিনি এই হাস্যকর অবস্থাটা থেকে বেরিয়ে আসেন তা দেখবার হমোত! ভারি মিষ্টি লোক সাফো শ্টোসকে আপনি চেনেন? নতুন, একেবারে নতুন ধরনের মানুষ।’
‘বেত্সি যখন এসব কথা বলে যাচ্ছিলেন, আন্না তখন তাঁর ফুর্তিবাজ বুদ্ধিমন্ত চাউনি থেকে টের পাচ্ছিলেন যে উনি তাঁর অবস্থাটা অংশত বুঝতে পারছেন এবং মতলব আঁটছেন কিছু একটা। ওঁরা ছিলেন ছোট্ট কেবিনেটটায়।
‘কিন্তু আলেকসেইকে চিঠি লিখে পাঠানো দরকার’, টেবিলের সামনে বসলেন তিনি, কয়েক ছত্র লিখে লেফাফায় পুরলেন, ‘লিখলাম ও যেন ডিনারে আসে। আমার এখানে একজন মহিলা ডিনারে থাকছেন পুরুষ সঙ্গী ছাড়া। দেখুন তো, চিঠিটা প্রত্যয়জনক হল কি? মাপ করবেন, এক মিনিটের জন্যে আপনাকে ছেড়ে যেতে হচ্ছে। আপনি দয়া করে সীল মেরে পাঠিয়ে দিন চিঠিটা’, দরজার কাছ থেকে উনি বললেন, ‘আমার ওদিকে কিছু হুকুম-টুকুম দেবার আছে।’ এক মুহূর্ত ও চিন্তা না করে আন্না বেত্সির চিটিটা নিয়ে বসলেন এবং না পড়ে নিচে লিখে দিলেন, আপনার সাথে দেখা করার দরকার আছে আমার। ভেদের বাগানে আসুন। আমি সেখানে থাকব ছ’টার সময়।’ সীল মারলেন তিনি আর ফিরে এসে বেত্সি আন্নার সমক্ষেই পাঠিয়ে দিলেন চিঠিটা।
আর সত্যিই, ঠাণ্ডা ছোট্ট ড্রয়িং-রুমটায় টেবিল-ট্রেতে করে যে চা আনা হয়েছিল তা নিয়ে অতিথিদের আগমনের আগে যে cosy chat-এর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন প্রিন্সেস ভেস্কায়া তা জমে উঠল দুজন মহিলার মধ্যে। যাদের আশা করা হচ্ছে, শুরু হল তাদের নিয়ে পরচর্চা, উঠল লিজা মের্কালোভার প্রসঙ্গ।
আন্না বললেন, ‘উনি ভারি মিষ্টি, সব সময়ই ওঁকে ভালো লেগেছে আমার।’
‘ওঁকে আপনার ভালোবাসা উচিত। আপনাকে নিয়ে উনি পাগল। কাল ঘোড়দৌড়ের পর উনি এসেছিলেন আমার কাছে, আপনাকে না দেখতে পেয়ে হতাশ হয়ে উঠেছিলেন। উনি বলেন, আপনি উপন্যাসের এক খাঁটি নায়িকা, যদি উনি পুরুষ হতেন, তাহলে আপনার জন্যে হাজার খানেক আহাম্মকি করতেন তিনি। স্ত্রেমভ তাঁকে বলেন যে এমনিতেই সেটা নাকি তিনি করছেন।
‘আচ্ছা বলুন তো, আমি কখনো ঠিক বুঝতে পারিনি’, কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আন্না এমন সুরে জিজ্ঞেস করলেন যে, পরিষ্কার বোঝা গেল যে কোন অলস প্রশ্ন এটা নয়, যে প্রশ্ন তিনি করছেন সেটা যতখানি সমুচিত তার চেয়েও তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ। ‘বলুন, তো, প্রিন্স কালুজ্স্কি, যাঁকে লোকে বলে মিকা, তাঁর সাথে লিজার সম্পর্কটা কি? ওঁদের সাথে আমার দেখা হয়েছে কম। কি সম্পর্ক?’
