খানসামার পদশব্দ শুকে তাঁকে সম্বিত ফেরাতে হল। তার দিক থেকে মুখ আড়াল করে তিনি ভান করলেন যেন লিখছেন।
খানসামা জানাল, ‘পত্রবাহক জবাব চাইছে।’
‘জবাব? ও, হ্যাঁ’, আন্না বললেন, ‘খানিক অপেক্ষা করুক। আমি ঘণ্টি দিয়ে ডাকব।’
ভাবলেন, কি আমি লিখতে পারি? একা একা কি স্থির করতে পারি আমি? কি আমি জানি? কি আমি চাই? কি আমি ভালোবাসি?’ আবার তিনি অনুভব করলেন যে অন্তরের ভেতর তাঁর দ্বিত্ব শুরু হচ্ছে। এই অনুভূতিটায় আবার ভয় হল তাঁর এবং নিজের সম্পর্কে ভাবনা থেকে তাঁর মনোযোগ বিক্ষিপ্ত করতে পারে এমন যে উপলক্ষ প্রথম পেলেন, সেটাই আঁকড়ে ধরলেন। ‘আলেক্সেই-এর সাথে দেখা করতে হবে’ (মনে মনে ভ্রন্স্কিকে তিনি এই নামেই ভাবতেন), ‘একলা সেই আমাকে বলতে পারে কি আমার করা উচিত। বেত্সির কাছে যাব, হয়ত সেখানে দেখা পাব তার’, নিজেকে তিনি বললেন, অথচ একেবারে ভুলে গিয়েছিলেন যে গতকালই যখন তিনি ভ্রসিস্কে বলেছিলেন যে তাহলে তিনিও যাবেন না। টেবিলের কাছে গিয়ে স্বামীকে লিখলেন : ‘আপনার চিঠি আমি পেয়েছি। আ।’ ঘণ্টি দিয়ে খানসামাকে ডেকে দিলেন সেটা।
ঘরে ঢুকতে আনুশ্কা বললেন, ‘আমরা যাচ্ছি না।’
‘একেবারেই না?’
উঁহু, মোটঘাট খুলো না, থাক কাল পর্যন্ত। আর গাড়িটাকে রেখে দাও। প্রিন্সেসের ওখানে যাব।’
‘কোন পোশাকটা আনব?’
সতেরো
প্রিন্সেস ভেস্কায়া আন্নাকে যে ক্রকেট পার্টিতে নিমন্ত্রণ করেছিলেন, তা হওয়ার কথা দুজন মহিলা আর তাঁদের অনুরক্তদের নিয়ে। মহিলা দুজন বাছাই করা নতুন এক পিটার্সবুর্গ চক্রের প্রতিনিধি, যাকে কিছু-একটা অনুকরণের অনুকরণে ফরাসি ভাষায় বলা হত ‘পৃথিবীর সপ্তাশ্চর্য’। এই মহিলারা অবশ্য সেই উচ্চ চক্রেরই লোক, কিন্তু আন্না যে চক্রে যাতায়াত করতেন তার প্রতি বিদ্বেষপরায়ণ। তাছাড়া লিজা মেকালোভার অনুরক্ত বৃদ্ধ স্লেভ, পিটার্সবুর্গের একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি, কর্মক্ষেত্রে ছিলেন কারেনিনের শত্রু। এসব বিবেচনা করে আন্না যেতে চাননি, প্রিন্সের ভেস্কায়ার চিরকুটটা ছিল এই অনিচ্ছা প্রসঙ্গেই। এখন কিন্তু ভ্রন্স্কির দেখা পাবার আশায় তাঁর যেতে ইচ্ছে হল।
প্রিন্সেস ভেস্কায়ার ওখানে আন্না অন; অতিথিদের আগেই এলেন।
আন্না যখন ঢুকছিলেন কামের-ইউঙ্কারের মত আঁচড়ানো গালপাট্টায় ভ্রন্স্কির খানসামাও ঢুকছিল তখন। দরজার কাছে থেমে টুপি খুলে সে পথ ছেড়ে দিল আন্নাকে। আন্না তাকে চিনতে পারলেন আর কেবল তখনই তাঁর মনে পড়ল যে গতকাল ভ্রন্স্কি বলেছিলেন যে আসবেন না। নিশ্চয় এই বিষয়েই লিখে পাঠিয়েছেন তিনি।
প্রবেশ-কক্ষে তাঁর ওপরের আচ্ছাদন খুলে রাখার সময় তিনি শুনতে পেলেন যে খানসামা কামের-ইউঙ্কারের মত এমন কি র্-র্ উচ্চারণ করেই, ‘কাউন্ট পাঠিয়েছেন প্রিন্সেসকে’ বলে চিরকুটটা দিল।
আন্নার ইচ্ছে হয়েছিল জিজ্ঞেস করে—কোথায় ওর মনিব। ইচ্ছে হয়েছিল ফিরে যাবেন, ভ্রন্স্কিকে চিঠি পাঠিয়ে বলবেন তাঁর ওখানে আসতে অথবা নিজেই যাবেন তাঁর কাছে। কিন্তু কোনটাই করা গেল না : ততক্ষণে সামনে বেজে উঠেছে তাঁর আগমন ঘোষণার ঘণ্টি, প্রিন্সেস ভেস্কায়ার খানসামা খোলা দরকার কাছে তাঁর দিকে আধখানা ফিরে দাঁড়িয়ে আছে তিনি ভেতরের ঘরগুলোয় যাবেন বলে।
প্রিন্সেস বাগানে আছেন। এখনই আপনার আসার খবর দেওয়া হবে তাঁকে। বাগানে যেতে আপনি ইচ্ছে করেন কি?’ অন্য একটা ঘরে অন্য একজন খানসামা জানাল তাঁকে।
অনিশ্চয়তা, অস্পষ্টতার অবস্থাটা দাঁড়াল ঠিক বাড়ির মতই, বরং আরো খারাপ কেননা কিছুই করার নেই, ভ্রন্স্কির সাথে দেখা হবে না, থাকতে হবে এখানেই, পরের বাড়িতে, তাঁর মেজাজের অতি বিপরীত প্রকৃতির একটা আড্ডায়; কিন্তু তিনি সাজগোজ করে এসেছেন আর জানতেন যে সেটা মানিয়েছে তাঁকে; তিনি একলা নন, চারপাশে আলস্যের এক অভ্যস্ত জমকালো পরিস্থিতি, বাড়ির চেয়ে এখানেই তিনি স্বস্তি বোধ করবেন বেশি; কি করা যায় সেটা তাঁকে ভাবতে হবে না। সবই এখানে হয়ে যায় আপনা থেকেই। সাদা একটা পোশাকের সৌষ্ঠবে চোখ ধাঁধিয়ে বেত্সি তাঁর দিকে আসতে আন্না হাসলেন বরাবরের মত। প্রিন্সেস ভেস্কায়া এসেছিলেন তুকেভিচ আর তাঁর একজন আত্মীয়া ভদ্রকন্যাকে সাথে নিয়ে, নামকরা প্রিন্সেসের সাথে মেয়েটা গ্রীষ্মকালটা কাটাচ্ছে বলে তার মফস্বলবাসী পিতামাতার আনন্দের পরিসীমা ছিল না।
সম্ভবত আন্নার চেহারায় বিশেষ কিছু-একটা ছিল, কেননা বেত্সি তৎক্ষণাৎ লক্ষ্য করেছিলেন সেটা
‘ভালো ঘুম হয়নি’, যে খানসামাটা তাঁদের দিকে আসছিল আন্নার ধারণামত ভ্রন্স্কির নোটটা নিয়ে, তার দিকে তাকিয়ে ছিলেন আন্না।
‘আপনি এসেছেন বলে ভারি আনন্দ হল’, বেত্সি বললেন, ‘ক্লান্ত হয়ে উঠেছিলেন। এই এখনই ভাবছিলাম ওরা আসতে আসতে এক কাপ চা খেয়ে নিই গিয়ে। আর আপনি আশার সাথে গিয়ে ক্রিকেট গ্রাউন্ডটা পরখ করে দেখলে পারেন’, তুশকেভিচকে বললেন তিনি। ‘আর চা খেতে খেতে প্রাণ খুলে আমরা কথা বলে নিতে পারব। নিবিড়ভাবে আলাপ করা যাবে, তাই না?’ হেসে আন্নার দিকে ফিরে যে হাতটায় আন্না ছাতা ধরে ছিলেন তাতে মৃদু চাপ দিয়ে বললেন তিনি।
‘সেটা ভালোই হবে, কারণ আপনার এখানে বেশিক্ষণ থাকতে পারব না আমি, বৃদ্ধা ভ্রেদের কাছে যেতে হবে। একশ’ বছর ধরে কথা দিয়ে আসছি’, আন্না বললেন, মিথ্যা তাঁর প্রকৃতিবিরুদ্ধ হলেও সমাজে সেটা বেরিয়ে এল শুধু সহজে আর স্বাভাবিকভাবেই নয়, এমন কি তৃপ্তিই পেলেন তাতে।
