‘কি ব্যাপার, গিয়ে দেখে আয়’, এই বলে সব কিছুর জন্য প্রস্তুত হয়ে হাঁটুর ওপর হাত রেখে আন্না হেলান দিলেন চেয়ারে। খানসামা নিয়ে এল কারেনিনের লেখা একটা মোটা প্যাকেট।
খানসামা বললেন, ‘ঠিক আছে’, আর লোকটা চলে যেতেই কাঁপা কাঁপা আঙুলে খামটা ছিঁড়লেন। কাগজে আঁটা এক তাড়া ভাঁজ না করা নোট পড়ল তা থেকে। চিঠিটা বার করে তিনি পড়তে লাগলেন তার শেষ দিক থেকে ‘আপনার আসার জন্যে সমস্ত ব্যবস্থা আমি করে রেখেচি এবং আমার অনুরোধ পালনের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছি।’ শেষ থেকে গোড়ার দিকে তিনি এগিয়ে গেলেন এবং চিঠিটা পড়লেন প্রথম থেকে। পড়ে শেষ করে আন্নার মনে হল তাঁর শীত-শীত করছে, এমন একটা ভয়ংকর বিমর্ষতা তাঁকে পেয়ে বসল যা তিনি আশা করেননি।
সকালে তাঁর আফসোস হয়েছিল এজন্য যে স্বামীকে তিনি ব্যাপারটা বলেছেন, আর চাইছিলেন যেন কথাগুলো বলা হয়নি। এবং এই চিঠিতে মেনে নেওয়া হয়েছে যে কথাগুলো যেন বলানি, আর তিনি যা চাইছিলেন তার সুযোগ দিচ্ছে। কিন্তু তিনি যা কল্পনা করেন চিঠিটা এখন তার চেয়েও ভয়ংকর মনে হল।
‘সঠিক, সঠিক! সব সময়ই ও সঠিক বৈকি!’ মনে মনে আওড়ালেন তিনি, ‘খ্রিস্টান, মহানুভব ব্যক্তি! কি হীন, পাষণ্ড লোক! আমি ছাড়া এটা কেউ বোঝে না, বুঝবে না; আমি এটা বুঝিয়ে বলতে পারব না। সবাই বলে ও ধার্মিক নীতিপরায়ণ, সৎ, বুদ্ধিমান মানুষ; কিন্তু আমি যা দেখেছি তা ওরা দেখেনি। ওরা জানে না কিভাবে আট বছর ধরে সে আমার জীনকে দলিত করেছে, দলিত করেছে আমার ভেতরকার জীবন্ত সব কিছুকে, কদাচ ও ভাবেনি যে আমি একজন জীবন্ত নারী, যার প্রয়োজন ভালোবাসা। জানে না প্রতি পদক্ষেপে ও কিভাবে অপমান করেছে আমাকে আর আত্মতুষ্ট থেকেছে। আমি কি চেষ্টা করিনি, সর্বশক্তিতে চেষ্টা করিনি নিজের জীবনের ন্যায্যতা খুঁজে পেতে? আমি কি চেষ্টা করি না ওকে ভালোবাসতে, আর স্বামীকে ভালোবাসা অসম্ভব হয়ে উঠলে ছেলেকে ভালোবাসতে? কিন্তু সময় কাটতে আমি যে বুঝলাম যে আত্মপ্রতারণা আর সম্ভব নয়, আমি জীবন্ত মানুষ, ভালোবাসা আর বেঁচে থাকা আমার যে দরকার, আল্লাহ্ আমাকে সেভাবে যে গড়েছেন তার দোষ কি আমার? কিন্তু এখন কি করা যায়? ও যদি আমাকে খুন করত, ওকে খুন করত, তাহলে সব আমি সইতাত, সব কিছু মাফ করতাম, কিন্তু ও…
‘ও যে কি করবে তা আমি অনুমান করতে পারি নি কেমন করে? তাই ও করেছে যা ওর হীন চরিত্রের সাথে মেলে। ও হয়ে থাকবে সঠিক আর ধ্বংসোন্মুখ আমাকে আরো খাপ, আরো হীনভাবে ধ্বংস করবে…’
‘আপনি নিজেই কল্পনা করতে পারেন আপনার এবং আপনার পুত্রের ভাগ্যে কি আছে’, চিঠির এই পঙক্তিটা স্মরণ হল তাঁর। ‘ও যে ছেলেকে বেড়ে নেবে এটা তার হুমকি, এবং তাদের নির্বোধ নীতি অনুসারে এটা খুবই সম্ভব। কিন্তু আমি কি জানি না কেন এটা সে বলছে? আমার পুত্রস্নেহে তার বিশ্বাস নেই, কিংবা আমার এই হৃদয়াবেগে তার তাচ্ছিল্য আছে (সব সময়ই সে যেভাবে টিটকারি দিয়েছে), কিন্তু ও জানে যে ছেলেকে আমি ত্যাগ করব না, ছেলেকে ত্যাগ করতে পারি না; যাকে আমি ভালোবাসি এমন কি তার সাথেও জীবন কাটাতে আমি পারব না ছেলেকে ছাড়া, আর ছেলেকে ত্যাগ করে ওর কাছ থেকে পালিয়ে গিয়ে আমি সবচেয়ে কলঙ্কিতা পাষণ্ডা নারীর মত কাজ করব-এটা ও জানে এবং জানে যে আমার দ্বারা তা হওয়া সম্ভব নয়।’
‘আমাদের জীবন আগে যেমন চলেছে তেমনি উচিত’, মনে পড়ল তাঁর চিঠির আরেকটা বাক্য। ‘সে জীবন আগেও ছিল যন্ত্রণাকর, ইদানীং তা হয়েছিল ভয়াবহ। আর এখন কি হবে? আর ও এটা সবই জানে, জানে যে আমি বিশ্বাস নিচ্ছি, ভালোবাসছি এর জন্যে অনুতাপ করতে আমি পারি না; জানে যে মিথ্যা আর প্রতারণা ছাড়া এ থেকে আর কোন ফল হবে না; কিন্তু আমাকে কষ্ট দেওয়াটা চালিয়ে যাওয়া ওর দরকার। আমি চিনি ওকে; জানি যে পানির ভেতর মাছের মত ও মিথ্যার মধ্যে সাঁতরায় আর তাতে তৃপ্তি লাভ করে। না, এ তৃপ্তি আমি তাকে দেব না, ছিঁড়ে ফেলব মিথ্যার এই মাকড়শার জাল যাতে সে জড়াতে চায় আমাকে; যা হবার হোক। মিথ্যা আর প্রতারণার চেয়ে তা ভালো!
‘কিন্তু কিভাবে? আল্লাহ্! আল্লাহ্! আমার মত এমন অভাগা নারী কেউ ছিল কি কখনো?…’
না, ছিঁড়ে ফেলব, ছিঁড়ে ফেলব!’ অশ্রু রোধ করে লাফিয়ে উঠে চিৎকার করে উঠলেন তিনি। ওকে নতুন আরেকটা চিঠি লেখার জন্য গেলেন লেখার টেবিলের কাছে। কিন্তু অন্তরের গভীরে তিনি টের পাচ্ছিলেন যে কিছুই ছিঁড়ে ফেলার শক্তি হবে না তাঁর, আগের এই অবস্থাটা যতই মিথ্যাময় আর অসম্মানকর হোক তা থেকে বেরিয়ে আসার ক্ষমতা তাঁর হবে না।
টেবিলের সামনে বসলেন তিনি, কিন্তু লেখার বদলে টেবিলে হাত পেতে তার ওপর মাথা রেখে কেঁদে ফেললেন, সারা বুক ফুলিয়ে ফুলিয়ে ডুকরে উঠলেন যেভাবে কাঁদে শিশুরা। তিনি কাঁদলেন কারণ নিজের অবস্থাটা পরিষ্কার করে নেবার, সুনির্দিষ্ট করে নেবার স্বপ্ন তাঁর চূর্ণ হয়ে গেছে বরাবরের মত। আগে থেকেই তাঁর জানা আছে যে সবই থেকে যাবে পূর্বের মতই, থেকে যাবে বরং আগের চেয়েও অনেক খারাপ। তিনি অনুভব করলেন যে সমাজে তাঁর যে প্রতিষ্ঠা সকালে অতি তুচ্ছ মনে হয়েছিল সেটা তাঁর কাছে প্রিয়, স্বামীপুত্রত্যাগিনী, প্রণয়ীর সাথে মিলিতা এক নারীর কলংকিত অবস্থার সাথে সেটা বদলে নেবার ক্ষমতা তাঁর হবে না; যত চেষ্টাই তিনি করুন, নিজের চেয়ে শক্তিশালী তিনি হতে পারবেন না। প্রেমের স্বাধীনতা তিনি অনুভব করবেন না কখনো, সব সময়ই থাকবেন যেকোনো মুহূর্তে স্বরূপমোচনের বিপদ মাথায় নিয়ে এক পাতকিনী স্ত্রী যে স্বামীকে প্রতারণা করেছে অপরের সাথে এক কলংকজনক সম্পর্ক স্থাপনের জন্য, আর সে ব্যক্তি স্বাধীন, তাঁর সাথে তিনি একই জীবন যাপন করতে পারেন না। তিনি জানতেন যে ব্যাপারটা তাই-ই হবে আর সেটা এত ভয়ংকর যে কি তার পরিণাম সেটা কল্পনা করতে পারলেন না তিনি। অঝোরে তিনি কাঁদতে লাগলেন, শাস্তি পেলে বাচ্চারা যেভাবে কাঁদে।
