কাগজ-চাপার তল থেকে একটা কাগজ কজনিশেড দিলেন তার ভাইকে।
বিচিত্র, কিন্তু চেনা হস্তাক্ষরে লেখা চিরকুটটা লেভিন পড়লেন : বিনীত প্রার্থনা যে আমাকে শান্তিতে থাকতে দেওয়া হোক। আমার অমায়িক ভাইয়েদের কাছে আমার একটা মাত্র দাবি। নিকোলাই লেভিন।’
লেভিন এটা পড়লেন এবং হাতের চিরকুটটা থেকে মাথা না তুলে দাঁড়িয়ে রইলেন কজনিশেভের সামনে। হতভাগ্য ভাইয়ের ভুলে যাবার ইচ্ছা আর সেটা যে খারাপ এই চেতনার মধ্যে লড়াই চলছিল তার অন্তরে।
‘বোঝা যাচ্ছে, ও আমাকে অপমান করতে চায়’, বলে গেলেন কজনিশেভ, তবে আমাকে সে অপমান করতে পারে না আর আমি সর্বান্তঃকরণে ওকে সাহায্য করতে চাই, কিন্তু জানি যে সেটা হবার নয়।’
হ্যাঁ, হা’, পুনরুক্তি করলেন লেভিন, ‘আমি বুঝি, ওর প্রতি তোমার মনোভাবের কদর করি আমি; কিন্তু আমি যাব।’
‘তোর যদি ইচ্ছে হয়, যা, কিন্তু আমি সে পরামর্শ দেব না, কজনিশেভ বললেন, ‘মানে আমার দিক থেকে এতে আমার ভয় নেই, আমার সাথে তোর একটা ঝগড়া বাধিয়ে দিতে ও পারবে না, কিন্তু তোর জন্য বলছি, না যাওয়াই বরং ভালো। সাহায্য করা যাবে না। তবে কর তোর যা ইচ্ছে।’
‘সাহায্য হয়ত করা যাবে না, কিন্তু আমি অনুভব করছি, বিশেষ করে এই মুহূর্তে, তবে সেটা অন্য ব্যাপার আমি অনুভব করছি যে না হলে আমি শান্তি পাব না।
কজনিশেভ বললেন, এটা আমি বুঝি না। তারপর যোগ করলেন, ‘আমি শুধু এটা বুঝি যে এটা হীনতাবোধের একটা পাঠ। অন্য দিকে নিকোলাই এখন যা হয়ে দাঁড়িয়েছে তারপর যাকে বলা হয় নীচতা সেটাকে আমি প্রশ্রয়ের দৃষ্টিতেই দেখতে শুরু করেছি। জানিস কি সে করেছে…’
‘ওহ্ কি ভয়ানক, ভয়ানক!’ দু’বার কথাটা উচ্চারণ করলেন লেভিন।
কজনিশেতের চাপরাশির কাছ থেকে ভাইয়ের ঠিকানা পেয়ে লেভিন তখনই তার কাছে যাবার উপক্রম করছিলেন, কিন্তু খানিক ভেবে ঠিক করলেন ওটা সন্ধে পর্যন্ত মুলতবি রাখবেন। সেটা সর্বাগ্রে মনের প্রশান্তি পাবার জন্য, মস্কোয় যে কারণে এসেছেন সে ব্যাপারটার একটা ফয়সালা করা দরকার। ভাইয়ের কাছ থেকে লেভিন আসেন অবলোনস্কির অফিস এবং শ্যেরবাৎস্কিদের খবর পেয়ে যেখানে কিটিকে ধরা যাবে বলে অবলোনস্কি বললেন, রওনা দিলেন সেখানেই।
নয়
লেভিন বেলা চারটায় দুরুদুরু বুকে জু-পার্কের কাছে ভাড়া গাড়ি থেকে নামলেন এবং হাঁটা পথ দিয়ে চললেন টিবি আর স্কেটিং রিঙ্কের দিকে। নিশ্চিত ছিলেন যে, সেখানে কিটিকে পাওয়া যাবে। কেননা গেটের কাছে। শ্যেরবাৎস্কিদের গাড়ি দেখতে পেয়েছিলেন তিনি।
দিনটা পরিষ্কার। গেটের কাছে সারি বেঁধে গাড়ি, জে, কোচোয়ান, সিপাহী জ্বলজ্বলে রোদে টুপি ঝলকিয়ে গেটের কাছে আর খোদাই কাঠের ছোট ছোট রুশী কুটিরের মাঝখান দিয়ে পরিস্কৃত পথে গিজগিজ করছে পরিপাটী সব লোক। বাগানের আঁকড়া বুড়ো বাচগাছগুলো সমস্ত ডালপালায় বরফ ঝুলিয়ে যেন সমারোহের নববেশ ধারণ করেছেন।
হাঁটা পথ দিয়ে স্কেটিং রিঙ্কের দিকে যেতে যেতে নিজেকে তিনি বলছিলেন, ব্যাকুল হওয়া উচিত নয়, শান্ত থাকা দরকার। কি রে তুই? কি হল তোর? চুপ করে থাক, বোকাটা’, নিজের হৃদয়কে বললেন তিনি। আর যত তিনি শান্ত থাকার চেষ্টা করছিলেন, ততই নিঃশ্বাস তার আরো বন্ধ হয়ে আসছিল। দেখা হল একজন পরিচিতের সাথে, তাকে সে ডাকলে, কিন্তু লেভিন চিনতেই পারলেন না লোকটাকে। ঢিবির কাছে এলেন তিনি, সেখানে গড়িয়ে নামা আর টেনে তোলা ছোট ছোট খেলার স্নেজগুলোর শেকল ঝনঝন করছে, শব্দ তুলছে ছুটন্ত স্লেজ, শোনা যাচ্ছে খুশির কলরোল। আরো কয়েক পা এগোতে সামনে দেখা দিল স্কেটিং রিঙ্ক, যারা কেট করছে তাদের মধ্যে তখনই তিনি চিনতে পারলেন কিটিকে।
যে আনন্দ আর ভয় তার হৃদয়কে চেপে ধরেছিল, তা দিয়েই তিনি জেনে গেলেন যে সে এখানেই। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সে কথা বলছিল রিঙ্কের বিপরীত প্রান্তে একটা মহিলার সাথে। তার পোশাকে আর ভঙ্গিমায় বিশেষত্ব কিছু ছিল না বলেই মনে হবে; কিন্তু এই ভিড়ের মধ্যে লেভিনের পক্ষে ওকে সনাক্ত করা বিছুটি গাছের ঝোঁপ থেকে একটা গোলাপ ঠাহর করার মতই সহজ। সব কিছুই উজ্জ্বল করে তুলেছে সে। ও যেন এক হাসি যার কিরণ পড়ছে পরিপার্শ্বের ওপর। লেভিনের মনে হল, বরফের ওপর দিয়ে, ওখানে ওর কাছে আমি সত্যিই যেতে পারি কি? যেখানে সে দাঁড়িয়েছিল সে জায়গাটা লেভিনের কাছে মনে হল অনধিগম্য পবিত্র, এক সময় তিনি প্রায় ফিরেই যাচ্ছিলেন : এতই ভয় করছিল তার। নিজের ওপর জোর করে তাঁকে ভাবতে হল যে ওর আশেপাশে আসা-যাওয়া করছে নানান ধরনের লোক, এবং তিনি নিজেও সেখানে যেতে পারেন স্কেটিং করতে। নিচে নামলেন তিনি, সূর্যকে না দেখার মত করে তার দিকে দৃষ্টিপাত এড়িয়ে, কিন্তু না তাকিয়েও তিনি তাকে দেখতে পাচ্ছিলেন সূর্যের মত।
সপ্তাহের এই দিনটায়, এই সময়টায় জুটেছিল একই চক্রের লোকেরা, পরস্পর যারা পরিচিত। ছিল স্কেটিংয়ে যারা ওস্তাদ, নিজেদের ফলিয়ে বেড়াচ্ছিল, ছিল চেয়ার ধরে ভীরু ভীরু আনাড়ি ভঙ্গিতে স্কেটিং শিক্ষার্থী, ছিল শিশু আর স্বাস্থ্য রক্ষার উদ্দেশ্যে স্কেটিং-করা বৃদ্ধ; লেভিনের মনে হল সবাই তারা ভাগ্যের বরপুত্র, কেননা ওরা রয়েছে কিটির কাছাকাছি। যারা ফেট করছিল, সবাই যেন একেবারে নির্বিকার চিত্তে তার পাল্লা ধরছিল, তাকে ছাড়িয়ে যাচ্ছিল, এমন কি কথাও বলছিল তার সাথে আর একেবারেই তার অপেক্ষা না রেখেই খুশি হয়ে উঠছিল চমৎকার বরফ আর চমৎকার আবহাওয়ায়।
