তাড়াতাড়ি পোশাক পরে নিলেন তিনি, নিচে নেমে দৃঢ় পদক্ষেপে গেলেন খাবার ঘরে, যেখানে অপেক্ষা করছিল কফি এবং সেরিওজা ও গৃহশিক্ষিকা। আগাগোড়া সাদা পোশাকে টেবিলের কাছে আয়নার নিচে মাথা আর পিঠ নুইয়ে একান্ত মনোযোগের ভাব করে সেরিওজা কি যেন করছিল তার আনা ফুলগুলো নিয়ে। এ ভাবটা আন্নার চেনা, এতে তাকে দেখায় বাপের মত।
গৃহশিক্ষকার মুখখানা খুবই কঠোর। আর সেরিওজা যা প্রায়ই করে, ‘মা!’ বলে এক কর্ণভেদী চিৎকার তুলে থেমে গেল অনিশ্চিত হয়ে; ফুলগুলো ফেলে রেখে ছুটে যাবে মাকে সম্ভাষণ জানাতে নাকি মুকুট গাঁথাটা শেষ করে তারপর যাবে ফুল নিয়ে।
গৃহশিক্ষিকা সম্ভাষণ জানিয়ে সেরিওজা কি করেছে তার একটা বিশদ ও সুনির্দিষ্ট বিবরণ দিতে শুরু করলেন, কিন্তু আন্না সেটা শুনছিলেন না; তিনি ভাবছিলেন গৃহশিক্ষিকাকেও সাথে নেবেন কিনা। ‘নেব না’, স্থির করলেন তিনি, ‘আমি একলা যাব ছেলেকে নিয়ে।’
‘হ্যাঁ, খুব খারাপ’, বলে আন্না ছেলেকে তাকিয়ে দেখলেন কঠোর নয়, ভীরু-ভীরু দৃষ্টিতে যাতে খুশি হল ছেলে চুমু খেলেন তাকে। ‘ও আমার সাথে থাকুক’, বিস্মিত গৃহশিক্ষিকাকে এই বলে আন্না ছেলের হাত না ছেড়ে গিয়ে বসলেন কফির টেবিলে 1
‘মা, আমি…আমি…’, পিচটার জন্য কি তার কপালে আছে, মায়ের মুখভাব দেখে সেটা আন্দাজ করার চেষ্টা করে সেরিওজা বলল।
গৃহশিক্ষিকা চলে যেতেই আন্না বললেন, ‘সেরিওজা, খারাপ কাজ করেছিস তুই, কিন্তু আর কখনো করবি না তো? আমার তুই ভালোবাসিস?’
উনি টের পাচ্ছিলেন যে চোখে তাঁর পানি আসছে। ছেলের ত্রস্ত আর সেইসাথে উৎফুল্ল দৃষ্টি লক্ষ্য করে তিনি ভাবলেন, ‘ওকে না ভালোবেসে পারি কি? আমাকে শাস্তি দেবার জন্যে ও কি সত্যিই যোগ দেবে বাপের সাথে? আমার জন্যে মায়া হবে না?’ চোখের পানি গড়িয়ে আসতে শুরু, করেছিল, সেটা চাপা দেবার জন্য আন্না প্রায় দৌড়েই চলে গেলেন বারান্দায়
কয়েক দিনের বজ্রগর্ভ বৃষ্টির পর আবহাওয়া তখন ঠাণ্ডা, পরিষ্কার। আধৌত পল্লবের মধ্যে দিয়ে চুঁইয়ে আসা রোদেও বাতাস কনকনে।
ঠাণ্ডায় আর তাজা বাতাসে নতুন শক্তিতে যে আতঙ্ক তাঁকে পেয়ে বসছিল তাতে কেঁপে উঠলেন তিনি।
সেরিওজা তাঁর পিছু পিছু আসতে যাচ্ছিল। তাকে তিনি ‘যা, মারিয়েটের কাছে যা, বলে পায়চারি করতে লাগলেন বারান্দার খোড়ো মাদুরে। মনে মনে ভাবলেন, ‘সত্যিই কি ওরা করবে না আমাকে, বুঝবে না যে এ ছাড়া অন্য কিছু হতে পারত না?
থেমে গিয়ে ঠাণ্ডা রোদে ঝকঝকে ধৌত পাতা মেলা অ্যাম্পেন গাছের বাতাসে দোদুল্যমান চুড়োর দিকে তাকিয়ে তিনি বুঝলেন যে ওরা ক্ষমা করবে না, সবাই এবং সব কিছুই এখন তাঁর প্রতি হবে অনুকম্পাহীন, এই আকাশ, এই গাছপালার মতই। আবার তিনি অনুভব করলেন যে প্রাণের মধ্যে তাঁর দ্বিত্ব শুরু হয়েছে আবার। নিজেকে বললেন, ‘দরকার নেই, দরকার নেই ভাবার। যাবার জন্যে তৈরি হতে হবে। কোথায়? কখন? কাকে সাথে নিয়ে যাব? হ্যাঁ, মস্কোয়। সন্ধ্যার ট্রেনে। সাথে থাকবে আনুশ্কা, সেরিওজা আর নিতান্ত প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। কিন্তু আগে ওদের দুজনকে চিঠি লেখা দরকার।’ তাড়াতাড়ি তিনি বাড়িতে এলেন নিজের কেবিনেটে টেবিলের সামনে বসে লিখতে শুরু করলেন স্বামীকে :
‘যা ঘটেছে তারপর আমি আপনার বাড়িতে থাকতে পারি না। আমি চলে যাচ্ছি, সাথে নিচ্ছি ছেলেকে। আইন আমার জানা নেই, তাই জানি না মাতাপিতার মধ্যে কার কাছে সন্তান থাকবে; কিন্তু ওকে আমি নিয়ে যাচ্ছি কারণ ওকে ছাড়া আমি বাঁচতে পারি না। উদার হোন, ওকে থাকতে দিন আমার কাছে।’
দ্রুত এবং অন্তরের সাথে এ পর্যন্ত লেখার পর যে উদারতা কারেনিনের মধ্যে নেই বলে আন্নার ধারণা তার দোহাই দিতে গিয়ে এবং মর্মস্পর্শী কিছু-একটা বলে চিঠি শেষ করার জন্য থেমে গেলেন আন্না।
‘নিজের পাপ আর অনুতাপের কথা বলতে আমি অক্ষম, কেননা…’
ভাবনার পারম্পর্য খুঁজে না পেয়ে আবার থেমে গেলেন তিনি। মনে মনে বললেন, ‘না, কোন কিছুর দরকার
নেই।’ চিঠিটা ছিঁড়ে ফেলে উদারতার উল্লেখটা বাদ দিয়ে নতুন করে তা লিখে সীল মারলেন।
দ্বিতীয় চিঠিটা ভ্রন্স্কিকে লেখার কথা! ‘স্বামীকে আমি বলেছি’, এই পর্যন্ত লিখে অনেক সময় বসে রইলেন আন্না, আর বেশি লেখার শক্তি ছিল না তাঁর। এটা রূঢ়, নারীসুলভ নয়। ‘তা ছাড়া কি বা ওকে আমি লিখতে পারি?’ নিজেকে বললেন তিনি। আবার লজ্জায় মুখ তাঁর রাঙা হয়ে উঠল, মনে পড়ল তাঁর নিশ্চিন্ত ভাবের কথা, তাঁর প্রতি বিরক্তিতে শুরু করা চিঠিটা তিনি ছিঁড়ে ফেললেন কুটি কুটি করে। ‘কিছুরই প্রয়োজন নেই’, নিজেকে এই বলে লেখার জিনিসপত্র গুটিয়ে রেখে তিনি ওপরে গেলেন, গৃহশিক্ষিকা এবং চাকর-বাকরদের জানালেন যে আজই তিনি মস্কো যাচ্ছেন আর সাথে সাথে লেগে গেলেন জিনিসপত্র গোছগাছের কাজে।
ষোলো
জমাদার, মালী আর চাকর-বাকরেরা পল্লীভবনের সব কামরায় জিনিসপত্র নিয়ে হাঁটাহাঁটি করতে লাগল। আলমারি আর দেরাজগুলো খোলা, দু’বার তারা দোকানের গেল দড়ির জন্য; মেঝেতে ছড়ানো খবরের কাগজ। দুটো সিন্দুক, ঝোলাঝুলি আর বাঁধাছাঁদা কম্বল নিয়ে আসা হল বাইরের ঘরে। একটা আয়েসী আর দুটো ছেকড়া গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে গাড়ি-বারান্দার কাছে বাঁধাছাঁদার কাজে নিজের ভেতরকার উদ্বেগ ভুলে গিয়ে আন্না তাঁর কেবিনেটে টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে তাঁর যাত্রার থলে গোছাচ্ছিলেন, এমন সময় একটা গাড়ি আসার শব্দের দিকে তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করল আনুশ্কা। জানালা দিয়ে তাকিয়ে আন্না কারেনিনের বজ্রবাহককে দেখতে পেলেন, প্রবেশের দরজায় ঘণ্টি দিচ্ছিল সে।
