পরের দিন সকালে যখন তাঁর ঘুম ভাঙল, তখন প্রথম তাঁর যা মনে হল সেটা স্বামীকে কি কথা তিনি বলেছেন, আর সে কথাগুলো তাঁর কাছে এত ভয়ংকর লাগল যে ভেবে পেলেন না কি করে এই অদ্ভুত রূঢ় কথাগুলো উচ্চারণ করতে পেরেছিলেন তিনি আর এ থেকে কি দাঁড়াবে সেটা ঠাউরে উঠতে পারলেন না। কিন্তু কথাগুলো বলা হয়ে গেছে, কারেনিনও চলে গেলেন কিছু না বলে। ‘ভ্রন্স্কির সাথে দেখা হল কিন্তু কিছু বললাম না তাকে। যখন সে চলে যাচ্ছিল তখন ইচ্ছে হয়েছিল ওকে ডেকে ব্যাপারটা বলি, কিন্তু মত পালটালাম কেননা প্রথমেই ব্যাপারটা যে বলি নি সেটা অদ্ভুত। কেন আমি চেয়েছিলাম অথচ বললাম না?’ আর এই প্রশ্নের জবাবে লজ্জার রাঙা রঙে ছেয়ে গেল তাঁর মুখ। তিনি বুঝলেন কি তাঁকে এ থেকে আটকে রেখেছিল; বুঝলেন যে তাঁর গ্লানি বোধ হয়েছিল। তাঁর যে অবস্থাটা গতকাল সুস্পষ্ট মনে হয়েছিল, এখন তা লাগল শুধু অস্পষ্ট নয়, নিরুপায়ই। কলঙ্কের কথা ভেবে আতংক হল যা আগে তাঁর মনেই হল হয়নি। স্বামী কি করবে ভেবে ভয়াবহ দুশ্চিন্তা হল তাঁর। ধারণা হল, এখনই তত্ত্বাবধায়ক এসে বাড়ি থেকে বার করে দেবে তাঁকে, সারা দুনিয়ায় রটবে তাঁর কলঙ্ক। নিজেকে তিনি বললেন, বাড়ি থেকে বার করে দিলে কোথায় যাবেন তিনি, উত্তর পেলেন না।
ভ্রন্স্কির কথা যখন ভাবলেন, তখন তাঁর মনে হল সে তাঁকে ভালোবাসে না, তাঁকে তার ভার বোধ হতে শুরু করেছে, নিজেকে তিনি ওর কাছে নিবেদন করতে পারেন না আর সে জন্য তার প্রতি বিদ্বেষ বোধ করলেন তিনি। তাঁর মনে হল, স্বামীকে যে কথাগুলো তিনি বলেছেন এবং কল্পনায় অবিরত যার পুনরাবৃত্তি করছেন তা তিনি বলেছেন সবাইকে এবং সবারই কানে গেছে তা। যাদের সাথে তিনি থেকেছেন তাদের চোখের দিকে চাইতে তিনি অক্ষম। দাসীকে ডাকা বা নিচে নেমে ছেলে আর গৃহশিক্ষিকার কাছে যাবার সাহস হল না তাঁর।
দাসী অনেক আগে থেকেই কান পেতে ছিল দরজায়, নিজেই সে ঢুকল ঘরে। আন্না জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তার চোখের দিকে তাকিয়ে সভয়ে লাল হয়ে উঠলেন। দাসী ঘরে ঢুকেছে বলে মাপ চাইলে এই বলে যে তার মনে হয়েছিল যে তাকে ডাকা হয়েছে ঘণ্টি বাজিয়ে। পোশাক আর একটা চিরকুট নিয়ে এল সে। চিরকুটটা বেত্সির কাছ থেকে। তিনি স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন আজ সকারে তাঁর ওখানে লিজা মেকালোভা আর ব্যারনেস টোল্স আসছেন তাঁদের ভক্ত কালুজ্স্কি আর বৃদ্ধ স্ত্রেমভকে নিয়ে ক্রিকেট খেলার জন্য। ‘আসুন, অন্তত নৈতিকতা নিরীক্ষণ করার জন্যে। অপেক্ষায় রইলাম’, বলে শেষ করেছেন তিনি।
চিরকুটটা পড়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন আন্না।
আনুশ্কা ড্রেসিং-টেবিলে সেন্ট ইত্যাদির শিশি-বুরুশ রাখছিল। আন্না তাকে বললেন, ‘কিছু লাগবে না আমার, কিছু না। আমি এখুনি পোশাক পরে বেরোব। চলে যা। কিছুই চাই না আমার, কিছু না।’
আনুশ্কা বেরিয়ে গেল। কিন্তু আন্না পোশাক পরতে উঠলেন না, মাথা আর হাত নামিয়ে একই ভঙ্গিতে বসে রইলেন, শুধু মাঝে মাঝে সারা দেহ ঝাঁকিয়ে উঠছিলেন যেন কিছু একটা করার, কিছু একটা বলার জন্য, তারপর আবার নিথর হয়ে যাচ্ছিলেন। অনবরত তিনি বলে যাচ্ছিলেন, ‘হে আল্লাহ্! হে আল্লাহ্!’ কিন্তু ‘হে’ অথবা ‘আল্লাহ্’, কিছুরই কোন অর্থ ছিল না তাঁর কাছে। যে ধর্মে তিনি প্রতিপালিত তাতে তাঁর কোন অবিশ্বাস না থাকলেও তাঁর অবস্থা থেকে পরিত্রাণের জন্য ধর্মের সাহায্য প্রার্থনা তাঁর কাছে স্বয়ং কারেনিনের কাছ থেকে সাহায্য প্রার্থনার মত সমান বিজাতীয়। আগে থেকেই তাঁর জানা ছিল যে, ধর্মের সাহায্য সম্ভব কেবল যা তাঁর কাছে জীবনের সমগ্র অর্থ তা বিসর্জন দেওয়ার শর্তে। তাঁর শুধু কষ্ট হচ্ছিল তাই নয়, মনের যে নতুন অবস্থাটা তাঁর আগে কখনো হয়নি, তাতে আতংক হচ্ছিল তাঁর। মনে হচ্ছিল প্রাণের ভেতর সব কিছু দু’খানা হতে শুরু করে। মাঝে মাঝে তিনি ভেবে পাচ্ছিলেন না কিসে তাঁর আতংক, কি তিনি চান। যা ঘটেছে আর যা হবে সেটাতেই কি তাঁর ভয়, সেটাই কি তাঁর ইচ্ছা, নাকি ঠিক কি তিনি চান তা জানা ছিল না তাঁর।
‘উহ্, কি আমি করছি!’ মাথার দু’দিকে ব্যথা বোধ করে মনে মনে বললেন তিনি। সম্বিত ফিরে তিনি দেখলেন যে দুই হাতে তিনি চাঁদির চুল চেপে ধরেছেন। লাফিয়ে উঠে তিনি পায়চারি করতে লাগলেন।
‘কফি তৈরি, সেরিওজার সাথে মাদমোজেল অপেক্ষা করছেন’, আবার এসে এবং আন্নাকে সেই একই ভঙ্গিতে বসে থাকতে দেখে আনুশ্কা বলল।
‘সেরিওজা? কেমন আছে সে?’ হঠাৎ চকিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন আন্না, সারা সকালের মধ্যে এই প্রথম পুত্রের অস্তিত্বের কথা মনে পড়ল তাঁর।
‘ও খানিকটা দুষ্টমি করেছে মনে হয়’, হেসে জবাব দিলে আনুশ্কা।
‘কি দুষ্টুমি?’
‘পিচ ফলগুলো আপনার কোণের আলমারিতে ছিল; মনে হয় চুপি চুপি একটা ও খেয়েছে।’
যে নিরুপায় অবস্থার মধ্যে আন্না ছিলেন, ছেলের কথা মনে পড়িয়ে দেওয়ায় হঠাৎ সেখান থেকে বেরিয়ে এলেন তিনি। ছেলেকে নিয়েই মা বেঁচে থাকছে, অতিরঞ্জিত হলেও খানিকটা অপকট এই যে ভূমিকাটা তিনি ইদানীং নিয়েছেন সেটা মনে পড়ল তাঁর, এই ভেবে তাঁর আনন্দ হল যে অবস্থা তাঁর যাই হোক, স্বামী আর ভ্রন্স্কি প্রসঙ্গে যে অবস্থাতেই তিনি পড় ন, তা নিরপেক্ষ তাঁর একটা সার্বভৌমত্ব আছে। সে সার্বভৌমত্ব হল তাঁর ছেলে। যে অবস্থাতেই তিনি পড় ন, ছেলেকে তিনি ছাড়তে পারেন না। তাঁকে কলঙ্কিত করে বাড়ি থেকে বার করে দিক না তাঁর স্বামী, তাঁর প্রতি নিরুত্তাপ হয়ে নিজের স্বাধীন জীবন যাপন করতে থাকুক ভ্রন্স্কি (আবার তিক্ততা আর তিরস্কারের সাথে ভ্রন্স্কির কথা মনে হল তাঁর), ছেলেকে তিনি ছাড়তে পারবেন না। জীবনের রক্ষ্য তাঁর আছে। ছেলে প্রসঙ্গে তাঁর এই অবস্থাটা সুনিশ্চিত করা, তাকে যাতে কেড়ে না নেয় তার ব্যবস্থা করার জন্য সক্রিয় হতে হবে, সক্রিয় হতে হবে। সক্রিয় হতে হবে যথাসম্ভব সত্বর, ওকে কেড়ে নেবার আগেই। চলে যেতে হবে ছেলেকে সাথে নিয়ে। এখন এই একটা কাজ তাঁর করা দরকার। এই যন্ত্রণাকর অবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে শান্তি পেতে হবে তাঁকে। ছেলের ব্যাপারে একটা প্রত্যক্ষ কৰ্ম, তাকে নিয়ে এখনই কোথাও চলে যাবার কথা ভেবে তিনি সে শান্তি পেলেন।
