আ. কারেনিন
পুনশ্চ : চিঠির সাথে টাকা রইল, আপনার খরচার জন্য তা দরকার হতে পারে।’
চিঠিটা পড়ে দেখে তিনি সন্তুষ্ট হলেন, বিশেষ করে এই জন্য যে টাকাটা দেবার খেয়াল হয়েছিল তাঁর; কোন কড়া কথা বা তিরস্কার নেই, তাতে আবার প্রশ্রয়ও নেই। বড় কথা-প্রত্যাবর্তনের স্বর্ণসেতু পাতা গেল। চিঠি ভাঁজ করে হাতির দাঁতের মস্ত ইয়া বড় ছুরিতে তা পালিশ করে টাকাসহ তা খামে পুরলেন এবং নিজের টেবিলের চমৎকার সুব্যবস্থিত জিনিসপত্রগুলো ব্যবহার করতে তিনি সব সময় যে তৃপ্তি লাভ করতেন সেই তৃপ্তিতে ঘণ্টি বাজালেন।
‘পত্রবাহককে দিয়ে বলো যে, পল্লীনিবাসে আন্না আর্কাদিয়েভনাকে যেন পৌঁছে দেয় কালই’, বলে উঠে দাঁড়ালেন তিনি।
‘জ্বি আচ্ছা। কেবিনেটে চা আনব?’
কেবিনেটেই চা দিতে বললেন কারেনিন, ইয়া বড় ছুরিটা নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে গেলেন ইজি-চেয়ারটার কাছে, সেখানে বাতি তৈরি ছিল আর ছিল মিশরীয় লিপি সম্পর্কে পড়তে শুরু করা একটা ফরাসি বই। কেদারার ওপরে টাঙানো ছিল ডিম্বাকৃতি সোনালি ফ্রেমে বাঁধানো, নামকরা চিত্রকরের আঁকা আন্নার চমৎকার প্রতিকৃতি। কারেনিন তার দিকে তাকালেন। আন্নার দুর্ভেদ্য চোখ তাঁর দিকে তাকিয়ে আছে বেহায়ার মত উপহাসভরে, তাঁদের গত সন্ধ্যার আলাপের সময়কার মত। মাথার কালো লেস, কালো চুল, অপরূপ সাদা হাতের অনামিকায় আংটি, শিল্পী যা এঁকেছে অতি সুন্দর করে তা কারেনিন কাছে লাগল অসহ্য বেহায়া আর আস্ফালনের মত। ছবিটার দিকে এক মিনিট চাইতেই তিনি এমন চমকে উঠলেন যে ঠোঁট কেঁপে গিয়ে একটা ‘ব্রর’ শব্দ বেরুল। মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে তাড়াতাড়ি করে কেদারায় বসে বই খুললেন। পড়ার চেষ্টা করলেন, কিন্তু মিশরীয় লিপি সম্পর্কে আগে তাঁর যে সজীব আগ্রহ ছিল সেটা কিছুতেই ফিরিয়ে আনতে পারলেন না। বইটার দিকে তাকিয়ে থেকে তিনি ভাবতে লাগলেন অন্য কথা। স্ত্রীর কথা নয়, সম্প্রতি তাঁর রাষ্ট্রীয় ক্রিয়াকলাপে যে একটা জটিলতা দেখা দিয়েছে, চাকরিতে এখন যেটায় তাঁর প্রধান আগ্রহ, ভাবছিলেন তার কথা। তিনি অনুভব করছিলেন যে এই জটিল ব্যাপারটা তিনি আগে কখনো এতটা তলিয়ে দেখেননি, এবং মাথায় তাঁর—বড়াই না করে এ কথা তিনি বলতে পারেন—এসেছে একটা খাশা ভাবনা, তাতে ব্যাপারটার জট খুলবে, তাঁর উন্নতি হবে চাকরিতে, শত্রুদের ক্ষতি হবে, সুতরাং উপকার হবে রাষ্ট্রের। চা দিয়ে লোকটা ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেই কারেনিন গেলে লেখার টেবিলের কাছে। চলতি ব্যাপারগুলোর পোর্টফোলিওটা টেনে নিয়ে আত্মতৃপ্তির সামান্য লক্ষণীয় হাসিমুখে একটা পেনসিল বার করে সামনের আরেকটা জটিল ব্যাপারের আগে যে জটিল ব্যাপারটা কাগজগুলো তিনি চেয়ে পাঠিয়েছিলেন তা পড়ায় মগ্ন হয়ে গেলেন। জটিলতা হল এই। রাজপুরুষ হিসেবে কারেনিনের বৈশিষ্ট্য, যা পুরোগামী প্রতিটি ব্যক্তির থাকে, এবং যা শুধু তাঁর ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, একগুঁয়ে আত্মাভিমান, সংযম, সততা ও আত্মবিশ্বাসের সাথে মিলে যা তাঁর চাকরিভাগ্য গড়ে দিয়েছে সেটা হল কাগুজে আনুষ্ঠানিকতার প্রতি তাঁর তাচ্ছিল্য, লেখালেখি কমিয়ে আনা, যতদূর সম্ভব জীবন্ত ব্যাপারটার সাথে সরাসরি যোগাযোগ, এবং মিতব্যয়িতা। হয়েছিল এই যে ২ জুনের কমিশনে জারাইস্ক গুবের্নিয়ায় সেচকর্মের ব্যাপারটা ওঠে যা কারেনিন যে মন্ত্রিদপ্তরে আছেন তার অন্তর্ভুক্ত, এবং অপব্যয়ের নিষ্ফলতা ও কাজটার প্রতি কাগুজে মনোভাবের প্রখর দৃষ্টান্ত এটি। কারেনিন জানতেন যে ব্যাপারটা সত্যিই তাই। জারাইস্ক গুবের্নিয়ায় সেচের ব্যাপার শুরু করেছিলেন তাঁর পূর্ববর্তী পদাধিকারীর পূর্ববর্তী ব্যক্তি। এবং সত্যিই এই ব্যাপারে অনেক টাকা খরচ হয়েছে ও হচ্ছিল একেবারেই কোন কাজ না দিয়ে এবং স্পষ্টতই গোটা ব্যাপারটায় কোন ফল হতে পারে না। চাকরিতে গিয়ে কারেনিন তখনই সেটা বুঝেছিলেন এবং ভেবেছিলেন হস্তক্ষেপ করবেন; কিন্তু প্রথমটায় যখন তিনি পায়ের তলে তখনও বিশেষ শক্ত মাটি পাননি, তিনি জানতেন যে তাতে বড় বেশি লোকের স্বার্থে ঘা পড়বে, এবং কাজটা বিচক্ষণ হবে না; পরে তিনি অন্য কাজে ব্যস্ত থাকায় এ ব্যাপারটা স্রেফ ভুলেই যান। অন্য সমস্ত ব্যাপারের মত এটাও চলতে থাকে আপনা-আপনি, জাডোর শক্তিতে। (এতে অনেক লোকের খাওয়া জুটছিল, বিশেষ করে অতি নীতিপরায়ণ সঙ্গীতভক্ত একটা পরিবারের : ও বাড়ির সব মেয়েই তারযন্ত্র বাজাত। কারেনিন পরিবারটিকে জানতেন এবং বড় মেয়েদের একটার ধর্মবাপও হয়েছিলেন।) শত্রুভাবাপন্ন অন্য একটা মন্ত্রিদপ্তর যে ব্যাপারটা খুঁচিয়ে তুলেছে সেটা কারেনিনের মতে অসাধু। কেননা প্রতি দপ্তরেই এরকম ব্যাপার আছে যা চাকরির নির্দিষ্ট কতকগুলো কারণবশত কেউ খুঁচিয়ে তোলে না। এখন কিন্তু ওঁর দিকে যখন দ্বন্দ্ব্বাহ্বানের দস্তানা ছুঁড়েই ফেলা হল, তখন সেটা তিনি নির্ভয়ে লুফে নিলেন, এবং জারাইস্ক গুবের্নিয়ার সেচ-বিষয়ক কমিশনের কাজ দেখা ও যাচাই করার জ্য বিশেষ কমিশন নিয়োগের দাবি করলেন; এই ভদ্রলোকদের কোন ছাড়টাড় দেবেন না তিনি। আরো একটা বিশেষ কমিশন তিনি দাবি করলেন অরুশদের উন্নতির জন্য। ২ জুনের কমিটিতে অরুশ জাতির প্রশ্নটা এসেছিল নেহাৎ অকস্মাৎ, কিন্তু অরুশদের শোচনীয় অবস্থা আর বিলম্ব সইতে পারে না বলে কারেনিন সতেজে তা সমর্থন করেন। কমিটিতে প্রশ্নটা হয়ে দাঁড়ায় কয়েকটি মন্ত্রিদপ্তরের মধ্যে বচসার উপলক্ষ। কারেনিনের প্রতি যে দপ্তরটা শত্রুভাবাপন্ন ছিল, তারা প্রমাণ করে দিল যে অরুশদের অবস্থায় খুবই শ্রীবৃদ্ধি ঘটেছে, উন্নয়নের যে প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে তাতে সেটা ধ্বংসই পাবে আর খারাপ যদি কিছু থেকে থাকে তবে সেটা আসছে কারেনিনের মন্ত্রিদপ্তর কর্তৃক আইনসঙ্গত ব্যবস্থা চালু না করা থেকে। এবার কারেনিন স্থির করলেন যে দাবি করবেন : প্রথমত, নতুন একটা কমিশন গঠন যার ওপর ভার দেওয়া হবে অকুস্থলে গিয়ে অরুশদের অবস্থা তদন্ত করার; দ্বিতীয়ত, কমিটির হাতে যেসব সরকারী তথ্যাদি আছে তা থেকে অরুশদের অবস্থা যা দাঁড়ায় তাই যদি সত্যি হয়, তাহলে নতুন আরেকটা কমিশন গড়া হোক অরুশদের এই নিরানন্দ অবস্থাটা পর্যালোচনার জন্য : (ক) রাজনৈতিক, (খ) প্রশাসনিক, (গ) অর্থনৈতিক, (ঘ) নরকৌলিক, (ঙ) বৈষয়িক এবং (চ) ধর্মীয় দিক থেকে; তৃতীয়ত, অরুশরা বর্তমানে যে অসুবিধাজনক পরিস্থিতিতে আছে তা নিবারণের জন্য শত্রুভাবাপন্ন মন্ত্রিদপ্তরটি গত দশ বছরে কি ব্যবস্থা অবলম্বন করেছে তার বিবরণ দাবি করা হোক উক্ত মন্ত্রিদপ্তরের কাছে; অবশেষে চতুর্থত, ১৮৬৩ সালের ৫ ডিসেম্বর ও ১৮৬৪ সালের ৭ জুন তারিখের ১৭০১৫ ও ১৮৩০৮ নং যে দলিল কমিটিতে পেশ করা হয়েছে তা থেকে যা দেখা যাচ্ছে খণ্ড… ধারা ১৮ ও ৩৬ ধারার টীকার মৌলিক ও আঙ্গিক আইনের সরাসরি বিরোধিতা করে মন্ত্রিদপ্তর কেন কাজ করেছে তার কৈফিয়ত দাবি করা হোক। দ্রুত এই ভাবনার সংক্ষিপ্তসার টুকে রাখার সময় কারেনিনের মুখে ফুটে উঠল সঞ্জীবনের আভা। এক টুকরো কাগজে তিনি প্রয়োজনীয় তথ্য চেয়ে পাঠিয়ে উঠে দাঁড়ালেন এবং ঘণ্টি দিয়ে চিরকুটটা তাঁর দপ্তরের তত্ত্বাবধায়ককে দিতে বললেন। উঠে দাঁড়িয়ে ঘরে পায়চারি করতে করতে তিনি আবার তাকালেন আন্নার প্রকৃতির দিকে, ভুরু কুঁচকে হাসলেন ঘৃণাভরে। তারপরে মিশরীয় লিপির বইখানা পড়ে এবং তাতে আগ্রহ ফিরে আসার পর উনি ঘুমাতে গেলেন এগারোটার সময় আর বিছানায় শুয়ে শুয়ে স্ত্রীর ঘটনাটা স্মরণ করে—ব্যাপারটা মোটেই অতটা বিষাদের নয় বলে তাঁর মনে হল।
আন্না কারেনিনা – ৩.১৫
পনেরো
ভ্রন্স্কি যখন আন্নাকে বলেছিলেন যে তাঁর অবস্থাটা সম্ভবপর নয়, বুঝিয়েছিলেন স্বামীকে সব খুলে বলতে, তখন আন্না একগুঁয়ের মত ক্রুদ্ধ হয়ে ভ্রন্স্কির কথায় আপত্তি করলেও মনের গভীরে তিনি নিজের অবস্থাটা মিথ্যাময় ও অসাধু বলে টের পাচ্ছিলেন এবং সর্বান্তঃকরণে চাইছেলেন সেটা বদলাতে। ঘোড়দৌড় থেকে স্বামীর সাথে ফেরার পথে উত্তেজনার মুহূর্তে স্বামীকে যখন তিনি সব বলেন, তখন যন্ত্রণা বোধ করলেও এতে তিনি খুশি হয়েছিলেন। স্বামী তাঁকে ছেড়ে রেখে যাবার পর তিনি নিজেকে বোঝান যে তিনি এখন হাঁপ ছাড়লেন, এবার সব কিছু স্থির হয়ে যাবে। নিদেনপক্ষে মিথ্যা ও প্রতারণার কিছু থাকবে না। এবার অবস্থাটা চিরকালের মত স্থির হয়ে গেল, এটা তাঁর কাছে মনে হল সন্দোহতীত। নতুন এই অবস্থাটা খারাপ হতে পারে, কিন্তু তা হবে সুনির্দিষ্ট, অস্পষ্টতা বা মিথ্যা কিছু থাকবে না তাতে। কথাগুলো বলে নিজেকে আর স্বামীকে বা তিনি যে যন্ত্রণা দিয়েছেন তার ক্ষতিপূরণ হবে এই থেকে যে সব স্থিরীকৃত হয়ে যাচ্ছে, ভাবলেন তিনি। সেই সন্ধ্যাতেই ভ্রন্স্কির সাথে দেখা হয় তাঁর, কিন্তু তাঁর আর স্বামীর মধ্যে কি ঘটেছে সে কথা কিছুই বললেন না তিনি, যদিও অবস্থাটা স্থিরীকৃত করার জন্য তা বলা দরকার ছিল।
