‘আনুষ্ঠানিক বিবাহবিচ্ছেদ ছাড়াও কারিবানোভ, পাঙ্কুদিন আর ঐ ভালোমানুষ ড্রাম যা করেছে তা করা যায়, অর্থাৎ স্ত্রীর কাছ থেকে আলাদা হওয়া’, একটু শান্ত হয়ে ভাবতে লাগলেন তিনি; কিন্তু এ ব্যবস্থাটাও বিবাহবিচ্ছেদের মতই কলঙ্কের সমান অসুবিধা ঘটাবে, আর সবচেয়ে বড় কথা, ঠিক বিবাহবিচ্ছেদের মতই এটা স্ত্রীকে তুলে দেবে ভ্রন্স্কির আলিঙ্গেনে। ‘না, সে অসম্ভব, অসম্ভব!’ আবার কম্বল জড়াতে জড়াতে তিনি চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘অসুখী আমি হতে পারি না, কিন্তু সুখী হওয়া চলে না ওদের দুজনেরও।’
যে ঈর্ষা তাঁকে পীড়িত করছিল অনিশ্চিত থাকার সময়, স্ত্রীর কথায় সযন্ত্রণায় তাঁর দাঁত তুলে ফেলার সাথে সাথে তা চলে যায়। কিন্তু তার স্থান নেয় অন্য একটা জিনিস : স্ত্রী শুধু জয়বোধ করবে না তাই নয়, অপরাধের প্রতিফলও পাক, এই বাসনা। এই অনুভূতি সম্পর্কে তিনি সজ্ঞান ছিলেন না, কিন্তু মনের গভীরে তিনি চাইছিলেন যে তাঁর প্রশান্তি ও সম্মান নষ্ট করার জন্য স্ত্রী কষ্ট ভুগুক। এবং ডুয়েল, বিবাহবিচ্ছেদ আর পৃথক বসবাসের শর্তগুলো আবার পুনর্বিবেচনা ও বর্জন করে কারেনিন নিশ্চিত হয়ে উঠলেন যে উপায়ান্তর আছে কেবল একটা—যা ঘটেছে তা সমাজের কাছ থেকে লুকিয়ে আন্নাকে নিজের কাছে রাখা এবং তাঁর সাধ্যায়ত্ত সমস্ত ব্যবস্থা অবলম্বন করে ওঁদের যোগাযোগ বন্ধ করা আর প্রধান কথা—যার সম্পর্কে তিনি নিজেই সজ্ঞান ছিলেন না-আন্নাকে শাস্তি দেওয়া। ‘নিজের এই সিদ্ধান্ত আমাকে ঘোষণা করতে হবে যে পরিবারকে যে গুরুতর অবস্থায় সে ফেলেছে তাতে বাহ্যিক স্থিতাবস্থা ছাড়া অন্য সমস্ত ব্যবস্থাই হবে দু’পক্ষের ক্ষেত্রেই খারাপ, স্থিতাবস্থা আমি মেনে চলতে রাজি কিন্তু সে আমার ইচ্ছা, অর্থাৎ প্রণয়ীর সাথে সম্পর্ক বন্ধ করবে এই শর্তের কঠোর পালনে।’ এই সিদ্ধান্ত চূড়ান্তরূপে নিয়ে নেওয়ার পর তিনি আরো একটা গুরুত্বপূর্ণ যুক্তি পেলেন তার সমর্থনে। নিজেকে তিনি বললেন, ‘ধর্মমতে আমি চলতে পারব কেবল, এই সিদ্ধান্তেই, কেবল এই সিদ্ধান্তেই আমি পাতকী স্ত্রীকে ত্যাগ না করে তাকে সংশোধনের সুযোগ দেব আর এমন কি আমার পক্ষে যত কঠিনই হোক, নিজের শক্তির একাংশ ব্যয় করব তাকে সংশোধন করতে, বাঁচাতে। কারেনিন যদিও জানতেন যে, স্ত্রীর ওপর নৈতিক প্রভাবপাতে তিনি অক্ষন এবং সংশোধনের এসব চেষ্টা থেকে মিথ্যা ছাড়া আর কোন ফল হবে না; দুঃসহ এই মুহূর্তগুলোর কষ্ট ভোগের সময় যদিও তিনি একবারও ধর্মের শরণ নেননি, তাহলেও এখন তাঁর যা মনে হল, তাঁর সিদ্ধান্ত ধর্মীয় দাবির সাথে মিলে যাচ্ছে আর ধর্মের এই মঞ্জুরি তাঁকে দিল পরিপূর্ণ সন্তুষ্টি এবং আংশিক শান্তি। এ ভেবে তাঁর আনন্দ হল যে কেউ বলতে পারবে না যে জীবনের এমন একটা গুরুতর অবস্থাতে তিনি সে ধর্মের অনুজ্ঞা মেনে চলেননি, সাধারণ শীতলতা ও ঐদাসীন্যের মধ্যে যার পতাকা তিনি চিরকাল উচ্চে তুলে ধরেছেন। আরো খুঁটিনাটি বিচার করে কারেনিন দেখতেই পেলেন না কেন স্ত্রীর সাথে তাঁর সম্পর্ক আগের মতই থাকতে পারবে না। তার প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা তিনি যে কখনো ফিরিয়ে আনতে পারবেন না তাতে সন্দেহ নেই; কিন্তু স্ত্রী নষ্ট আর অবিশ্বস্তা বলে তিনি তাঁর জীবন পয়মাল করবেন, কষ্ট ভুগবেন, এর কোন কারণ নেই, থাকতেও পারে না। ‘হ্যা, সময় যাবে, সর্বদুঃখহর সময়, সম্পর্ক হয়ে উঠবে আগের মত, নিজেকে বোঝালেন কারেনিন, ‘মানে, তা এমন মাত্ৰায় যাবে যে আমার জীবনের ধারায় কোন বিশৃঙ্খলা বোধ করব না। ওর অসুখী হওয়ার কথা, কিন্তু আমার তো দোষ নেই, তাই আমি অসুখী হতে পারি না।’
চৌদ্দ
আলেক্সেই আলেক্সান্দ্রভিচ কারেনিন পিটার্সবুর্গ যেতে যেতে শুধু যে এ সিদ্ধান্তে অটল রইলেন তাই নয়, স্ত্রীকে যে চিঠি লিখবেন তার বয়ানও তিনি করতে লাগলেন মনে মনে। হলে ঢুকে মন্ত্রিদপ্তর থেকে আসা চিঠিপত্রগুলোর দিকে দৃষ্টিপাত করে তিনি হুকুম দিলেন সেগুলো তাঁর কেবিনেটে নিয়ে যাবার।
‘ঘোড়া সরিয়ে নাও, আর কারও আসা এখন বারণ’, খানসামার জিজ্ঞাসার জবাবে তিনি বললেন খোশমেজাজের লক্ষণস্বরূপ খানিকটা তৃপ্তির সাথে, ‘আসা বারণ’ কথাটায় জোর দিয়ে।
কেবিনেটে কারেনিন দু’বার এ-মোড় ও-মোড় হেঁটে লেখার বিরাট টেবিলটার কাছ থামলেন। তাঁর আগে আগে এসে সাজবরদার তাতে ছয়টা মোমবাতি জ্বালিয়ে দিয়ে গিয়েছিল। আঙুল মটকে কারেনিন চেয়ারে বসলেন, ঠিকঠাক করতে লাগলেন টেবিলের জিনিসপত্র। কনুইয়ে ভর দিয়ে তিনি এক মিনিট ভাবলেন তারপর এক মুহূর্ত না থেমে লিখতে শুরু করলেন। লিখলেন তিনি সম্বোধন না করে, ফরাসি ভাষায় আর ব্যবহার করলেন ‘আপনি’ সর্বনাম যা ফরাসিতে রুশ ভাষার মত অতটা নিরুত্তাপ নয়।
আমাদের শেষ কথাবার্তায় আমি কথাবার্তার বিষয় প্রসঙ্গে আমার সিদ্ধান্ত জানাবার সংকল্প জ্ঞাপন করেছিলাম। সব কিছু মনোযোগসহকারে ভেবে দেখে আমি এখন আমার প্রতিশ্রুতি পালনের জন্য লিখছি। আমার সিদ্ধান্ত এই : আপনার আচরণ যা হোক, ওপরওয়ালা যে বাঁধনে আমাদের বেঁধেছেন তা ছিন্ন করার অধিকার আমার নেই বলে আমি মনে করি। দম্পতিদের একজনের খামখেয়াল, স্বেচ্ছাচার এমন কি পাতকেও পরিবার ধ্বংস করা চলে না, এবং আমাদের জীবন আগে যেমন চলেছে তেমনি চলা উচিত। এটা আবশ্যক আমার জন্য, আপনার জন্য, আমাদের ছেলের জন্য। আমি সম্পূর্ণ নিশ্চিত যে এই চিঠির যা উপলক্ষ তার জন্য আপনি অনুতাপ করেছেন ও করছেন, এবং আমাদের মনান্তরের কারণ আমূল উৎপাটিত করে অতীতকে ভুলে যেতে আপনি আমাকে সহায়তা করবেন। বিপরীত ক্ষেত্রে আপনি নিজেই কল্পনা করতে পারেন আপনার এবং আপনার পুত্রের ভাগ্যে কি আছে। আশা করি, এসব নিয়ে সাক্ষাতে আরো বিশদ কথা হবে বলে। পল্লীবাসের মৌসুম যেহেতু শেষ হতে চলেছে, তাই আপনাকে অনুরোধ করি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব, মঙ্গলবারের মধ্যেই পিটার্সবুর্গে চলে আসতে। আপনার আগমনের জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত ব্যবস্থা করা থাকবে আপনাকে মনে রাখতে মিনতি করি যে আমার এ অনুরোধ পালনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব অর্পণ করছি আমি।
