‘দারিয়ালভ ডুয়েল লড়েছিল…’
তারুণ্যে কারেনিন ডুয়েলের ভাবনায় বিভোর হতেন ঠিক এই কারণেই যে, দৈহিক দিক থেকে তিনি ছিলেন ভীরু, এবং নিজেও সেটা ভালো জানতেন। নিজের দিকে উদ্যত একটা পিস্তলের কথা তিনি ভাবতে পারতেন না বিনা ত্রাসে, কোন হাতিয়ারই তিনি ব্যবহার করেননি জীবনে। এই ত্রাসই তরুণকেই ডুয়েলের কথা ভাবিয়ে নিজের জীবনকে বিপন্ন করতে হবে এমন একটা পরিস্থিতে নিজের শক্তি পরীক্ষার স্বপ্ন দেখিয়েছে। জীবনে সাফল্য ও পাকা চাকরি পেয়ে তিনি বহুকাল ওই অনুভূতিটা ভুলে গিয়েছিলেন; কিন্তু অভ্যস্ত অনুভূতিটারই জয় হল, দেখা গেল নিজের কাপুরুষতার জন্য আতংক এখনো এতই প্রবল যে কারেনিন অনেকখন ধরে ও সব দিক দিয়ে ডুয়েল লড়ার কথা ভাবলেন ও তাতে আচ্ছন্ন হলেন যদিও আগে থেকেই তাঁর জানা ছিল যে কোনক্রমেই তিনি লড়বেন না।
‘কোন সন্দেহ নেই, আমাদের সমাজ এখনও এত বুনো (ইংরেজরা যা নয়) যে অনেকেই’, আর এই অনেকের মধ্যে তাঁরাও পড়েন যাঁদের মতামতে কারেনিন বিশেষ মূল্য দিতেন, ‘ডুয়েলকে ভালো চোখে দেখেন। কিন্তু কি ফল হবে? ধরা যাক আমি ডুয়েলকে ডাকলাম’, মনে মনে তিনি ভেবে চললেন, আর ডুয়েলে ডাকার পর যে রাতটা তাঁর কাটবে, যে পিস্তলটা উদ্যত হবে তাঁর দিকে সে কথা কল্পনা করে কেঁপে উঠলেন তিনি, এবং টের পেলেন, এ কাজ কখনো তিনি করবেন, না ‘ধরা যাক, আমি ওকে ডুয়েলে ডাকলাম। ধরা যাক, আমাকে সব শিখিয়ে-পড়িয়ে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হল’, ভেবে চললেন তিনি, ‘আমি ট্রিগার টিপলাম’,–এই ভেবে তিনি চোখ বুজলেন, ‘দেখা গেল, আমি ওকে খুন করেছি’, মনে মনে ভেবে কারেনিন মাথা ঝাঁকালেন নির্বোধ ভাবনাটা অগিয়ে দেবার জন্য। ‘পাতকী স্ত্রী আর পুত্রের সাথে সম্পর্ক স্থির করে নেবার জন্যে নরহত্যার কি অর্থ হয়? স্ত্রীর ব্যাপারে কি করা হবে সেটাও আমাকে স্থির করতে হবে ঠিক ওভাবেই। কিন্তু যেটা আরো বিশ্বাস্য এবং যা অবশ্যই ঘটবে, সেটা হল—আমিই মারা যাব কিংবা আহত হব। আমি নির্দোষ একটা লোক, হব শিকার—নিহত বা আহত। এটা আরো অর্থহীন। তা ছাড়া আমার পক্ষ থেকে ডুয়েলে ডাকা হবে একটা কপট আচরণ। একি আমি আগেই জানি না যে আমার বন্ধুরা ডুয়েল লড়তে দেবে না—এটা হতে দেবে না যে রাশিয়ার জন্যে প্রয়োজনীয় এক রাজপুরুষের জীবন বিপন্ন হোক। কি দাঁড়াবে তাহলে? দাঁড়াবে এই যে ব্যাপারটা বিপদ পর্যন্ত গড়াবে না জেনে রেখেই আমি চ্যালেঞ্জ দিয়ে কিছু মিথ্যে বাহাদুরি দেখাতে চেয়েছিলাম। এটা অসাধু, এটা কপট, অন্যদেরকে এবং নিজেকে প্রতারণা। ডুয়েল অকল্পনীয়, আমার কাছ থেকে সেটা কেউ আশা করে না। আমার লক্ষ্য হল, বিনা বাধায় নিজের ক্রিয়াকলাপ চালিয়ে যাবার মত মান-সম্মান সুনিশ্চিত করা।’ রাজসেবার যে ক্রিয়াকলাপ কারেনিনের কাছে আগেও বেশ গুরুত্ব ধরত, সেটা তাঁর কাছে এখন অতি গুরুত্বপূর্ণ বলে প্রতীয়মান হল।
ভেবে-টেবে ডুয়েলের সংকল্প বাদ দিয়ে কারেনিন বিবাহবিচ্ছেদের কথা চিন্তা করল—যেসব পুরুষের কথা তাঁর মনে পড়ছিল তাঁদের কয়েকজন বেছে নেন এই দ্বিতীয় পদ্ধতিটি। বিবাহবিচ্ছেদের যত ঘটনা জানা আছে (তাঁর সুপরিচিত উচ্চ সমাজে এর সংখ্যা খুবই বেশি) তা সব বিচার করে কারেনিন এমন একটা ঘটনাও পেলেন না যার লক্ষ্য তিনি যা ভাবছিলেন সেরকম। এগুলোর প্রতিটি ক্ষেত্রে স্বামী বিশ্বাসঘাতিনী স্ত্রীকে স্রেফ ছেড়ে বা বেচে দিয়েছে আর অপরাধের কারণে যে পক্ষের বিয়ের কোন অধিকার ছিল না, সে একটা বানিয়ে নেওয়া, আপাত-বৈধ সম্পর্ক পেতেছে নতুন স্বামীর সাথে। নিজের ক্ষেত্রে কারেনিন দেখতে পেলেন যে একটা বৈধ বিচ্ছেদ, অর্থাৎ যাতে দোষী স্ত্রীই শুধু প্রত্যাখ্যাত হবে, সেটা অসম্ভব। তিনি দেখতে পেলেন যে জটিল যে পরিস্থিতিতে তিনি আছেন তাতে স্ত্রীকে দোষী সাব্যস্ত করার জন্য আইন যেসব স্থূল প্রমাণ দাবি করে তা জোগাড় করা সম্ভব নয়; দেখতে পাচ্ছিলেন যে এ সব প্রমাণ থাকলেও তাঁর জীবনের মার্জিত রুচি তা ব্যবহার করতে দেবে না, ব্যবহার করলে সমাজের কাছে স্ত্রীর চেয়ে তাঁরই ক্ষতি হবে বেশি।
বিবাহবিচ্ছেদ করতে গেলে দাঁড়াবে শুধু একটা কেলেঙ্কারি মামলা যা শুধু কুৎসা রটনা আর সমাজে তাঁর উচ্চ প্রতিষ্ঠার হানি ঘটানোর জন্য কাজে লাগবে তাঁর শত্রুদের। সবচেয়ে কম ভাঙচুরে নিজের অবস্থাটা স্থির করে নেওয়া— এই প্রধান লক্ষ্যটা বিবাহবিচ্ছেদেও সিদ্ধ হবে না। তা ছাড়া স্পষ্টই বোঝা যায় বিবাহবিচ্ছেদের, এমন কি তার চেষ্টা করলেও স্ত্রী স্বামীর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে যোগ দেবে তার প্রণয়ীর সাথে। এবং স্ত্রীর প্রতি তিনি এখন একটা সুঘৃণ ঐদাসীন্য বোধ করছেন বলে তাঁর মনে হলেও অন্তরে অন্তরে কারেনিন অনুভব করছিলেন শুধু একটা প্রবণতা—স্ত্রী অবাধে ভ্রন্স্কির সাথে মিলিত হতে পারবে, তার অপরাধই হবে তার কাছে লাভজনক, এতে অনিচ্ছা। এই একটা ভাবনাই তাঁকে এত উত্ত্যক্ত করছিল যে ব্যাপারটা কল্পনা করে বেদনায় ককিয়ে উঠলেন তিনি, দাঁড়িয়ে উঠে জায়গা বদল করলেন গাড়িতে, তারপর মুখ কুঁচকে অনেকক্ষণ ধরে কম্বলে তাঁর ঠাণ্ডা হাড্ডিসার পা ঢাকা দিতে লাগলেন।
