লেভিন মনে মনে বললেন, ‘না, সহজসরল শ্রমজীবী এই জীবন যত সুন্দরই হোক, তাতে ফেরা আমার পক্ষে অসম্ভব। আমি ভালোবাসি কিটিকে।’
তেরো
কারেনিনের নিতান্ত ঘনিষ্ঠ লোকেরা ছাড়া আর কেউ জানত না যে, বাইরে থেকে দেখলে এই যে মানুষটিকে অতি নিরুত্তাপ, যুক্তিনির্ভর ব্যক্তি বলে মনে হয় তাঁর একটা দুর্বলতা আছে যা তাঁর চরিত্রের সাধারণ আদলের বিরোধী অবিচলিত চিত্তে কারেনিন শিশু বা নারীর কান্না শুনতে ও চোখের পানি দেখতে পারতেন না। চোখের পানি দেখলে তিনি অস্থির হয়ে পড়তেন, চিন্তা করার ক্ষমতা তাঁর একেবারে লোপ পেত। তাঁর দপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক ও সচিব এটা জানতেন, প্রার্থিনীদের তাঁরা সাবধান করে দিতেন যে নিজেদের কাজ পণ্ড করতে না চাইলে কিছুতেই যেন তারা না কাঁদে। বলতেন, ‘উনি রেগে উঠবেন, আপনার কথা শুনবেন না।’ আর সত্যিই, চোখের পানি দেখে এসব ক্ষেত্রে তাঁর যে চিত্তবিকার হত তা প্রকাশ পেত দমকা একটা রাগে। ‘আমি পারব না, কিছুই করতে পারব না। দয়া করে ভাগুন তো!’ সাধারণত এসব ক্ষেত্রে চেঁচিয়ে উঠতেন তিনি।
ঘোড়দৌড় থেকে ফেরার সময় আন্না যখন ভ্রন্স্কির সাথে তাঁর সম্পর্কের কথা তাঁকে জানান আর তার পরেই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে কেঁদে ফেলেন, কারেনিন তখন তাঁর প্রতি বিদ্বেষ বোধ করলেও চোখের পানি সব সময়ই তাঁর ভেতর যে চিত্তবিকার জাগায় সেটা তিনি টের পাচ্ছিলেন। এটা জানা থাকায় এবং এই মুহূর্তে তাঁর মনোভাব প্রকাশ করাটা পরিস্থিতির সাথে খাপ খাবে না, তাও জানা থাকার তিনি চেষ্টা করলেন নিজের মধ্যে জীবনের সব প্রকাশ রুদ্ধ করে রাখতে, তাই নড়লেন না, তাকালেন না আন্নার দিকে। এই থেকেই দেখা দেয তাঁর সেই বিচিত্র, মৃত মুখভাব যা আন্নাকে অত স্তম্ভিত করেছিল।
বাড়িতে আসতে উনি গাড়ি থেকে নামতে সাহায্য করলেন আন্নাকে, কষ্ট করে অভ্যস্ত ভদ্রতা বজায় রেখে বিদায় নিলেন এবং যে কথাগুলো বললেন তা বলার কোন বাধ্যতা ছিল না; বললেন যে কাল তিনি তাঁর সিদ্ধান্ত জানাবেন। তাঁর সবচেয়ে নিকৃষ্ট সন্দেহ সমর্থিত হল স্ত্রীর যে কথায় তাতে নিষ্ঠুর যন্ত্রণা হল কারেনিনের। সে যন্ত্রণা আরো বেড়েছিল তাঁর চোখের পানিতে যে প্রত্যক্ষ অনুকল্পা বোধ করছিলেন তাতে। কিন্তু গাড়িতে একলা হবার পর কারেনিন অবাক হয়ে সানন্দে অনুভব করলেন যে, এই অনুকরণ আর ইদানীংকার সন্দেহ আর ঈর্ষা জ্বালা থেকে তিনি মুক্ত।
অনেক দিন থেকে যে দাঁতটা কষ্ট দিচ্ছে তা তুলে ফেললে লোকের যেমন লাগে তেমনি লাগল তাঁর। প্রচণ্ড যন্ত্রণা আর প্রকাণ্ড, নিজের মাথার চেয়েও বড় কি নিজের সৌভাগ্যে বিশ্বাসও করতে পারে না, হঠাৎ টের পায় যা একদিন তার জীবনকে বিষিয়ে দিচ্ছিল, সমস্ত মনোযোগ টেনে রাখছিল নিজের দিকে তা আর নেই, এখন সে আবার দিন কাটাতে, ভাবতে, আগ্রহী হতে পারবে শুধু তার দাঁতটা নিয়েয়ই নয়। এরকমেরই বোধ হল কারেনিনের। যন্ত্রণাটা হয়েছিল বিচিত্র আর ভয়ংকর, এখন আর নেই; তিনি অনুভব করলেন আবার তিনি দিন কাটাতেও ভাবতে পারবেন শুধু স্ত্রীর কথাই নয়।
নিজেকে তিনি বললেন, ‘সম্মান, নেই, হৃদয় নেই, ধর্ম নেই—নষ্ট মেয়ে! সব সময়ই তা জানতাম, সব সময় দেখতে পাচ্ছিলাম, যদিও তার ওপর করুণাবশে চেষ্টা করছিলাম আত্মপ্রতারণার।’ এবং সত্যিই তাঁর মনেহল যে তিনি সব সময়ই সেটা দেখতে পাচ্ছিলেন; এবং সত্যিই তাঁর মনে হল যে তিনি সব সময়ই সেটা দেখতে পাচ্ছিলেন; নিজেদের বিগত জীবনটার খুঁটিনাটি তিনি স্মরণ করতে লাগলেন, এ জীবন আগে তাঁর কাছে খারাপ মনে হয়নি, কিন্তু এসব খুঁটিনাটিতে পরিষ্কার প্রমাণ হল যে আন্না চিরকালই ছিলেন নষ্টা। ‘ওর সাথে নিজের জীবন জড়িয়ে ভূল করেছি আমি; কিন্তু এ ভুলে খারাপ কিছু নেই, তাই অসুখী আমি হতে পারি না। দোষ আমার নয়, ওর’, নিজেকে বললেন তিনি, ‘ওকে নিয়ে আমার দায় নেই কোন। ওর অস্তিত্বই নেই আমার কাছে…’
যেমন আন্নার প্রতি তেমনি তাঁদের ছেলের প্রতিও তাঁর মনোভাব বদলে গেছে, ওঁদের কি হবে তা নিয়ে তিনি আর ভাবছিলেন না। শুধু একটা প্রশ্ন নিয়েই তিনি ভাবিত, নিজের অধঃপতনের মধ্য দিয়ে আন্না যে নোংরা ছিটিয়েছেন তাঁর ওপর, সেটা সবচেয়ে ভালো, শোভন, নিজের পক্ষে সুবিধাজনক এবং সুতরাং সবচেয়ে ন্যায়সঙ্গত উপায়ে সাফ করতে আর নিজের সক্রিয়, সৎ, প্রয়োজনীয় জীবনের পথ ধরে চলতে থাকা যায় কিভাবে।
‘ঘৃণ্য এক নারী অপরাধ করছে বলে আমি অসুখী হতে পারি না; আমাকে যে কঠিন অবস্থায় সে ফেলেছে তা থেকে বেরিয়ে আসার সর্বোত্তম উপায় শুধু আমাকে পেতে হবে। আর সেটা আমি পাব’, ক্রমেই মুখ কোঁচকাতে কোঁচকাতে নিজেকে বলছিলেন তিনি, ‘আমিই প্রথমে নই, আমি শেষও নই।’
‘সুন্দরী হেলেন’ অপেরার ফলে যে মেনেলসের স্মৃতি সবার মনে তাজা হয়ে উঠেছিল তা থেকে শুরু করে অন্য সমস্ত ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত বাদ দিলেও কারেনিনের কল্পনায় ভেসে উঠতে লাগল উচ্চ সমাজে স্বামীর প্রতি স্ত্রীর বিশ্বাসঘাতকতার একসারি সাম্প্রতিক ঘটনা। ‘দারিয়ালাভ, পলতাভস্কি, প্রিন্স কারিবানোভ, কাউন্ট পাঙ্কুদিন, ড্রাম ….হ্যাঁ, ড্রামও, এমন সঃ কর্মিষ্ঠ মানুষ… সেমিওনভ, চাগিন, সিগোনিন’, স্মরণ করতে লাগলেন কারেনিন। ‘মেনে নিচ্ছি এসব লোকের কেমন একটা অবিবেচনাপ্রসূত টিটকারি জোটে, কিন্তু আমি এর ভেতর দুর্ভাগ্য ছাড়া আর কিছু দেখিনি। সব সময় সহানূভূতি বোধ করেছি ওদের জন্যে’, নিজেকে বোঝালেন কারেনিন, যদিও কথাটা ঠিক নয়, এই ধরনের দুর্ভাগ্যে তিনি সহানুভূতি বোধ করেননি কদাচ, আর স্বামীর প্রতি স্ত্রীর বিশ্বাসঘাতকতার দৃষ্টান্ত যত ঘন ঘন ঘটেছে ততই নিজেকে উঁচু মনে করেছেন তিনি। ‘এ দুর্ভাগ্য সকলেরই ঘটতে পারে। আমারও ঘটেছে। ব্যাপারটা হল সবচেয়ে উত্তম উপায়ে এটা সয়ে যাওয়া।’ আর ওঁর মত অবস্থায় পতিত লোকেরা কি করেছে তা তিনি বিশদভাবে খতিয়ে দেখতে লাগলেন।
