‘কিন্তু কি করব আমি? কিভাবে সেটা করব?’ গ্রীষ্মের এই ছোট রাতে যা কিছু তিনি ভেবেছেন, অনুভব করেছেন, চেষ্টা করলেন সেটা নিজের কাছেই প্রকাশ করার। যা কিছু তিনি ভেবেছেন, অনুভব করেছেন তা ভাগ হয়ে গেল পৃথক তিনটা ধারায়। একটা হল নিজের পুরানো জীবনকে, নিজের অকেজো জ্ঞানকে, সবার কাছে নিষ্প্রয়োজন তাঁর শিক্ষাকে বিসর্জন। এই ত্যাগটা থেকে তিনি তৃপ্তি পাচ্ছিলেন। তাঁর কাছে এটা সহজ, অনায়াস। অন্য ধারণা ও চিন্তাগুলো হল যে জীবন তিনি এখন কাটাতে চান তাই নিয়ে। সে জীবনের সহজাত, বিশুদ্ধতা আর ঔচিত্য তিনি পরিষ্কার টের পাচ্ছিলেন এবং নিঃসন্দেহ ছিলেন, যে তুষ্টি, প্রশান্তি আর মর্যাদার যে অভাবে তিনি অমন রুগ্নের মত ভুগছিলেন সেগুলো তিনি ওই জীবনে পাবেন। কিন্তু তাঁর তৃতীয় ধারার চিন্তাগুলো ঘুরে মরছিল এই প্রশ্নে : পুরানো জীবন থেকে নতুনে উত্তরণটা করা যায় কিভাবে। আর এ ব্যাপারে পরিষ্কার কিছুই তাঁর চোখে পড়ছিল না। ‘বিয়ে করব? কাজ এবং কাজের প্রয়োজনীয়তা রাখতে হবে? পক্রোভ্স্কয়ে ছেড়ে দেব? জমি কিনব? গ্রামসমাজে নাম লেখাব? বিয়ে করব কৃষাণীকে? কি করে এটা করা যায়?’ আবার নিজেকে প্রশ্ন করলেন তিনি এবং জবাব পেলেন না। ‘তবে সারা রাত তো আমি ঘুমাইনি, পরিষ্কার করে কিছু স্থির করা সম্ভব নয় এখন। পরে পরিষ্কার করে নেওয়া যাবে। শুধু একটা জিনিসে সন্দেহ নেই যে এই রাতটা স্থির করে দিল আমার ভাগ্য। পারিবারিক জীবন নিয়ে আমার সমস্ত কল্পনাগুলো বাজে, আসল জিনিস নয়’, নিজেকে বললেন তিনি, ‘এটা অনেক সহজসরল, অনেক ভালো…’
‘কি সুন্দর!’ আকাশের মাঝখানে ঠিক তাঁর মাথার ওপর অদ্ভূত, ঠিক যেন পেঁজা তুলো দিয়ে গাড়া ঝিনুকের একটা একটা দেখে মনে মনে ভাবলেন তিনি, ‘অপরূপ এই রাতটায় সবই কি অপরূপ! ওই ঝিনুকটা গড়ে উঠতে পারল কখন? এই কিছু আগেই আমি আকাশের দিকে তাকিয়েছিলাম, কিছুই তখন ছিলনা সেখানে, শুধু দুটো সাদা পাড় ঠিক এভাবেই জীবন সম্পর্কে আমারও দৃষ্টিভঙ্গি বদলে গেছে অলক্ষ্যে!’
মাঠ থেকে বেরিয়ে এসে তিনি চলতে লাগলেন গাঁয়ের দিকের বড় রাস্তাটা ধরে। জোর হাওয়া দিল, সব কিছু, হয়ে উঠল ধূসর বিষণ্ন।দেখা দিয়েছে সেই নিষ্প্রভ মুহূর্তটা যা উষার, তমসার ওপর জ্যোতির পূর্ণ বিজয়ের পূর্বাভাস দেয়।
শীতে কুঁকড়ে মাটির দিকে তাকাতে তাকাতে লেভিন যাচ্ছিলেন ক্ষিপ্র গতিতে। ঘণ্টির ঝুনঝুন শুনে লেভিন মাথা তুললেন, ভাবলেন, ‘কি ব্যাপার? কে যেন আসছে।’ যে বড় রাস্তা দিয়ে তিনি যাচ্ছিলেন, সেখানে তাঁর কাছ থেকে চল্লিশ পা দূরে চার ঘোড়ার এক গাড়ি আসছে তাঁর দিকে। শ্যাফটের ঘোড়াগুলো গাড্ডায় ঠেলা মারছিল শ্যাফটে কিন্তু নিপুণ কোচোয়ান বক্সে পাশকে ভাবে বসে শ্যাফট ধরে রাখছিল গাড্ডাতেই যাতে চাকাগুলো যেতে পারে দু’পাশের মসৃণ জায়গা দিয়ে।
শুধু এটুকু লক্ষ্য করে কে আসতে পারে সে কথা না ভেবে অন্যমনস্কের মত লেভিন তাকালেন গাড়িটার দিকে গাড়ির কোণে ঢুলছিলেন এক বৃদ্ধা আর জানালার কোণে, বোঝা যায় সদ্য নিদ্রোখিত একটা তরুণী বসে ছিল দু’হাতে সাদা টুপির রিবন ধরে। লেভিনের কাছে যা এখন বিজাতীয় সেই সুচারু ও জটিল অন্তর্জীবনের প্রতিমূর্তি, ভাস্বর চিন্তামগ্ন একটা মেয়ে লেভিনকে লক্ষ্য না করে দেখছিল সূর্যোদয়।
দৃশ্যটা যখন অন্তর্হিত হচ্ছিল, ঠিক সেই মুহূর্তে মেয়েটার সত্যসন্ধ দৃষ্টি পড়ল লেভিনের ওপর। আর তাঁকে চিনতে পেরে মুখ তার উদ্ভাসিত হয়ে উঠল বিস্মিত আনন্দে।
লেভিনের ভুল হতে পারে না। এরকম চোখ দুনিয়ায় শুধু এই একজোড়া। দুনিয়ায় শুধু এই একটা মানুষই আছে যে জীবনের সমস্ত আলো আর অর্থ কেন্দ্রীভূত করে তুলতে পারে লেভিনের কাছে। হ্যাঁ, সেই। মেয়েটা কিটি। লেভিন বুঝলেন যে রেলস্টেশন থেকে কিটি যাচ্ছে এগুশোভোতে। আর বিনিদ্র এই রাতটায় লেভিনকে যা আলোড়িত করেছিল, যেসব সিদ্ধান্ত তিনি নিয়েছিলেন, তা সবই হঠাৎ অন্তর্ধান করল। কৃষাণীকে বিয়ে করার যে কল্পনা তাঁর মনে এসেছিল, সেটা স্মরণ করে তাঁর বিতৃষ্ণা হল। শুধু ওখানে, দ্রুত অপসৃয়মান ওই যে গাড়িটা রাস্তার অন্য দিকে চলে গেছে, শুধু ওখানেই সম্ভব যে প্রহেলিকাগুলো ইদানীং তাঁকে পীড়িত ও পিষ্ট করছিল তার নিরসন।
কিটি আর ফিরে তাকায়নি। গাড়ির স্প্রিঙের আওয়াজ আর শোনা গেল না, সামান্য কানে আসছিল ঘোড়ার ঘণ্টি। কুকুরের ডাক থেকে বোঝা গেল গাড়ি গাঁয়ের মধ্যে—চারদিকে পড়ে রইল শুধু ফাঁকা মাঠগুলো, সামনের গ্রামটা আর তিনি নিজে, একাকী, সবার কাছে পর, পরিত্যক্ত বড় রাস্তাটা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন একাকী
যে ঝিনুকটা তাঁকে মুগ্ধ করেছিল, তাঁর আজকের রাতের ভাবনাধারাকে যা মূর্ত করে তুলেছিল, সেটা দেখার আশায় তিনি আকাশের দিকে তাকালেন। ঝিনুকের মত দেখতে কোন কিছুই তখন আর ছিল না। আকাশে। অনধিমগ্য ঐ উঁচুতে একটা রহস্যময় পরিবর্তন ঘটে গেছে। ঝিনুক নেই, তার বদলে আকাশের পুরো অর্ধেকটায় বিছিয়ে গেছে ক্রমেই ছোট ছোট হয়ে আসা কোদালে মেঘের টানা গালিচা। আকাশ নীল হয়ে ঝকঝক করছে, লেভিনের সপ্রশ্ন দৃষ্টির উত্তর সে দিল সেই একই কোমলতায়, কিন্তু সেই একই অনধিগম্যতায়।
