‘বিয়ে হয়েছে?’
‘খ্রিস্ট আবির্ভাবের তিথি থেকে আজ তিন বছর চলছে।’
‘তা বেশ, ছেলেপুলে আছে তো?’
কোথায় ছেলেপুলে! এক বছর তো কোন জ্ঞানগম্যিই ছিল না, লজ্জা পেত’, বুড়ো বলল, ‘তা বিচালি বটে বাপু! ধর একেবারে ভুরভুরে!’ বুড়ো প্রসঙ্গটা বদলাবার ইচ্ছার পুনরাবৃত্তি করল।
লেভিন মন দিয়ে লক্ষ্য করছিলেন ভাল্কা পারমেনভ আর তার বৌকে তাঁর কাছ থেকে সামান্য দূরে তোরা ঘাস বোঝাই করছিল গাড়িতে। ভান্কা পারমেনভ দাঁড়িয়ে ছিল গাড়িতে। তার তরুণী সুন্দরী গিন্নি দুই হাত দিয়ে ঘাস জড়ো করে ফর্ক দিয়ে তার বড় বড় যে ডাঁইগুলো নিপুণ ভঙ্গিতে তুলে দিচ্ছিল সেগুলো সে নিয়ে সমান করে বিছিয়ে পা দিয়ে মাড়াচ্ছিল। মেয়েটা কাজ করছিল অনায়াসে, ফুর্তি করে, ক্ষিপ্র ভঙ্গিতে। মাটিতে পড়ে থাকা ঘাস চট করে ফর্কে উঠছিল না। প্রথমে সে হাত দিয়ে গাদিটা ঝাঁকাচ্ছিল, তারপর ফর্ক ঢুকিয়ে দ্রুত, নমনীয় ভঙ্গিতে তার ওপর দেহের সমস্ত ভার দিয়ে তখনই লাল কোমরবন্ধে ঘেরা পিঠ টান করে সাদা ঝালবের তলেকার ভরা বুক এগয়ে দিয়ে ক্ষিপ্ৰ মুঠোয় ফর্ক চেপে ধরে ঘাস বৌকে রেহাই দেবার জন্য তাড়াতাড়ি করে দু’হাতে বাড়িয়ে তা ধরে ফেলে বিছিয়ে দিচ্ছিল গাড়িতে। আঁকশি দিয়ে শেষ ঘাসগুলো তুলে দিয়ে ঘাড়ে লেগে থাকা কুচিগুলো ঝেড়ে ফেলে সাদা যে কপালখানা রোদপোড়া নয়, তার ওপর কসে পড়া মাথার লাল রুমালটা ঠিক করে নিয়ে গাড়ির তলে ঢুকে পড়ল সে বোঝাটা বাঁধার জন্য। ভাকা ওকে বোঝাচ্ছিল কিভাবে বাঁধতে হবে আর ওর কি একটা মন্তব্যে হেসে উঠল হো-হো করে। উভয়েরই মুখভাবে দেখা যাচ্ছিল প্রবল, তরুণ, ইদানিং জেগে ওঠা প্রেম।
বারো
বোঝা বাঁধা হল। ভান্কা লাফিয়ে নেমে খাদ্যপরিতৃপ্ত তাগড়াই ঘোড়াটাকে চালাতে লাগল লাগাম ধরে। বৌ তার আঁকশি ছুঁড়ে দিল বোঝার ওপর, তারপর ফুর্তিতে পা ফেলে হাত দোলাতে দোলাতে চলে গেল মেয়েদের জলসায়। ভাকা রাস্তা পর্যন্ত গিয়ে যোগ দিলে অন্যান্য গাড়ির সারিতে। কাঁধে আঁকশি নিয়ে জ্বলজ্বলে রঙিন পোশাকে ফুর্তিতে কলরব করে মেয়েরা চলল গাড়িগুলোর পেছন পেছন। গান ধরল কর্কশ-উদ্দাম একটা নারীকণ্ঠ এবং ধুয়ায় পৌঁছানো পর্যন্ত তা গেয়ে গেল, তখন গোড়া থেকে তা আবার শুরু করল গোটা পঞ্চাশেক মিহি-মোটা, সুস্থ নানা গলা।
গান গাইতে গাইতে মেয়েরা এগিয়ে আসছিল লেভিনের দিকে আর তাঁর মনে হল ফুর্তির একটা বজ্রগর্ভ কালো মেঘ আছড়ে পড়ছে তাঁর ওপর। মেঘটা এগিয়ে এসে তাঁকে, ঘাসের যে গাদিটার ওপর তিনি শুয়ে ছিলেন সেটাকে, অন্যান্য গাদি আর গাড়িগুলোকে আর দূরের জমিটা সমেত গোটা মাঠখানাকে জাপটে ধরল আর চিৎকার করা, সিটি মারা উদ্দাম গানটার তালে তালে সব কিছু দুলতে লাগল, টিপটিপ করতে লাগল। বলিষ্ঠ এই ফুর্তিটায় ঈর্ষা হল লেভিনের। ইচ্ছে হল জীবনের আনন্দের এই উৎসারে যোগ দেন। কিন্তু কিছুই করতে পারেন না তিনি, তাঁকে শুয়ে থেকে, দেখে আর শুনে যেতে হবে। গীতমুখরিত লোকগুলো যখন দর্শন আর শ্রবণের বাইরে চলে গেল, তখন নিজের একাকিত্ব, নিজের দৈহিক আলস্য, এই জগৎটার প্রতি নিজের বিরূপতার জন্য একটা গুরুতের মনঃকষ্ট আচ্ছন্ন করল লেভিনকে।
বিচালি নিয়ে যে চাষীরা তাঁর সাথে তর্ক করেছিল সবচেয়ে বেশি তাদেরই কেউ কেউ, যাদের লেভিন নিজেই অপমান করেছিলেন তারা, যারা তাঁকে ঠকাতে চাইছিল সেই চাষীরাই এখন আনন্দ করে মাথা নোয়াচ্ছিল তাঁর উদ্দেশে, স্পষ্টতই তাঁর ওপর ওদের কোন রাগ ছিল না, থাকতেও পারে না, কোনরকম অনুতাপ তাদের মদ্যে দেখা গেল না শুধু নয়, লেভিনকে তারা যে ঠকাতে চেয়েছিল, সে কথাটা পর্যন্ত ভুল গিয়েছিল তারা। হাসি-খুশি সাধারণ শ্রমের সাগরে তলিয়ে গিয়েছিল সব কিছুটা। ভালো দিনটা দিয়েছেন আল্লাহ্, আল্লাহ্ দিয়েছেন শক্তি। দিন আর শক্তি উৎসর্গিত শ্রমে আর শ্রমটাই তার পুরস্কার। শ্রমটা কার জন্য? কি হবে তার ফল? এ ভাবনা অপ্রাসঙ্গিক এবং তুচ্ছ।
লেভিন প্রায়ই এই জীবনটাকে লক্ষ্য করতেন মুগ্ধ হয়ে আর সে জীবন যারা যাপন করছে তাদের প্রতি একটা ঈর্ষা বোধ করতেন তিনি, কিন্তু আজই প্রথম বার, বিশেষ করে তরুণী বৌয়ের প্রতি ভাল্কা পারমেনভের মনোভাবের ভেতর তিনি যা দেখলেন তার প্রভাবে এই প্রথম বার লেভিনের পরিষ্কার ধারণা হল যে কষ্টকর কর্মহীন কৃত্রিম, ব্যক্তিগত যে জীবনটা তিনি যাপন করছেন তাকে এই শ্রমশীল নির্মল, সার্বিক এক অপরূপ জীবনের পরিণত করা নির্ভর করছে তাঁরই ওপর।
যে বুড়ো লেভিনের পাশে বসেছিল, বহু আগেই বাড়ি চলে গেছে সে, চাষীরা ছড়িয়ে পড়ছে। যারা কাছে থাকে, তারা বাড়ি চলে গেল, দূরের লোকেরা নৈশাহার সেরে ওখানেই রাত কাটাবে বলে জড়ো হল মাঠের লোকগুলোর অলক্ষিতে লেভিন গাদিতে শুয়ে শুয়ে ওদের দেখা, কথা শোনা আর নিজের ভাবনা চালিয়ে যেতে লাগলেন। রাত কাটাবার জন্য যে লোকেরা মাঠে থেকে গিয়েছিল গ্রীষ্মের ছোট রাতে প্রায় ঘুমালই না তারা। প্রথমে কানে এল খেতে বসে ফুর্তির সাধারণ কথাবার্তা আর হাসি তারপর আবার গান আর হাসি।
ফুর্তি ছাড়া খাটুনির গোটা লম্বা দিনটা তাদের মধ্যে আর কোন চিহ্ন রেখে যায়নি। ভোরের আগে সব চুপচাপ হয়ে গেল। শোনা যাচ্ছিল শুধু জলায় ভেককুলোর ফোঁৎ-ফোঁৎ। টনক নড়তে লেভিন গাদি থেকে উঠে দাঁড়ালেন, তারার দিকে তাকিয়ে বুঝলেন রাত আর নেই।
