আর কোন বিষয়ে কথা তিনি বলতে বা ভাবতে পারছিলেন না, নিজের দুঃখের কথা লেভিনকে না বলে পারলেন না তিনি।
লেভিন দেখতে পাচ্ছিলেন যে ডল্লি মুষড়ে পড়েছেন, এতে মন্দ কিছু প্রমাণিত হয় না, সব ছেলেমেয়েই মারামারি করে, এই কথা বলে তাঁকে সান্ত্বনা দেবার চেষ্টা করলেন তিনি; কিন্তু সে কথা বললেও লেভিন মনে মনে ভাবছিলেন, ‘না, আমি ন্যাকামি করব না, নিজের ছেলেমেয়েদের সাথে কথা বলবই না ফরাসিতে। তবে ওই ধরনের ছেলেমেয়ে আমার হবে না; দরকার শুধু ছেলেমেয়েদের মাথা না খাওয়া, বিকৃত করে না তোলা, তাহলেই তারা হবে খাশা। উঁহু, অমন হবে না আমার ছেলেমেয়ে।’
বিদায় নিয়ে চলে গেলেন লেভিন। ডল্লি তাঁকে আর আটকালেন না।
এগারো
জুলাই মাসের মাঝামাঝি পক্রোভ্স্কায়ে থেকে বিশ ভার্স্ট দূরে তাঁর বোনের মহাল থেকে মণ্ডল এল ঘাস-কাটার হিসাবপত্র দাখিল করতে। বোনের সম্পত্তির প্রধান আয় ছিল সেচ জমির ঘাস। আগেকার কালে দেসিয়াতিনা পিছু বিশ রুব্ল দিলে চাষীরা ঘাস কাটত। লেভিন যখন সম্পত্তিটা দেখাশোনার ভার নেন, ঘাস-কাটা পর্যবেক্ষণ করে তিনি দেখলেন যে ওর দাম বেশি, দর ধার্য করলেন দেসিয়াতিনা পিছু পঁচিশ রুল। চাষীরা এ দর দিতে চায়নি এবং লেভিনের যা সন্দেহ ছিল, অন্যান্য খরিদ্দারদেরও তারা ভাগিয়ে দেয়। লেভিন তখন নিজে সেখানে গিয়ে ঘাস-কাটার ব্যবস্থা করেন একাংশে মজুর লাগিয়ে, একাংশে আধিয়ারি মারফত। নিজের চাষীরা সর্বোপায়ে এই নয়া ব্যবস্থা প্রতিবন্ধকতা করে, কিন্তু ব্যাপারটা চালু হয়ে যায় আর প্রথম বছরে ঘেসো মাঠ থেকে আয় হয় প্রায় দ্বিগুণ। তৃতীয় এবং গত বছরে চাষীদের প্রতিবন্ধকতা চলতেই থাকে আর ফসল তোলাও চলে একই ধারায়। এ বছর চাষীরা তেভাগায় সমস্ত ঘাস কাটার ভার নিয়েছে, মণ্ডল এসেছে এই কথা জানাতে যে ঘাস কেটে তোলা হয়েছে, গাছে বৃষ্টি নামে এই ভয়ে সে সেরেস্তার মহুরাকে ডেকে তার উপস্থিতিতে সব ভাগাভাগি করেছে, মালিককে দেওয়া হয়েছে এগারো গাদি। প্রধান মাঠটায় কত ঘাস তাড়াহুড়ো কেন, এসব প্রশ্নে উত্তরের অনির্দিষ্টতা এবং চাষীটার কথার সমস্ত সুর দেখে লেভিন বুঝলেন যে বিচালির এই ভাগাভাগিতে কিছু-একটা কারচুপি আছে, ঠিক করলেন নিজেই গিয়ে ব্যাপারটা যাচাই করে দেখবেন।
দিবাহারের সময় গ্রামে এসে ছাইয়ের স্তন্যদাত্রীর স্বামী, পরিচিত এক বৃদ্ধের কাছে ঘোড়াটা রেখে তিনি গেলেন তার মৌমাছি খামার দেখতে, ভেবেছিলেন ঘাস কাটার বিশদ খবর তার কাছ থেকে জেনে নেবেন। সুপুরুষ বৃদ্ধ পারমেনিচ কথা বলতে ভালোবাসে, লেভিনকে সে আনন্দ করেই আপ্যায়ন করল, দেখাল তার সমস্ত জোতজমা, বলল নিজের মৌমাছিগুলোর সমস্ত খুঁটিনাটি, এ বছরের নতুন ঝাঁকের কথা, কিন্তু ঘাস-কাটার ব্যাপারে লেভিনের প্রশ্নের উত্তর সে দিলে অনিচ্ছাসহকারে, সুনির্দিষ্ট কিছু না বলে। এতে লেভিন আরো নিশ্চিত হলেন তাঁর অনুমানে। ঘাস-কাটার জায়গায় গিয়ে তিনি গাদিগুলো দেখলেন। গাদিগুলোয় পশ্চাম গাড়ি করে ঘাস হতে পারে না। চাষীদে মুখোশ খোলার জন্য তিনি তখনই বিচালি বওয়ার গাড়ি ডেকে একটা গাদিকে গোলাঘরে নিয়ে যেতে বললেন। দেখা গেল গাদিটায় ছিল বত্রিশ গাড়ি বিচালি। ঘাসগুলো ছিল ফুলো-ফুলো, গাদিতে থেকে নেতিয়ে পড়েছে; সব কিছু করা হয়েছে ধর্মমতে, মণ্ডলের এসব আশ্বাস আর শপথ সত্ত্বেও লেভিন তাঁর এই অভিমতে অটল রইলেন যে বিচালি ভাগাভাগি হয়েছে তাঁর হুকুম ছাড়াই, তাই পঞ্চাশ গাড়ি করে এই গাদি তিনি নিতে পারেন না। দীর্ঘ তর্কবিতর্কের পর স্থির হল যে, চাষীরা এই এগারো গাদির প্রত্যেকটাকে পঞ্চাশ গাড়ি হিসেবে নিজেরা নেবে, মালিকের ভাগ বাঁটা হবে নতুন করে। এসব কথাবার্তা আর বাঁটোয়ারা গড়াল বিকেল পর্যন্ত। শেষ বিচালিটুকু ভাগাভাগি হয়ে গেলে লেভিন মহুরির ওপর বাকিটা দেখবার ভার দিয়ে ঝোপ আলাদা করা একটা বিচালি গাদার ওপর বসে মুগ্ধ হয়ে দেখতে লাগলেন লোকে গিজগিজ ঘেসো জমি 1
সামনে তাঁর, জলাটার পর নদীর বাঁকে উচ্চকণ্ঠের ঝংকার তুলে ফুর্তিতে এগিয়ে চলেছে মেয়েদের একটা রঙচঙে সারি, ছড়ানো-ছিটানো ঘাসগুলো দিয়ে তারা চিকন-সবুজ ডাঁটার পটে বানাচ্ছিল কুণ্ডলী পাকানো ধূসর স্তূপ। তাদের পেছনে আঁকশি নিয়ে যাচ্ছে পুরুষেরা, ঘাসগুলো হয়ে উঠছে লম্বা লম্বা উঁচু উঁচু ফুলো ফুলো, গাদি ছেঁটে ফেলা মাঠের বাঁ দিকে ঘর্ঘর করছে গাড়ি। বিপুল সাপটে তুলে দেওয়া গাদিগুলো অদৃশ্য হচ্ছে একে একে, তাদের জায়গায় ঘোড়ার পাছার দিকে ডাঁউ হয়ে উঠছে গন্ধ-ছড়ানো ঘাস।
‘আবহাওয়া ভালো থাকতে থাকতে তুলে ফেলতে পারলে হয়? বিচারি হবে কেমন!’ লেভিনের পাশে বসে বৃদ্ধ বলল, ‘ঘাস তো নয়! যেন হাঁসদের সামনে দানা। টপাটপ গিলছে!’ তুলে ফেলা গাদিগুলোকে দেখিয়ে সে যোগ করল, বড় হাজরির পর অর্ধেকটাই সাফ।’
‘এই শেষ খেপ নাকি?’ গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে লাগাম হাঁকিয়ে যে যুবকটা মেয়ের দিকে হেসে চিৎকার করে বলল ছেলেটা। গাড়ি চালিয়ে দিল আবার।
লেভিন জিজ্ঞেস করলেন, ‘ও কে? তোমার ছেলে?’
‘আমার ছোটটা’, বুড়ো বলল স্নেহের হাসি হেসে।
‘দিব্যি ছেলে!’
‘তা মন্দ নয়।’
