‘হ্যাঁ, হৃদয় যদি না বলে…’
‘হৃদয় বলে বৈকি, কিন্তু আপনি ভেবে দেখুন : আপনাদের পুরুষদের নজর পড়ল কোন-একটা মেয়ের ওপর, তার বাড়ি যেতে লাগলেন, ঘনিষ্ঠ হলেন, খুঁটিয়ে দেখলেন সব, অপেক্ষা করে রইলেন আপনি যা ভালোবাসেন তা পাচ্ছেন কিন, তারপর নিশ্চিত হলেন যে ভালোবাসছেন, তখন প্রস্তাব দিলেন…’
‘ঠিক তাই-ই এমন নয়। ‘
‘তা না হোক, আপনি প্রস্তাব দিলেন যখন আপনার ভালোবাসা পরিপক্ক হয়ে উঠেছে অথবা নির্বাচনীয় দুজনের মধ্যে পাল্লা ভারী হল একজনের। অথচ মেয়েটাকে তো জিজ্ঞেস করা হয় না। লোকে চায় নিজেই সে বেছে নিক, কিন্তু বেছে নিতে সে যে অপারগ, সে কেবল জবাব নিতে পারে হ্যাঁ কিংবা না।’
‘হ্যাঁ, আমার আর ভ্রন্স্কির মধ্যে বাছাবাছি’, লেভিন ভাবলেন আর প্রাণ পেয়ে ওঠা শব আবার মারা গেল তাঁর অন্তরে, শুধু তা যন্ত্রণা দিয়ে দলিত করত থাকল তাঁর হৃদয়।
বললেন, ‘দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনা, ওভাবে বাছা হয় একটা গাউন কি অন্য কিছু জানি না, ভালোবাসা নয়। বাছা হয়ে গেছে, আর সেটাই ভালো…পুনরাবৃত্তি হতে পারে না।’
‘আহ্ গর্ব আর গর্ব!’ ডল্লি বললেন যেন অন্যান্য যেসব অনুভূতি শুধু মেয়েরাই জানে, তার সাথে তুলনায় এ অনুভূতিটার নীচতার জন্য তাঁকে ঘৃণা করে।’যে সময় আপনি কিটির পাণিপ্রার্থনা করেছিলেন তখন সে ঠিক সেই অবস্থাতেই ছিল যখন জবাব দিতে সে পারে না। দোদুল্যমানতা ছিল তার। আপনি নাকি ভ্রন্স্কি-এই দোদুল্যমানতা। ভ্রন্স্কিকে কিটি দেখছিল রোজই অথচ আপনাকে দেখেনি অনেকদিন। ধরা যাক, ওর যদি আরেকটু বয়স হত—যেমন ওর জায়গায় আমি হলে আমার পক্ষে কোন দোলায়মানতা থাকা সম্ভব হত না। ভ্রন্স্কিকে আমার বরাবরই খারাপ লেগেছে, শেষও হল তাই।’
লেভিনের মনে পড়ল কিটির জবাব। সে বলেছিল : না, এটা হতে পারে না…
নীরস কণ্ঠে তিনি বললেন, ‘দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনা, আমার ওপর আপনার আস্থায় মূল্য দিই আমি; কিন্তু আমার মনে হয়, আপনি ভুল করছেন। তবে আমি ঠিক বলছি কি বলছি না, জানি না, এই যে বর্গটাকে আপনি এত ঘৃণা করেন, তাতে কিটি সম্পর্কে কোন চিন্তা আমার পক্ষে একেবারে অসম্ভব হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বুঝতে পারছেন, একেবারে অসম্ভব।’
‘আমি শুধু আরেকটা কথা বলব। আপনি বুঝতে পারছেন তো, আমি বলছি আমার বোন সম্পর্কে, যাকে আমি ভালোবাসি নিজের সন্তানের মত। আপনাকে সে ভালোবেসেছিল এমন কথা আমি বলছি না, আমি শুধু বলতে চাইছিলাম যে ওই মুহূর্তটার প্রত্যাখ্যান প্রমাণ হয় না বিছুই।’
‘জানি না!’ লাফিয়ে উঠে লেভিন বললেন, ‘বুঝতে পারছেন না কি কষ্ট দিচ্ছেন আমাকে। এ যেন আপনার ছেলে মারা গেছে আর সবাই আপনাকে বলছে : আহা ছেলেটা অমন ছিল, তেমন ছিল, বেঁচে থাকলে কত সুখ হত আপনার। অথচ সে তো মারা গেছে, মারা গেছে, মারা গেছে…’
‘কি হাস্যকার লোক আপনি’, লেভিনের উত্তেজনা কেয়ার না পরে ডল্লি বললেন বিষণ্ণ উপহাসে; ‘হ্যাঁ, এখন আমি আরো বেশি করে বুঝতে পারছি’, চিন্তিতভাবে তিনি বলে চললেন, ‘তাহলে কিটি এলে আপনি আমাদের এখানে আসবেন না?
‘না, আসব না। বলাই বাহুল্য, আমি পালিয়ে বেড়াব না তার কাছ থেকে, তবে যেখানে সম্ভব চেষ্টা করব আমার উপস্থিতির অপ্রীতিকরতা থেকে তাকে রেহাই দিতে।’
‘ভারি, ভারি হাস্যকর লোক আপনি’, লেভিনের মুখের দিতে কোমল দৃষ্টিতে তাকিয়ে পুনরাবৃত্তি করলেন ডল্লি, ‘তা বেশ, তবে এ নিয়ে আমরা যেন কোন কথা বলিনি। কেন এলি রে তানিয়া?’ মেয়েটা ঘরে ঢুকতে তাকে ফরাসি ভাষায় জিজ্ঞেস করলেন ডল্লি।
‘আমার কোদালটা’, জিজ্ঞেস করলেন ডল্লি।
মেয়েটাও তাই বলবে ভেবেছিল, কিন্তু কোদালের ফরাসি প্রতিশব্দ কি ভুলে গিয়েছিল সেটা; মা খেই ধরিয়ে দিলেন এবং ফরাসিতেই বললেন, কোথায় খুঁজতে হবে কোদালটা। এটা লেভিনের কাছে খারাপ লাগল।
দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনার বাড়ি আর তাঁর ছেলেমেয়ের কিছুই এখন আর তেমন মিষ্টি মনে হল না।
ভাবলেন, ‘ছেলেমেয়েদের সাথে ফরাসি ভাষায় কেন কথা বলছেন উনি : কি অস্বভাবিক আর কৃত্রিম! ছেলেমেয়েরোও টের পায় সেটা। ফরাসি শেখা আর স্বাভাবিকতা ভোলা’, মনে মনে ভাবলেন তিনি। জানতেন না যে ডল্লি নিজেও এ নিয়ে ভেবেছেন বিশ বার, তাহলেও স্বাভাবিকতায় ক্ষতি হলেও এই উপায়েই ছেলেমেয়েদের শিক্ষাদান প্রয়োজনীয় জ্ঞান করেছেন।
‘কিন্তু যাবেন আবার কোথায়? বসুন না।’
চা-পান পর্যন্ত রয়ে গেলেন লেভিন। কিন্তু তাঁর ফুর্তি উবে গিয়েছিল এবং অস্বস্তি লাগছিল।
লেভিন চায়ের পর প্রবেশকক্ষে গেলেন ঘোড়া দেবার জন্য বলতে। যখন ফিরলেন, ডল্লিকে দেখলেন অতি বিচলিত অবস্থায়, উদ্ভ্রান্ত মুখ, চোখে পানি। লেভিন যখন বেরিয়ে যান, তখন যে ঘটনাটা ঘটে তাতে ডল্লির আজকের সমস্ত সুখ আর ছেলেমেয়েদের জন্য গর্ব সব মাটি হয়ে যায়। গ্রিশা আর তানিয়া মারামারি করেছে একটা বল নিয়ে। শিশুকক্ষে চেঁচামেচি শুনে ডল্লি যান সেখানে, দেখেন ভয়াবহ এক দৃশ্য। তানিয়া গ্রিশার ঝুঁকি টেনে ধরেছে আর রাগে বিকৃত মুখে যেখানে পারছে সে ঘুসি চালাচ্ছে তানিয়ার ওপর। এটা দেখে ডল্লির বুকের মধ্যে কি-একটা যেন ছিঁড়ে গেল। যেন অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে তাঁর জীবনে, তিনি টের পেলেন যে নিজের যে ছেলেমেয়েদের নিয়ে তাঁর অত গর্ব হত, তারা নেহাৎ সাধারণ ছেলেমেয়েই শুধু নয়, রূঢ় পাশবিক প্রবৃত্তির বদ, দুঃশীল ছেলেমেয়ে, দুরাত্মা।
