‘আমি এটা মানতে পারি না, কজনিশেভ বললেন তার অভ্যস্ত প্রাঞ্জলতা আর প্রকাশের সুনির্দিষ্টতা আর মার্জিত বাচনভঙ্গিতে, কোনক্রমেই আমি কেইসের সাথে এ বিষয়ে একমত হতে পারি না যে, বহির্জগৎ থেকে আমার সমস্ত ধারণা আসছে সংবেদন মারফত। মূল যে বোধ সত্তা, সেটা আমি পেয়েছি সংবেদন মারফত নয়, কেননা এই বোধটা দেবার মত কোন বিশেষ প্রত্যক্ষ নেই।’
হ্যাঁ, কিন্তু ওঁরা–ভুর্স্ট, কনাউস্ট, প্রিপাসভ জবাবে আপনাকে বলবেন যে আপনার সত্তাচেতনা আসছে সমস্ত অনুভূতির যোগফল থেকে, সত্তার এ চেতনা হল অনুভূতির পরিণাম। ভু তো আরো এগিয়ে সোজাসুজি দাবি করেন যে অনুভূতি না থাকলে সত্তার চেতনাও থাকে না।
কজনিশেভ শুরু করলেন, আমি বলব বিপরীত কথা…’
কিন্তু এবারেও লেভিনের মনে হল ওঁরা প্রধান জিনিসটার কাছাকাছি এসে আবার সরে যাচ্ছেন এবং প্রফেসরকে একটা প্রশ্ন করবেন বলে তিনি ঠিক করলেন।
জিজ্ঞেস করলেন, তাহলে দাঁড়াচ্ছে, আমার অনুভূতি যদি ধ্বংস পায়, দেহ মরে যায়, তাহলে কোনক্রমেই আর অস্তিত্ব সম্ভব নয়?
প্রফেসর বিরক্তিতে এবং বাধা পাওয়ায় যেন একটা মানসিক যন্ত্রণায় তাকালেন প্রশ্নকর্তার দিকে, দেখতে যে দার্শনিকের বদলে বরং গুণটানা খালাসির মত, তারপর কজনিশেভের দিকে চোখ ফেরালেন, যেন জিজ্ঞেস করছেন? কি আর বলার আছে এখানে। কিন্তু কজনিশেভ যিনি কথা বলছিলেন প্রফেসরের মত উদগ্রতায় আর একদেশদর্শিতায় নয়, প্রফেসরের জবাব দেওয়ার সাথে সাথে যে সহজ স্বাভাবিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে প্রশ্নটা করা হয়েছে তা বোঝার মত মানসিক প্রসারতা যার ছিল, তিনি হেসে বললেন : ‘এ প্রশ্ন সমাধানের অধিকার আমাদের এখনো নেই…’
তথ্য নেই’, সমর্থন করলেন প্রফেসর এবং নিজের যুক্তিবিস্তার চালিয়ে গেলেন। বললেন, ‘আমি উল্লেখ করতে চাই, প্রিপাসভ যা সোজাসুজি বলেন, অনুভবের ভিত্তি যদি হয় সংবেদন, তাহলে এ দুয়ের মধ্যে কঠোরভাবে পার্থক্য করতে হবে।’
লেভিন আর শুনছিলেন না, প্রফেসর কখন চলে যান তার জন্য অপেক্ষা করছিলেন।
আট
প্রফেসর চলে যাবার পর সের্গেই ইভানোভিচ কজনিশেভ তার ভাইকে বললেন, ‘তুই এসেছিস বলে ভারি খুশি হলাম। কতদিনের জন্য? চাষবাস কেমন চলছে?
লেভিন জানতেন যে চাষবাসে বড় ভাইয়ের বিশেষ কৌতূহল নেই। প্রশ্নটা করলেন শুধু তাঁকে একটু প্রশ্রয় দিয়ে, তাই লেভিনও উত্তরে কেবল গম বিক্রি আর টাকার কথাটা বললেন।
লেভিন ভেবেছিলেন যে তার বিবাহের সংকল্পের কথা বড় ভাইকে জানাবেন, তার উপদেশ চাইবেন, এমন কি এ বিষয়ে একেবারে মনস্থির করে ফেলেছিলেন; কিন্তু যখন তিনি ভাইকে দেখলেন, প্রফেসরের সাথে তার কথাবার্তা কানে গেল এবং পরে যে পৃষ্ঠপোষকতার সুরে তিনি জিজ্ঞেস করলেন চাষবাসের কথা (ওঁদের মায়ের সম্পত্তি ভাগাভাগি হয়নি, লেভিন দুই অংশই দেখতেন) সেটা শুনলেন, তখন টের পেলেন কেন জানি বড় ভাইয়ের কাছে বিয়ের কথাটা পাড়তে তিনি অক্ষম। লেভিন টের পাচ্ছিলেন, উনি যা চান, বড় ভাই সেভাবে জিনিসটা দেখবেন না।
‘তা জেমস্তভোর খবর কি? কেমন চলছে?’ জিজ্ঞেস করলেন কজনিশেভ, জেমস্তভোর ব্যাপারে তার আগ্রহ ছিল প্রচুর এবং তাতে বড় একটা তাৎপর্য আরোপ করতেন।
‘সত্যিই আমি জানি না…’।
‘সেকি? তুই যে বোর্ডের সদস্য?
না, এখন আর নই, বেরিয়ে এসেছি’, জবাব দিলেন কনস্তান্তিন লেভিন, সভায় আর যাই না।
‘আফসোসের কথা!’ ভুরু কুঁচকে কজনিশেভ বললেন।
কৈফিয়ৎ দেবার জন্য লেভিন বলতে শুরু করেছিলেন তাঁর উয়েজদে সভায় কি-সব হচ্ছে।
কজনিশেভ তাঁকে বাধা দিলেন, সৰু সময়ই ওই ব্যাপারে। আমরা রুশীরা সব সময়ই ওই রকম। হয়ত এটা আমাদের একটা ভালো গুণ–নিজের ত্রুটি দেখতে পাওয়ার ক্ষমতা, কিন্তু আমরা নুন-পোড়া করে ছাড়ি, আমরা বিদ্রূপ করে তুষ্টি লাভ করি আর সেটা সব সময়ই আসে আমাদের জিবের ডগায়। আমি তোকে শুধু বলব, আমাদের জেমস্তভো প্রতিষ্ঠানগুলোর যে অধিকার আছে, তা যদি অন্য ইউরোপীয় জাতি পায়,জার্মানরা বা ইংরেজরা তা ব্যবহার করে নিজেদের মুক্তির ব্যবস্থা করে নিত, আর আমরা কেবল হাসাহাসি করি।
কিন্তু কি করা যায়? দোষীর মত বললেন লেভিন, এটা আমার শেষ অভিজ্ঞতা। মনেপ্রাণে চেষ্টা করেছি। পারি । আমার সে সামর্থ্য নেই।’
সামর্থ্য নেই’, বললেন নিশেভ, ব্যাপারটা তুই ঠিকভাবে দেখছিস না। হতে পারে, মনমরা জবাব দিলেন লেভিন।
‘আরে জানিস, নিকোলাই ভাই আবার এখানে।
নিকোলাই ভাই কনস্তান্তিন লেভিনের আপন সহোদর বড় ভাই আর কজনিশেভের সহোদর সভাই। ভুষ্টিনাশা ‘লোক, সম্পত্তির বেশির ভাগটা উড়িয়ে দিয়েছে, বিচিত্র আর বদ লোকেদের সমাজে ঘোরাঘুরি করে ঝগড়া করেছে ভাইদের সাথে।
বলছ কি? সভয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন লেভিন, ‘কোত্থেকে তুমি জানলে?
‘প্রকোফিই ওকে রাস্তায় দেখেছে।
‘এখানে, মস্কোয়? কোথায় সে? জানো তুমি?’ চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন লেভিন, যেন তখনই যেতে চান তিনি।
‘তোকে কথাটা বললাম বলে অনুতাপ হচ্ছে, ছোট ভাইয়ের উত্তেজনায় মাথা নেড়ে বললেন কজুনিশেভ, ‘কোথায় আছে জানার জন্য লোক পাঠিয়েছিলাম, ক্রবিনের কাছে দেওয়া যে হুভিটার টাকা আমি শোধ করেছি, সেটাও পাঠিয়েছিলাম। এই তার উত্তর।
